Saturday, February 17, 2018

বায়োগ্যাস-বিকল্প জ্বালানির সম্ভাবনাময় উৎস

বায়োগ্যাস-বিকল্প জ্বালানির সম্ভাবনাময় উৎস
আলী ফোরকান 
সভ্যতার জন্ম মানুষের শ্রম ও মেধার সমন্বয়ে। সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি । প্রযুক্তি মানব সভ্যতাকে গুহা থেকে পৌঁছিয়েছে চাঁদে। বর্তমান সভ্যতার  সব চেয়ে আলোচিত বিষয় জ্বালানি সমস্যা। বাংলাদেশেও জ্বালানি সঙ্কট প্রকট। জ্বালানি সমস্যায় দেশের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি বিঘিœত ঘটছে। বাড়ছে জনগণের ভোগান্তি। দেশের ১৬ কোটি মানুষের মাত্র ৩৮ শতাংশ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। বিদ্যুৎ স্বল্পতার কারণে  ক্ষুদ্র এ জনসংখ্যাও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা পাচেছনা । উন্নত দেশগুলোয় বিকল্প জ্বালানির উৎস হিসেবে বায়োগ্যাস ব্যবহাহৃত হয়ে আসছে দীর্ঘ দিন ধরে। বাংলাদেশে ও বিকল্প জ্বালানির উৎস হিসেবে বায়োগ্যাস কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বায়োগ্যাস: কার্বন ভিত্তিক একমাত্র বিকল্প জ্বালানি। এটি প্রকৃতিতে সহজভাবে তৈরি এক ধরনের জ্বালানির উৎস। যাতে রয়েছে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক শক্তি। মাটির ও জলজ গাছপালা, মানুষ কিংবা পশু-পাখির বর্জ্য পদার্থ। আর শিল্প কারখানার পরিত্যক্ত কার্বন ভিত্তিক যৌগ হলো বায়োগ্যাস শক্তির মূল উৎস। বায়োগ্যাস শক্তিকে নবায়নযোগ্য বলা হয়। কারণ অতি সহজে এর কাচামাল সরবরাহ করা সম্ভব হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বে জ্বালানি শক্তি উৎপাদনে বায়োগ্যাস বেশ গুরুত্বপর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। আমেরিকা ভিত্তিক সংগঠন বি ই আর এ (ইঊজঅ) ’র গবেষণায় দেখা যায়, পৃথিবীতে যে পরিমাণ বায়োগ্যাস ভিত্তিক কার্বন জ্বালানি রয়েছে তা বর্তমান বিশ্বের মোট জ্বালানি চাহিদার একশ’ গুণেরও বেশি। বাংলাদেশে ১৯৬৯ সালে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড: করিম বায়োগ্যাস প্রযুক্তির উপর কাজ শুরু করেন। সে ধারাবাহিকতায়  বিসিএসআইআর’র জ্বালানি উইং ১৯৭৩ সালে এ প্রযুক্তির কাজ শুরু করে। সরকারি তথ্যমতে, দেশে বিগত ১০ বছরে  সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ২২ হাজার বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। ১৯৯৫ সালে সরকার এ তথ্য ও প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং স¤প্রসারণের উদ্যোগ নেয়।  ১৯৭৩ সাল থেকে একাধিক এনজিও এপ্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে। প্লানিং কমিশনের এক রিপোর্টে দেখা যায়, সরকারি উদ্যোগে স্থাপিত বায়োগ্যাস প্লান্টের ৯৯  ভাগই চালু আছে। আর বেসরকারি সংস্থার তৈরি প্লান্টের প্রায় ৫০ ভাগই অকেজো হয়ে পড়েছে। বিগত তিন বছরে গ্রামীণ শক্তি বায়োগ্যাস প্লান্ট তৈরী করেছে ৩৫০ টি। সরকারিভাবে বিসিএসআইআর’র মাধ্যমে বিগত দুই বছরে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে ১১’শ টি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সুত্রমতে, প্রথম পর্যায়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ হাজার। স্থাপিত হয়েছে মাত্র ৪ হাজার। দ্বিতীয় পর্যায়ে  (২০০১-০৪) ২০ হাজার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও স্থাপিত হয়েছে৭ হাজার ৪২৭ টি। এর মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে ৫’শ প্লান্টের স্থলে মাত্র ৫ টি প্লান্ট তৈরী করা হয়েছে। সরকারিভাবে মোট স্থাপন করা হয়েছে ১৩ হাজার ১০১ টি। সরকারের বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের জরিপ অনুযায়ী দেশে প্রায় ৪০ লাখ বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করা সম্ভব। এই উল্লেখিত বিপুল সংখ্যক প্লান্ট বাস্তবায়ন হলে জ্বালানি সঙ্কট যেমন উল্লেখযোগ্যভাবে লাঘব হবে তেমনি বছরে প্রায় ৪’শ কোটি সাশ্রয় হবে বলে মন্ত্রণালয়ের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। বুয়েটের অধ্যাপক ড: এম তামিম বলেন, মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি এবং ‘টেকনিক্যাল সাপোর্ট’ দেয়া হলে বায়োগ্যাস প্রযুক্তির এই বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগানো যেতে পারে। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে রান্নার জন্য ৯৫ ভাগ জ্বালানি আসে ‘বায়োমাস’ অর্থ্যাৎ বনাঞ্চল থেকে। এতে বন উজাড়সহ পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ইতোমধ্যেই অধিকাংশ বন ধ্বংস হয়েছে। তবে গণসচেতনতা সৃষ্টি হওয়ায় মানুষ ব্যক্তিগতভাবে বনায়ন করছে। ফলে জ্বালানি সংগ্রহের কারণে বন উজাড় হওয়ায় যে সমস্যা সৃষ্টির আশঙ্কা ছিল, তা হয়নি। বর্তমান অবস্থায় জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় বহুমুখী পদক্ষেপ  নেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বায়োগ্যাস প্লান্ট তৈরির উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। তিনি আরো বলেন, বায়োগ্যাস প্লান্ট থেকে জ্বালানি উৎপাদনের পাশাপাশি উন্নতমানের সার ও মাছের খাদ্য তৈরী করা সম্ভব। বুয়েটের এপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজি বিভাগ জানায়, ১৯৮০ সালে বায়োগ্যাস প্রযুক্তির এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র রয়েছে। নেপালের গবেষণা ইনষ্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড: লামা অচার্য্য বলেন,  বাংলাদেশে এ প্রযুক্তির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে চীনে ৮০ লাখ বায়োগ্যাস প্লান্ট 
স্থাপিত হয়েছে। ভারতে ২৫ লাখ এবং নেপালে এক লাখ প্লান্ট রযেছে। বিসিএসআইআর জানায়, একটি প্লান্টের কার্যকাল সর্বনিম্ন হবে ৩০ বছর। একটি প্লান্ট থেকে মাসে ১ হাজার টাকা সাশ্রয় হয়। এহিসেবে ১৩ হাজার প্লান্টে ৩০ বছরে সাশ্রয় হবে ৪৭৪ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এত ব্যয় হয়েছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৫’শ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে এবং জ্বালানি বাবদ দেয়া হচ্ছে ৩ হাজার কোটি টাকা। এতে সুফলভোগী হচ্ছে মোট জনসংখ্যার ৩৮ ভাগ। আর ৪০ লাখ বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনে মোট খরচ হবে ৬’শ কোটি টাকা। এতে মোট জনসংখ্যার ৩৭ ভাগ সুফল পাবে। জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং উদ্বুদ্ধ করতে সরকারি খরচে পারিবারিকভাবে স্থাপিত প্লান্টে তৈরী খরচ বাবদ ১৫ হাজার টাকা এবং  আগ্রহীকে ভর্তুকি দেয়া হতো ৭ হাজার টাকা। বাণিজ্যিক প্লান্টে তৈরী খরচ ১ লাখ টাকা থেকে দেড় লাখ টাকা এবং ভর্তুকি দেয়া হতো ৭৫ হাজার টাকা। বুয়েটের অপর এক গবেষণায় বলা হয়, সম্ভাবনাময় এপ্রযুক্তি বাংলাদেশে জ্বালানির উৎস হিসেবে মুখ্য ভুমিকা  পালন করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সম্ভনাময় খাতে সরকারের আরো ভুমিকা রাখা প্রয়োন।

0 comments:

Post a Comment