মৌমাছির মড়ক প্রসঙ্গ
আলী ফোরকান
বাংলাদেশে মধুর চাষের গোড়াপত্তন হয়েছে প্রায় দুই যুগ আগে। তখন থেকেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মৌচাষ শুরু হয়। মৌবক্্ের উৎপাদিত মধু নিস্কাশন যন্ত্রের সাহায্যে মধু সংগ্রহ করা হয়। সংগ্রহীত মধু আধুনিক পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পরিশোধন কওে বাজাওে ছাড়া হয়। আর পুষ্টিমান সমৃদ্ধ বলে এর চাহিদা রয়েছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের কোটি কোটি মানুষের কাছে। মৌ চাষীরা বিভিন্ন মৌসুমে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, দিনাজপুর, রাজশাহী, সাভার, ময়মনসিংহ,শেরপুর,বরগুনা, কক্্রবাজার ও সুন্দরবনের অহ্চলে এ চাষ করে থাকে। আর এ মধু বিক্রি করে গত ৫ বছরে বাংলাদেশে গড় আয় হয় ৪৪০ ডলার। কিন্তু সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় সব কলোনীর মৌমাছি মারা গেছে। পথে-ঘাটে, মাঠে সর্বত্র মরা মৌমাছি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা গেছে। এছাড়া লক্ষনীয় যেসব স্থানে মৌমাছির চাক (কলোনী) ছিল তার শতকরা ৯০ ভাগ মৌমাছি হঠাৎ করেই মারা যায়। এলাকাবাসীর মধ্যে অনেকে বার্ডফ্লু বলেও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। এছাড়া অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন,মধুর জন্য উপযোগী গাছপালা শষ্য জাতীয় ফুল সরিষা,তিল,ভুট্ট.তুলা,ধনিা। ফল জাতীয় ফুল,লিচু, আম,তেতুল, জলপাই,বরই, কামরাঙ্গা, নারিকেল ,লেবু,পেয়ারা ইত্যাদি। সবজি জাতীয় ফুল লাউ,বেগুন,মিষ্টি কুমড়া,টমেটো,শশা, শিম ইত্যাদি। ফুল জাতীয় সূর্য্যমুখী,শাপলা, গোলাপ, গাদা,বকুল ইত্যাদি থেকে মৌমাছিরা মধু আহরণ করে থাকে। এসব গাছে কৃষকেরা পোকা মাকড়ের থেকে রক্ষা করা জন্য কীটনাশক ব্যবহার করে । এ কীটনাশক যুক্ত বিভিন্ন ক্ষেতে মধু সংগ্রহ করতে গিয়েও মৌমাছির মৃত্যু হতে পারে বলে তাদের ধারণা।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের আবুল বাশার জানায়, তার বাড়ির পাশে দু’টি বড় মৌমাছির (বৈজ্ঞানিক নাম এপিস ডরসেটা) চাক ছিল গত রোববার হঠাৎ করে সব মৌমাছি মারা যায়। একই উপজেলার ঘিঘাটি গ্রামের মাইনুর রহমান জানায়, তারও বাড়ির পাশে মৌমাাছির চাক ছিল কিন্তু হঠাৎ করেই গত সোমবার চাকের সব মাছি মারা যায় যা দেখে আমি হতবাক হই। তবে কি কারণে মাছিগুলো মরছে তা আমি জানিনা। এছাড়া ঝিনাইদহ জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সব জায়গাতেই একইভাবে মৌমাছির মড়ক লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এব্যাপারে মৌ বিশেষজ্ঞ ও হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ডের প্রোগ্রাম অফিসার এস.এম শাহিন হোসেন জানান, এটা কোন রোগ নয়, মূলত মৌচাকে খাদ্য ঘাটতির জন্যই মৌমাছি মারা গেছে। তিনি বলেন, টানা বর্ষা ও শৈত্যপ্রবাহের কারণে মৌমাছি চাক ছেড়ে বাইরে যেতে না পারার ফলে ও না খেয়ে মৌমাছি মারা যেতে পারে। এছাড়া এ অঞ্চলে বর্তমানে মধু সংগ্রহের পর্যাপ্ত উৎস না থাকায় কলোনীতে বাড়তি মধুও ছিলনা যার কারণে টানা ৪ থেকে ৫ দিন না খাওয়া এবং খাদ্য ঘাটতির জন্যই চাকের মৌমাছির মড়ক দেখা দিয়েছে। এটা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতি হলেও সাধারণ মানুষের ভীতির কোন কারণ নেই।
প্রাণী বিশেষজ্ঞদের অভিমত: সারাবিশ^ আজ পরিবেশ দূষণের কবলে পড়েছে পশু পাখিরাও । তা আমর খুব ভালোভাবেই অনুভব করতে পারছি। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সেটা অনেকাংশে প্রমাণ করে। সুনামি, সিডর এবং আমেরিকার হ্যারিকেন ক্যাটরিনার ভয়গ্ধকর তান্ডবলীলা বিশ^বাসীর কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আবহাওয়া বিজ্ঞানী ও পরিবেশবাদীদের মতে, কয়েক বছর ধরে বৈশি^ক উষ্ণতা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে, যার কারণে আবহাওয়া ও প্রকৃতির ওপর বিরূপ প্রভাব তথা ওলটপালট শুরু হয়েছে। প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণে বিশে^র বিভিæ অঞ্চলের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রাণীজগতে ও এর চরম প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যান্ত্রিক ইঞ্জিন মানেই ল্যুবঅয়েল। কিছুদিন অন্তর অন্তর ব্যবহারকৃত এই দূষিত ল্যুবঅয়েল মাটিতে নদী-নালাসহ বিভিæ স্থানে যত্রতত্র ফেলে দেওয়ায় মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে এবং কীট-পতঙ্গ হারিয়ে যাচ্ছে। এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে জাপান ইঞ্জিনের যান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের এক নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। যার নাম ‘ইকোনেফরন সিস্টেম’ যা নতুন একটি প্রযুক্তি। যার মাধ্যমে ইঞ্জিনের ল্যুবঅয়েল এবং কালো ধোঁয়া নির্গমনের ফলে পরিবেশ দূষণের মারাত্মক বিপর্যয় থেকে আমরা অনেকাংশে রক্ষা পেতে পারি। পাশাপাশি আমাদের মানব সমাজসহ পশু পাখি নিরাপদ থাকবে।
0 comments:
Post a Comment