সুন্দরের বনের বাঘ নিরাপদে নেই
আলী ফোরকান
বাঘ বাংলাদেশের জাতীয় মর্যাদায় বীরত্বের প্রতীক। অরণ্যের ভয়ংকর সুন্দর এ প্রাণীটির অস্থিত্ব এখন হুমকির মুখে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক রকম বাঘ রেয়েছে। কিন্তু সুন্দরবনের বাঘের মতো এতো সুন্দর, শক্তিবান, দর্পশালী, ভীমমুর্তি এবং পটু বন্যজন্তু আর কোথাও নেই। বাঘ বাংলাদেশের জাতীয় প্রাণী। বাঘ বলতেই মানুষের মনে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। ইউরোপীয়রা বাঘকে “রয়েল বেঙ্গল টাইগার” নামে অভিহিত করেছিলেন। বাঘের হিংস্রতা ও শক্তির কারণে জেলে, বাওয়ালী ও অন্যান্য প্রাণী ভীতসম্ভ্রস্থ হয়ে পড়ে। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মানুষ ও সুন্দরবনে জীবিকা অর্জনকারীরা বাদাবনে কেউ বাঘের নাম ধরে না। কেউ কেউ বড় মামা, কেউ বড় মিয়া, গাজী, ঠাকুর প্রভৃতি নামে ডাকে। কেউবা ভীতিপূর্ন নমস্কার ও পুজা করে থাকে। এই রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাংলাদেশ ও ভারত ছাড়া আর কোন দেশে পাওয়া যায় না। বর্তমানে সারাবিশে^ বাঘের সংখ্যা কমে ৩ হাজারেরও নিচে নেমে এসেছে। শুধু বাঘই নয়, পৃথিবীর সব প্রজাতির বাঘই এখন আশংকাজনকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
বাঘের আবাস : সৌন্দর্য, মর্যাদা আর শক্তিমত্তায় অতুলনীয় বাঘের আদিনিবাস বাংলাদেশের সুন্দরবন, ভারত, মিয়ানমার, সাইবেরিয়া অঞ্চল, সুমাত্রা এবং জাভা। বর্তমানে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারে বাঘ রয়েছে। হিমালয়ের মতো সুউচ্চ ও হিমশীতল বৈরী পরিবেশেও এরা চমৎকারভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।
জীবনচিত্র : পুরুষ বাঘের দৈর্ঘ্য মাথা থেকে লেজসহ সাড়ে ৩ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর ভেতর লেজের দৈর্ঘ্য ৮৫ থেকে ৯৫ সেন্টিমিটার হতে পারে। গড় ওজন ২০০ থেকে ২৩৬ কেজি। তবে এ যাবৎ সবচেয়ে বড় বাঘের ওজন ৩৮৮.৭ কেজি পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে। স্ত্রী বাঘ আকারে ছোট হয়। দৈর্ঘ্য ৩ মিটারের কিছু বেশি হতে পারে। বাঘের পায়ের ছাপ গোলাকৃতির আর বাঘিনীর ছাপ লম্বাটে হয়। বাঘের সারা শরীর হলুদ-কমলা-বাদামি এবং সাদা-কালো লম্বাটে ডোরাকাটা ঢেউ খেলানো দাগ থাকে। প্রচণ্ড শক্তিশালী এবং ভয়ংকর হিংস্র এই প্রাণীটি গভীর অরণ্যে নির্জনে থাকতে পছন্দ করে। এরা এক লাফে ৭-৮ মিটার অতিক্রম করতে পারে এবং সাড়ে ৩ মিটার উঁচুতে উঠতে পারে। এরা ভালো সাঁতার কাটতে পারে এবং গাছে চড়ায়ও বেশ পারদর্শী। মাংসাশী এ প্রাণীটির খাদ্য তালিকায় রয়েছে হরিণ, শূকর, বনগরু, গয়াল, নীলগাই, হাতি বা গণ্ডারের বাচ্চা, মহিষ, কুমির, অজগর এমনকি সুন্দরবনের বাঘরা মাছও খায়। বাঘ প্রতি সপ্তাহে একবার শিকার করে। তবে শিকারের ওজন ৩০-৪০ কেজির কম হলে আবার শিকারের জন্য বের হতে হয়। প্রতিদিন এদের গড়ে ৭ কেজি খাদ্যের প্রয়োজন। সে হিসাবে এর খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে দরকার প্রতি বছর গড়ে ৩ হাজার ৬৫০ কেজি মাংস। যার ওজন ৭৩টি চিত্রা হরিণের সমপরিমাণ। প্রায় সব প্রজাতির বাঘ প্রজননক্ষম হয় আড়াই থেকে ৩ বছর বয়সে। বাঘিনীর বাচ্চা ধারণের সময়সীমা ১০৮ দিন। বাঘিনী একসঙ্গে ২ থেকে ৬টি পর্যন্ত বাচ্চা প্রসব করে। বাঘের জীবনকাল ১৪ থেকে ২০ বছর।
সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা : পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং সুন্দরবন বন বিভাগ অ সুত্র জানায়, ১৯৭৫ সালে একজন ইউরোপীয় বাঘ বিশেষজ্ঞ মি. হেন্ডরিস সুন্দরবনে বন্যপ্রাণী শুমারি করেন। ওই শুমারিতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তখন সুন্দরবনে রয়েল বাঘের সংখ্যা ছিল ৩৫০টি। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের তথ্যে জানা যায়, ১৯৯১ সালে একটি বিদেশি সংস্থা সুন্দরবনে জরিপ চালিয়ে পায় বাঘের সংখ্যা ৪৫৯টি। এরপর ১৯৯৩ সালে নেপালের বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. কেএম তামাং সুন্দরবনে শুমারি পরিচালনা করেন। ওই শুমারিতে পাওয়া হিসাবে তখন সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ৩৬২টি। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞ টিসা ম্যাকগ্রেগর জানান, বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলে ২০০টির বেশি বাঘ নেই। সর্বশেষ ২০০৪ সালের ২৬ ফেব্র“য়ারির -৩ মার্চ বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাঘশুমারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পাগ মার্ক (পায়ের ছাপ গণনা পদ্ধতিতে) এর শুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে সুন্দরবন অংশে ৪১৯টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ রয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ১২১টি এবং স্ত্রী ২৯৮টি। আর বাচ্চার সংখ্যা ২১টি। ভারত অংশে রয়েছে ২৭৪টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ। এর মধ্যে পুরুষ ২৪৯টি ও স্ত্রী ২৫টি। তবে বিশিষ্ট প্রাণীবিদ মনিরুল এইচ খানের মতে, ক্যামেরা ট্যাপিং পদ্ধতিতে নতুন বাঘশুমারিতে বাংলাদেশে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা পাওয়া গেছে ২০০টি এবং ভারতীয় অংশে ১০০ থেকে ১৫০টি। পায়ের ছাপ গণনা পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে যে শুমারি করা হয় তাতে একই বাঘের একাধিক পায়ের ছাপ গণনায় চলে আসার আশংকা থাকে। ২০০৪ সালে পায়ের ছাপ গণনা বা পাগ মার্ক পদ্ধতিতেই বাঘশুমারি করা হয়েছিল। এ পরিসংখ্যান নিরুপণ করাও খুবই কঠিন। এ যাবৎ সুন্দরবনের কতগুলো বাঘের স্ব^াভাবিক ও অস্ব^াভাবিক মৃত্যু হয়েছে এর কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে এ সংশ্লিষ্ট একাধিক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৬০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে অবৈধভাবে অন্তত ১০০টি বাঘ হত্যা করা হয়েছে। অন্য আর এক তথ্যে জানা যায়, ১৯৯৬-২০০০ সাল পর্যন্ত ২৪টি বাঘের মৃত্যু ঘটে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। যা কোনোদিনই প্রকাশিত হবে না। কারণ সুন্দরবনে বহুকাল ধরে সংঘবদ্ধ চোরা শিকারিদের সঙ্গে জড়িত রয়েছে দেশের প্রভাবশালী চক্র। এদের সঙ্গে রয়েছে আবার আর্ন্তজাতিক চোরাকারবারির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। কেননা বাঘের চামড়া ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দাম আর্ন্তজাতিক বাজারে অত্যন্ত চড়া। সুতরাং চোরাকারবারিদের জন্য এ ব্যবসা অত্যন্ত লোভনীয়। বাঘ বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত ৮টি কারণে সুন্দরবনের বাঘের মৃত্যু হতে পারে। ১. বয়স্ক বাঘের স্বাভাবিক মৃত্যু, ২. পুরুষ বাঘ কর্তৃক বাচ্চা খেয়ে ফেলা, ৩. পর্যাপ্ত খাদ্যাভাব, ৪. লোনা পানি গ্রহণে লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে, ৫. প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ৬. ব্যবস্থাপনাজনিত সমস্যা, ৭. লোকালয়ে প্রবেশ করার কারণে মৃত্যু এবং ৮. চোরাগোপ্তা শিকার বা পোচিং। চোরা শিকারি ও কারবারিদের অবৈধ ক্ষমতার ভিত খুবই সুদৃঢ় ও শক্তিশালী। এমনকি রাষ্ট্রক্ষমতার উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত প্রসারিত।
বাঘ বিলুপ্তির কারণ : স¤প্রতি গ্লোবাল টাইগার ফোরামের ওয়েবসাইটের তথ্য মতে, বিশে^র ৪০টি দেশের কালোবাজারে বাঘের চামড়া ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবসা চলছে। পূর্ব এশিয়ায় বাঘের চামড়া, হাড়গোড়সহ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবসা অত্যন্ত জমজমাট। চীনা ঐতিহ্যবাহী ওষুধ ‘শিল্পে’ বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বহুল ব্যবহার রয়েছে। চীনে বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে তৈরি ‘ওষুধ’ বেচাকেনা চলছে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র্রের মতো বড় বড় বাজারেও এসব ওষুধ অবাধে বিক্রি হচ্ছে। সেখানে এসব ওষুধ বেচাকেনা অবৈধ নয়। সুন্দরবনে চোরা শিকারিরা বিভিন্নভাবে বাঘ হত্যা করে চলেছে। গুলি করে, ফাঁদে আটকে বাঘ শিকার করে। গরু, ছাগল, হরিণ মেরে সেগুলোর শরীরে বিষ মেখে বাঘের খাবার হিসেবে জঙ্গলে ফেলে রাখা হয়। বাঘ এসব বিষমাখা মৃত প্রাণী খেয়ে বিষের প্রতিক্রিয়ায় মারা যায়। নয়তো গুরুতর অসুস্থ’ হয়ে পড়ে। তখন সেটিকে সহজে হত্যা করা যায়। ফাঁদে আটকানো বাঘকে অভুক্ত রেখে অথবা বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। হত্যার পর মৃত বাঘের শরীর থেকে চোরা শিকারিরা এর চামড়াসহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহ করে। এরপর আর্ন্তজাতিক চোরাকারবারিদের কাছে এসব বিক্রি করে থাকে। বাঘের চামড়া, মাথার খুলি, পাটিসহ দাত ও হাড়গোড় মূল্যবান এন্টিক্স হিসেবে ক্রয়-বিক্রয় হয়। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘের চামড়ার দাম ১৫ লাখ টাকারও বেশি। বাঘের হাড় প্রতি কেজি লাখ টাকার মতো। অন্য এক পরিসংখ্যানে জানাযায়, বিশ্বের নয় প্রজাতির বাঘের মধ্যে শুধু ইন্দোনেশিয়াতে সুমাত্রান প্রজাতির বাঘ পাওয়া যায়। কিন্তু সুমাত্রা দ্বীপে এখন এ প্রজাতির মাত্র ৪০০টি বাঘ রয়েছে বলে জানায় ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার সংস্থা। এ জন্য দেশটিকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বলেছে তারা। মূলত বাঘ হত্যা করে তার দেহের অংশ বিক্রি ও জঙ্গলে বাঘের আবাসস্থল ভেঙে ফেলার কারণে এ প্রজাতির বাঘ দ্রুত কমে যাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সুমাত্রান বাঘ (ঝঁসধঃৎধহ ঃরমবৎ) বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন সংরক্ষণবাদীরা। দি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার এবং দি ওয়ার্ল্ড কনভারসেশন ইউনিয়নের সদস্যরা ট্রাফিক নামে একটি বৃটিশ ইন্টারন্যাশনাল ওয়াইল্ড লাইফ ট্রেড মনিটরিং নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন। ওই নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, বাঘের দেহের অংশ বিক্রি আইনত নিষিদ্ধ থাকা সত্তে¡ও তারা ২০০৬ সালে ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপ সুমাত্রার আটটি শহরে বাঘের হাড়, থাবা, চামড়া, গোফ এসব বিক্রি হতে দেখেছিল। সংস্থাটির হিসাব মতে, সুভেনির (ঝড়াঁবহরৎ) বা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে, চায়নিজ ওষুধ তৈরির জন্য এমনকি জুয়েলারি স্টোরের জন্য বাঘের দেহের অংশ সংগ্রহ করতে চোরাকারবারিরা সে সময় ২৩টি বাঘ হত্যা করেছিল । বাঘের একটি থাবা ১৪ ডলার ও এক পাউন্ড হাড় ৫২.৫০ ডলার করে বিক্রি হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার সংস্থার প্রাণী প্রজাতি সংরক্ষণ গ্র“পের পরিচালক সুসান লিবারম্যান বলেছেন, ‘বাঘ হত্যার কারণে দিনে দিনে সুমাত্রান বাঘ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ।’বিশ্বের অন্য সব প্রজাতির বাঘের মধ্যে সুমাত্রান বাঘ এখন সবচেয়ে বিপন্ন প্রাণী। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে বন-জঙ্গলে এ প্রজাতির বাঘ রয়েছে মাত্র চারশর মতো। ১৯৭০-এর দশকে তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় এক হাজার। অবশ্য এ বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে অন্য একটি কারণও বিশেষভাবে দায়ী বলে বলছেন ওই সংস্থা। বাঘের বাসস্থান ভেঙে, জঙ্গলের সে সব জায়গায় পাম অয়েল ও কাঠ সংগ্রহের জন্য গাছ লাগানো হচ্ছে। লিবারম্যান বলেছেন, ‘কার্যকরী পদক্ষেপ না নেয়ায় এ সমস্যা বড় আকার ধারণ করেছে।’ তার মতে, এ সমস্যা মোকাবেলা করতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে ইন্দোনেশিয়াকে । সুমাত্রান বাঘ সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে গত বছরের ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়া ১০ বছর মেয়াদি একটি প্ল্যান হাতে নিয়েছে। তবে সংরক্ষণবাদীরা অভিযোগ করেছেন, এ বিপন্ন বন্য বাঘগুলোকে সংরক্ষণ করতে ইন্দোনেশিয়া হয়তো কার্যকরী পদক্ষেপ নেবে না। ট্রাফিক সংগঠনের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার ক্রিস শেফার্ড বলেছেন, ‘এ ক্ষেত্রে জোরালো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।’ তিনি প্রায় ১৫ বছর ধরে ইন্দোনেশিয়ার বাঘ বাণিজ্যের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে আসছেন। ইন্দোনেশিয়ার বন মন্ত্রণালয়ের জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রজেক্টের পরিচালক টনি সোহারতানো জানিয়েছেন, বন্য প্রাণী শিকার ও ব্যবসা করার সঙ্গে জড়িতদের শা¯িÍ দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ভারতেও বাঘের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। সম্প্রতি সে দেশের সরকার এক জরিপে দেখেছে, দেশটিতে এখন বাঘ রয়েছে ১ হাজার ৪১১টি। যা আগের জরিপের চেয়ে প্রায় অর্ধেক কম। ভারতে ও বাঘের দেহের অংশ বিক্রির জন্য হত্যা ও বাঘের বাসস্থান ভেঙে ফেলার কারণে বাঘের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি বাঘ শুমারি চালয়। এর আগে দেশটিতে বাঘ শুমারি হয়েছিল ২০০১-২০০২ সালে। তখন বাঘের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৬৪২টি। একশ বছর আগে ভারতে বাঘ ছিল প্রায় ৪০ হাজার। বিভিন্ন তথ্য থেকে বিশ্বে নয় প্রজাতির বাঘ সম্পর্কে জানা গেছে। সেগুলো হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ইন্দো-চীন বাঘ, মালায়ান বাঘ, সুমাত্রান বাঘ, সাইবেরিয়ান বাঘ, চীন দেশীয় বাঘ, বালিনিজ অর্থাৎ বালি দ্বীপের বাঘ, জাভান অর্থাৎ জাভা দ্বীপের বাঘ ও কাস্পিয়ান বা পার্সিয়ান বাঘ। শেষের তিন প্রজাতির বাঘ এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে।চীন দেশীয় বাঘ প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার পথে রয়েছে। এ মুহ‚র্তে শুধু চীনের বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় মাত্র ৫৯টি এ প্রজাতির বাঘ রয়েছে। সব প্রজাতির বাঘের মধ্যে সাইবেরিয়ান বাঘ সবচেয়ে বড়। গড়ে এগুলো ২২৭ কেজি (৫০০ পাউন্ড) ওজনের হয়। এদের আমুর (অসঁৎ) টাইগারও বলা হয়। রয়েল বেঙ্গল টাইগার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাঘ। এ প্রজাতির বাঘ বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারে দেখা যায়। পুরুষ বাঘগুলো স্ত্রী বাঘের চেয়ে বড় হয় এবং গড়ে এদের ওজন হয় ২০৫-২২৭ কেজি (৪৫০-৫০০ পাউন্ড)। অবশ্য ভারতের উত্তর অঞ্চল ও নেপালে এ জাতীয় বাঘ বেশি ওজন (২৩৬ কেজি) হয়ে থাকে। সব প্রজাতির বাঘের মধ্যে সুমাত্রান বাঘ আকৃতিগতভাবে সবচেয়ে ছোট। এদের পুরুষ গোত্র গড়ে ৭ ফিট ৮ ইঞ্চি লম্বা ও ১৩৬ কেজি (৩০০ পাউন্ড) ওজনের হয়। এ প্রজাতির বাঘ শুধু ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম অঞ্চলীয় দ্বীপ সুমাত্রাতে দেখা যায়। বিশ্বে বাঘ নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংস্থা বিজ্ঞানীদের বরাত দিয়ে বলছে, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বিশে^র ২৭টি দেশে বাঘের ৮টি উপ-প্রজাতি (সুমাত্রান, ইন্দোচাইনিজ, দক্ষিণ চীনা, সাইবেরিয়ান, বেঙ্গল, বালিনিজ, ক্যাম্পিয়ান ও জাভান)-এর ১,০০,০০০টি বাঘ জীবিত ছিল। বর্তমানে এই সংখ্যা ক্রমহ্রাসের মাধ্যমে ১০,০০০টিতে এসে দাঁড়িয়েছে। আর তা মাত্র ১২টি দেশে দেখা যায়। কালের বিবর্তনে আবাসস্থল সংকোচন এবং অবাধ শিকারের ফলে এর ৩টি উপ-প্রজাতি : বালিনিজ ১৯৩০ সালে, এর ৪০ বছর পর ক্যাম্পিয়ান ১৯৭০ সালে এবং তার ১০ বছর পর জাভান ১৯৮০ সালে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে। বাকিরাও সংকটাপন্ন। বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘের যে উপ-প্রজাতিটি বাস করে তার ইংরেজি নাম ইবহমধষ ঞরমবৎ, ঞরমবৎ বা জড়ুধষ ইবহমধষ ঞরমবৎ এবং বৈজ্ঞানিক নাম চধহঃযবৎধ ঃরমৎরং ঃরমৎরং (খরহহধবঁং)।বাংলাদেশে সুন্দরবন ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, চীন ও রাশিয়ার পাহাড়ি চিরসবুজ এবং আংশিক চিরসবুজ বন, ঘাসে-ঢাকা ভ‚মি ও জলাভ‚মি, উš§ুক্ত বনভ‚মি এবং প্যারাবনে বেঙ্গল টাইগারের উপস্থি’তি রয়েছে। মানুষ সুন্দরবনের বাঘকে সংরক্ষণ করতে চাইলেও তাদের রক্ষা করা কঠিন হচ্ছে। কারণ গেল্গাবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রভাব আমাদেরদেশেও পড়ছে। এর ফলে আগামী ১০০ বছরে সুন্দরবনের বেশিরভাগ এলাকা তলিয়ে যেতে পারে। যে কারণে অনেক আগেই বিশ^বাসীর কাছে বাঙালির অহংকার রয়েল বেঙ্গল টাইগার হারিয়ে যাবে। আগামী প্রজন্মকে বাঘ দেখতে হলে শুধু নির্ভর করতে হবে চিড়িয়াখানার ওপর। আর তারপর এক সময় মিউজিয়ামে ছবি টাঙিয়ে বাঘকে প্রদর্শন করা হবে। এ দিনগুলো আসতে আমাদের যেন বহুকাল অপেক্ষা করতে হয় এ কামনাই করছি।
0 comments:
Post a Comment