দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমাদের জয়ী হতেই হবে
আলী ফোরকান
১৭ অক্টোবর বিশ্ব দারিদ্র নিরসন দিবস। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে এবং জাতিসংঘের সহশ্রাব্দ ঘোষণা বাস্তবায়নে এদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে থাকে। উল্লেখ্য, বিশ^জুড়ে দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আহŸান জানিয়ে বিশ^ব্যাপী ১২৬টি দেশ একই সঙ্গে গত বছর ১৬ ও ১৭ অক্টোবর দারিদ্র্য বিমোচন দিবস উদযাপন উপলক্ষে বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেয়। গত বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান ও সোচ্চার হোন’। এ দিনটির মূল প্রতিপাদ্য বিশ^জুড়ে দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আয়োজক সংস্থ’া পিপলস ফোরাম অন এমডিজি’স (পিএফএম) বাংলাদেশ ও ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশনের সঙ্গে তাদের সংহতি প্রকাশ করে। বিশ^ব্যাপী দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জি-ক্যাপ ও পিএমএফ বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল। উল্লেখ্য, ২০০০ সালে জাতিসংঘে বিশে^র ১৮৯ দেশের সরকারপ্রধানদের সম্মেলনে ২০১৫ সালের মধ্যেই বিশে^র দারিদ্র্য অর্ধেকে নামিয়ে আনার ৮টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। যা পূরণে বাংলাদেশ সরকারও প্রতিশ্র“তিবদ্ধ। কিন্তু ধনী দেশগুলো তাদের অঙ্গীকার পূরণে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় ২০০৪ সালের নভেম্বর মাসে দু’শতাধিক বেসরকারি সংস্থা, নেটওয়ার্ক ও ট্রেড ইউনিয়নের সমম্বয়ে পিপলস ফোরাম অন এমডিজিস (পিএফএম), বাংলাদেশ নামে একটি ঐক্য প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়। অপরদিকে বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৩৭ বছর পরে এসেও দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে মুক্ত হতে পারেনি। শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমলেও নিরঙ্কুশ হিসেবে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। মাঝে নব্বই দশকে এবং তার অব্যবহিত পরেও কখনো এক শতাংশ, কখনো ২ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমেছে। কিন্তু গত দেড়-দুই বছর ধরে এই কমার হারটাও হঠাৎ করে থমকে গেছে। অনুসঙ্গ হিসেবে যুক্ত হয়েছে বৈষম্য। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। এর মধ্যে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল দুই থেকে আড়াই কোটি। এখন দেশের জনসংখ্যা ১৪ থেকে ১৫ কোটি। আর দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৬ থেকে ৭ কোটি। অর্থাৎ স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে নিরঙ্কুশ সংখ্যায় দরিদ্র মানুষ বেড়েছে দুই থেকে তিন গুণ। অর্থাৎ ২০০৮ সালকে হিসাবে আনা হলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আরো বাড়বে। আর সে কারণেই প্রায় দুই কোটি মানুষকে বিনা মূল্যে রেশনিং পদ্ধতির মাধ্যমে খাওয়ানোর কথা বলা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান এর মতে, ৯০ দশকে দারিদ্র্য কমছিল বছরে এক দুই শতাংশ হারে। ২০০০ এর প্রথম দিকেও এক শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমছিল। কিন্তু গত দুই তিন বছর ধরে দারিদ্র্য কমছে না। সরকারের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে। এর মধ্যে আবার হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২০ শতাংশ। তার মতে,শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমলেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমছে না। বর্তমানে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা সাড়ে ছয় কোটি। চলতি বছর খাদ্য নিরাপত্তার যে সংকট দেখা দিয়েছে তাতে গরিব মানুষের সংখ্যা আরো বাড়বে । এর সঙ্গে বৈষম্য যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে উঠেছে। বৈষম্য বেড়েছে এক অঞ্চলের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের। একশ্রেণীর সঙ্গে অন্য শ্রেণীর। এখন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশী খুলনা-বরিশালসহ উত্তারাঞ্চলে। সরকারের উচিত এসব অঞ্চলে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। তাতে মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে। সঙ্গে সঙ্গে দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও কমবে। বিশেজ্ঞরা বলছেন, মাঝে কৃষিখাত ছিল অবহেলিত। কৃষিখাতের গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন, সেচ ব্যবস্থা ইত্যাদি খাতে যে বিনিয়োগ হওয়ার দরকার ছিল সেটি হয়নি। এরই ফল হিসাবে এখন আমাদের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এখন কৃষক বিশেষ করে দরিদ্র কৃষক খুব কষ্টে আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০০৫ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০০৫ সালে বাংলাদেশে ৪০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমায় বসবাস করত। ২০০০ সালে এই হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ১৯৯১-৯২ সালে এ হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮ শতাংশ। দেশে অঞ্চল ভিত্তিক বৈষম্য যে প্রকট হয়ে উঠছে সেটাও এই জরিপে পরিষ্কার হয়ে উঠে। বিভাগওয়ারী হিসাবে দেখা যায়, বরিশালে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশী। সেখানে ৫২ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে। এছাড়া রাজশাহীতে ৫১ দশমিক ২ শতাংশ, খুলনায় ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে। অন্য বিভাগগুলোর অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো। ঢাকায় ৩২ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৩৪ শতাংশ, সিলেটে ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষের অবস্থান দারিদ্র্য সীমার নিচে। দারিদ্র্যের এই অসম বন্টন নিয়ে কিছুদিন আগে বিশ্বব্যাংক আয়োজিত এক সেমিনারে যথেষ্ট কথা চালাচালি হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চল বাংলাদেশের অর্থনীতির কেন্দ্র। স্বাভাবিকভাবেই এসব অঞ্চলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কম। অন্যদিকে বরিশাল-খুলনাসহ উত্তরাঞ্চলে কাজের সুযোগ কম থাকায় সেখানে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশী। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কম হওয়ার আরেকটি কারণ চিহ্নিত হয় সেখানে। সেটি হলো প্রবাসে চাকরি। বলা হয় লন্ডনে বিপুল সংখ্যক সিলেটি বসবাস করায় পুরো সিলেট অঞ্চলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কম। সেমিনারে বক্তব্য দেয়ার সময় বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর শিয়েন ঝু বিষয়টি লক্ষ্য করে বলেন, বাংলাদেশের মঙ্গা পীড়িত অঞ্চলের মানুষকে যদি সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রবাসে চাকরি করতে পাঠানো যায় তাহলে বোধহয় মঙ্গার একটি স্থায়ী সমাধান আসতে পারে। এ বিষয়ে সব বিশেজ্ঞরই একই সমর্থন । দেখা গেছে কোন একটি গ্রাম থেকে একজন মানুষ বিদেশে যেতে পারলে পরে তার আত্মীয়-স্বজন, গ্রামবাসীও প্রবাসে যাওয়ার পথ খুঁজে পায়। সম্প্রতি একটি মানবিক উন্নয়ন সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায় এখনও শতকরা ৪০ ভাগ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। এতদঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়াও য²া, ম্যালেরিয়া, এইডসসহ নানা রোগে এখনও প্রতি বৎসর বহু লোক মারা যায় । তথ্যটি নূতন না হলেও আলোচনার দাবি রাখে। দুনিয়ার দারিদ্র্য লাঞ্ছিত অঞ্চলসমূহের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া অন্যতম। এই অঞ্চলের জনসংখ্যা প্রায় ১৩০ কোটি। এর মধ্যে বৃহত্তম দেশ ভারত। যেখানে বাস করেন দক্ষিণ এশিয়ার মোট জনসংখ্যার শতকরা ৭৬ দশমিক ২ ভাগ লোক। তার পরের স্থান পাকি¯Íানের। বাংলাদেশে সার্ক অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ৭ ভাগ মানুষ বাস করে। নেপাল, শ্রীলংকা ও ভ‚টানের জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। এতদঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ভারত ও পাকি¯Íান কিছুটা অগ্রসর। এরপরও গোটা অঞ্চল জুড়ে দারিদ্র্য পরিস্থিতি একই রকম। এ অঞ্চলের মানুষের গড়ে বার্ষিক আয় ৪ শত মার্কিন ডলার কিংবা তার চেয়ে কিছু বেশী। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং আবাসানÐ এই তিনটি দিক বিবেচনায় রেখে দারিদ্র্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে যা পাওয়া যায়, তা প্রীতিপ্রদ নয়। একাধিক আন্তর্জাতিক রিপোর্টে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের পরিসর এবং এর সুফল সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে উৎসাহব্যঞ্জক অভিমত প্রকাশ করা হলেও দারিদ্র্যের ঘেরাটোপ থেকে এখনও আমরা মুক্ত হতে পারিনি। প্রতিবেশী দেশ ভারত শিল্প এবং প্রযুক্তি খাতে বহুদূর অগ্রসর হলেও দেশটির প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য এখনও প্রকট। পাকি¯Íানের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবস্থাও খুব ভাল নয়। নেপাল ও শ্রীলংকায় দারিদ্র্যের কষাঘাত সুতীব্র। এই দেশ দুইটির অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর হতে না পারার পশ্চাতে প্রধান কারণ রাজনৈতিক সংঘাত। সাম্প্রতিককালে নেপালের মাওবাদী গেরিলাদের সশস্ত্র তৎপরতার অবসান ঘটেছে। শান্তি চুক্তির মাধ্যমে দেশটিতে স্থিতিশীল পরিস্থিতি ফিরছে। কিন্তু এর আগে প্রায় দশ বৎসর ধরে সেখানে সহিংসতা বিরাজমান ছিল । রাজনৈতিক অবিশ্বাস, বিশৃংখলা এবং রাজতন্ত্রের অপরিণামদর্শী কার্যকলাপ নেপালের জনজীবনকে যেমন করেছিল বিপর্য¯Í, তেমনই ক্ষতিগ্র¯Í করেছিল ব্যষ্টিক ও সামাজিক অর্থনীতিকে। শ্রীলংকার অবস্থাও তথৈবচ। বহু বৎসর হয়ে গেল এই দেশটির মানুষ শান্তি-সুস্থিতির দেখা পায়নি। অশান্ত অস্থির ও সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্র¯Í হয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। বাধাগ্র¯Í হয় মানবিক উন্নয়নের সকল প্রচেষ্টা। বস্তুতঃ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত-সহিংসতা দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের দারিদ্র্যতা থেকে মুক্তির পথের বড় বাধা । সামাজিক অস্থিরতার কারনে বাংলাদেশকেও মাশুল দিতে হচ্ছে। তবে, নেতিবাচক দিকগুলো বিদ্যমান থাকা সত্তে¡ও দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নয়নে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখছে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ইতিমধ্যে বেশ অগ্রসর হয়েছে বলে সমীক্ষকগণ মনে করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের মতে, সামাজিক শান্তি-স্থিতি অব্যাহত থাকলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে উত্তরণ অসম্ভব নয়। আসলে অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনমানের উন্নয়নের সাথে সামাজিক শান্তি-স্থিরতার সম্পর্কটি অত্যন্ত গভীর। অন্যদিকে আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়টিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দক্ষিণ এশিয়ার ১৩০ কোটি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের লক্ষ্যে সহযোগিতার নবদিগন্ত উন্মোচনের আশায় ১৯৮৫ সালে গঠিত হয় দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা সংস্থা-সার্ক। বিগত দুই দশকের ব্যবধানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সার্ক সহযোগিতার সুফল দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়েছে। তবে দারিদ্র্য সমস্যা কেটে উঠতে হলে মানবসম্পদের উন্নয়ন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। মানবসম্পদ উন্নয়নের বিষয়টি ব্যাপকার্থক। এজন্য একদিকে যেমন প্রয়োজন শিক্ষা, তেমনি প্রয়োজন এমন দক্ষতা অর্জন। যাতে উৎপাদনে অবদান রাখা সম্ভব হয়। জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিও মানবসম্পদ উন্নয়নের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নতি ছাড়া মানবিক উন্নয়ন অসম্ভব। অসুস্থতা এবং অকাল মৃত্যু দারিদ্র্যের বৃত্তকেই প্রসারিত করে। এমতাবস্থায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য রক্ষার দিকে সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা দরকার। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রত্যেকটি দেশেরই উৎপাদনের গতি অব্যাহত রাখতে শান্তি-স্থিতি বজায় রাখতে সচেষ্ট থাকা প্রয়োজন। অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হ্রাস করে মানবসম্পদ উন্নয়নে অধিক বরাদ্দ এবং অধিক মনোযোগ প্রদান একান্ত কর্তব্য। উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ছিল তুলনামূলক কম। ওই বছর বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে আমেরিকা ও জাপানের মতো উন্নত দেশগুলো মূল ভ‚মিকা পালন করেনি। এতে মূল ভ‚মিকা পালন করে চীন ও ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো। ধারণা করা হচ্ছে, এ ধারা এ বছরও অব্যাহত থাকবে। গত ৯ জানুয়ারি ওয়ার্ল্ড ব্যাংক প্রকাশিত গ্লোবাল ইকনমিক প্রসপেক্টস রিপোর্ট-২০০৮ এ ধারণাকে আরো প্রতিষ্ঠিত করে। এ রিপোর্টে বলা হয়, আমেরিকার অর্থনীতির নিম্নগতি ও ঋণ বাজারের অস্থিরতার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুত পতনের যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যা প্রতিরোধে আগামী বছরগুলোতে ত্রাণকর্তার ভ‚মিকা পালন করবে উন্নয়নশীল দেশগুলো। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বিশ্ব অর্থনৈতিক অবস্থার পূর্বাভাসমূলক রিপোর্ট ২০০৮-এ বলা হয়েছে, চীন ও ভারতের মতো উঠতি অর্থনীতির দেশগুলো বিশ্ব অর্থনীতিকে চলতি মন্দাভাব থেকে রক্ষা করবে। ব্যাংকটির মতে, বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে মূল ভ‚মিকা পালন করবে উন্নয়নশীল দেশগুলো।এ রিপোর্ট মতে, দিন দিন দুর্বল হতে থাকা আমেরিকান ডলার, অর্থবাজারে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা ও আমেরিকার অর্থনৈতিক মন্দাভাবের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি ঝুকির মধ্যে রয়েছে। রিপোর্টের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আমেরিকার হাউজিং মার্কেটের নিম্নগতি যা গত বছর শুরু হয়েছিল তা এ বছরও অব্যাহত থাকবে। যা ২০০৯ সালে এ নিম্নগতি মারাত্মক আকার ধারণ করবে। ২০০৬ সালে বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৯ শতাংশ। এটা নিচে নেমে গিয়ে গত বছরে ছিল ৩.৬ শতাংশ। এ রিপোর্ট অনুযায়ী এ বছর প্রবৃদ্ধির হার আরো কমবে এবং ৩.৩% শতাংশে গিয়ে দাড়াবে। আমেরিকা ও বৃটেনের মতো উচ্চ আয়ের দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির নিম্ন হারই এর মূল কারণ। উল্লেখ্য, বৃটেন পৃথিবীর পঞ্চম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। চঁৎপযধংরহম চড়বিৎ চধৎরঃু বা ক্রয়ক্ষমতার তুলনার ভিত্তিতে গত বছরের প্রবৃদ্ধির হার ৫.২ শতাংশ থেকে নেমে গিয়ে এ বছর ৪.৯ শতাংশ হবে। চঁৎপযধংরহম চড়বিৎ চধৎরঃু আয়ের বিভিন্নতাকে নির্দেশ করে। এর বিপরীত দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ যেমন চীন ও ভারতের মতো দেশগুলো বিগত বছরগুলোয় গড়ে ওঠা নিজস্ব রিজার্ভের সাহায্যে অর্থনীতির মন্দাভাব কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ডেভেলপিং প্রসপেক্টস গ্র“প এবং ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড এগ্রিমেন্টের পরিচালক ইউরি দাদুস (টৎর উধফঁংয) মতে, আগামী দুবছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি বাড়বে। তবে আমেরিকান অর্থনীতির অবনতিশীল অবস্থার কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর রফতানি আয় ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্র¯Í হতে পারে। আমেরিকার ক্রমহ্রাসমান আমদানি সত্তে¡ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক মনে করে তেল রফতানিকারক দেশগুলোর উচ্চ আয় এবং চীন ও ভারত ব্যবসায় সম্প্রসারণে এ বছর উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ থাকবে। প্রবৃদ্ধির এ ঊর্ধ্ব হার আগামী বছরগুলোতেও অব্যাহত থাকবে। অথচ ২০০৬ প্রবৃদ্ধির তেজি হার ৭.৫ শতাংশ থেকে গত বছর নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি বেড়েছে মাত্র ০.১ শতাংশ। অপরিশোধিত তেলের (পৎঁফব ড়রষ) চড়া দামের সুবাদে আলজেরিয়া ও ইরানের মতো তেল রফতানিকারক দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির হার অনেক বেড়ে যাবে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ১০০ ডলারেরও বেশি। অন্যদিকে চীন ও ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দ্রুত উত্থানের কারণে সেখানে অভ্যন্তরীণ চাহিদার পরিমাণও বেড়ে যাবে। সব মিলিয়ে উন্নয়নশীল বিশ্বে উৎপাদনশীলতা ও বিগত ১৫ বছরের চেয়ে জাতীয় আয়ের পরিমাণ বাড়াতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সাবধানী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও সুদূরপ্রসারী কারিগরি উন্নতি। এ দুটি বিষয়ে নজর দেয়া গেলে আগামী দশ বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মাথাপিছু আয় বাড়বে শতকরা ৩.৯ ভাগ এবং এক দশক পরে এ বৃদ্ধির হার হবে ৩.৪ ভাগ। মাথাপিছু আয়ের এ সম্ভাব্য বৃদ্ধির হার উন্নত বিশ্বের উচ্চ-আয়ের দেশগুলোর চেয়ে দ্বিগুণ হবে। বিশ্ব ব্যাংকের মতে, এ সম্ভাবনা বা¯Íব রূপ পেলে বিশ্বে প্রতিদিন ১ ডলারের চেয়ে কম আয় সম্পন্ন মানুষের সংখ্যা ২০১৫ সালে ৬২৪ মিলিয়নে নেমে আসবে। ২০০৪ ও ১৯৯০ সালে এ রকম মানুষের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৯৭০ মিলিয়ন ও ১.২ বিলিয়ন। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বেশ কিছু হুমকি চিহ্নিত করেছে। যেগুলো বিশ্ব অর্থনীতি সম্পর্কে ব্যাংকটির পূর্বাভাসকে পাল্টে দিতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো আবার অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে, যদি আমেরিকার হাউজিং মার্কেটে ধস অব্যাহত থাকে এবং আরো মূল্যপতন ঘটে। আমেরিকার হাউজিং মার্কেটে লেনদেন ব্যাপক হারে কমে গেলে সেটা আমেরিকাকে অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ঠেলে দেবে। আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারাল রিজার্ভ’ সুদের হার কমাতে বাধ্য হবে। যার ফলে ডলারের দাম কমে যাবে। তাতে করে অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা প্রকট আকার ধারণ করবে। এ পরিস্থিতি উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে মুদ্রা নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের সামনে থাকা বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোকে ফুটিয়ে তোলে। যা বিশ্ব অর্থনীতিতে মধ্য মেয়াদে আরো নিম্নগতির সূচনা করতে পারে। তাছাড়া অর্থবাজারের অস্থির অবস্থা ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ সঙ্কুচিত করে তুলতে পারে। আর এ রকম হলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু ব্যাংকের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, উঠতি অর্থনীতির দেশগুলোতে ঋণ সঙ্কটের ক্ষতিকর প্রভাবের সম্ভাবনা কম। ব্যাংকের মতে, এ বছরের শেষ পর্যন্ত ঋণের সঙ্কট অব্যাহত থাকবে। রিপোর্ট পূর্বাভাস দেয়, ঙঊঈউ (ঙৎমধহরুধঃরড়হ ঋড়ৎ ঊপড়হড়সরপ ঈড়-ড়ঢ়বৎধঃরড়হ ধহফ উবাবষড়ঢ়সবহঃ) ভুক্ত ৩০টি দেশ বর্তমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে পারবে। আগামী বছর নাগাদ ঙঊঈউ ভুক্ত দেশগুলোতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে গতিশীলতা বাড়বে। উল্টো দিকে, অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় এ বছর আমেরিকার প্রবৃদ্ধির হার ১.৯ শতাংশে নেমে আসবে। ২০০৭-এর তৃতীয় ভাগে আমেরিকার প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪.৯ শতাংশ। যখন ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের রিপোর্টে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর দুর্বলতর আমেরিকান ডলারের বিপজ্জনক প্রভাবের ব্যাপারে সতর্ক করে দিচ্ছে, তখন আবার রিপোর্টটি জানান দিচ্ছে, আমেরিকার প্রবৃদ্ধির নিম্ন হারের সঙ্গে সঙ্গে এ বছর বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির অধিকারী এ দেশটির রফতানির পরিমাণ বাড়বে। রফতানির এ বৃদ্ধি আমেরিকার চলতি বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ কমাবে। বিগত বছরগুলোতে ঘাটতির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ৬.৬ শতাংশে দাড়িয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০০৯ সালে ঘাটতির পরিমাণ ৫%-এ নেমে আসবে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের গ্লোবাল ট্রেন্ড টিম-এর ম্যানেজার হ্যান্স টিমারের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রচুর আমদানি চাহিদা বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখবে। যার প্রভাবে মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণও হ্রাস পাবে। এর মাঝে ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে ঘোষিত যুদ্ধে আমাদের জয়ী হতেই হবে।
0 comments:
Post a Comment