বেকার সমস্যা সমাধানে মাছ চাষ
আলী ফোরকান
জনবহুল বাংলাদেশে প্রচুর সংখ্যক বেকার রয়েছে। শুধুমাত্র সরকারী প্রয়াসে কোন দেশে কোন কালেই বেকার সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তবে সরকারী নীতির প্রয়াসে বেকার সমস্যা সমাধানের পথ প্রসস্থ হতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারী উদ্যোগ ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। তাছাড়া চিহিৃত ক্ষেত্রে যেমন মাছ চাষে যদি বেকারগন স্বউদ্যোগ আত্মকর্মসংস্থানের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তাতেও তারা সফলকাম হবেন বলে দৃঢ়বিশ্বাস করা যায়। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন তা হলো-জলাশয় ব্যবহারের সুযোগ, পুঁজি সরবরাহ অল্প বিনিয়োগ, বেশি মুনাফার ক্ষেত্র নির্বাচন, বাজারজাতকরণ সুবিধা ইত্যাদি।
বাংলাদেশের মাছ চাষ মুলত অভ্যন্তরীন বদ্ধ জলাশয় ভিত্তিক। বর্তমানে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীন জলাশয়ের পরিমাণ ৪৩ লক্ষ ৩৮ হাজার হেক্টর। তাতে মাছ চাষের যে কার্যক্রমগুলো জড়িত তা হলো- (১) উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি চাষ, (২) বাওড়ে মাছ চাষ এবং (৩) পুকুর দীঘিতে মাছ চাষ। উপকূলীয় চিংড়ি চাষ অঞ্চলে ১ লক্ষ ৪০ হাজার হেক্টর জলাশয়ের বাগদা চিংড়ি চাষ কার্যক্রমের সাথে বিপুল সংখ্যক জনশক্তি জড়িত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে চিংড়ির প্রাকৃতিক পোনা আহরণ, হ্যাচারি-নার্সারি ব্যবস্থাপনা, ঘের ব্যবস্থাপনা, চিংড়ি আহরণ, বাজারজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে রপ্তানী কার্যক্রমে বেকারগণ ব্যাপক অবদান রাখতে পারে। বাংলাদেশে বর্তমানে চিংড়ি চাষ কার্যক্রম সনাতন পদ্ধতির। তাতে হেক্টর প্রতি মাছ উৎপাদন মাত্র ১৫০-২০০ কেজি। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেকার জনগণকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করে এ উৎপাদন হার বৃদ্ধির কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। বাওড় এ বর্তমানে হেক্টর প্রতি গড় উৎপাদন মাত্র ৪০১ কেজি। এ ক্ষেত্রে বেকার জনগণকে সংগঠিত করে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে বাওড়ে মাছ চাষের মাধ্যমে হেক্টর প্রতি উৎপাদন আরো বহুগুন বৃদ্ধি করা সম্ভব।
বাংলাদেশের পুকুর-দিঘির জলায়তন ১ লক্ষ ৪৭ হাজার হেক্টর। এসব জলাশয়ের মধ্যে ৭৬ হাজার হেক্টর চাষাধীন। আর ৪৫ হাজার হেক্টর চাষযোগ্য এবং ২৬ হাজার হেক্টর পতিত জলাশয় রয়েছে। বদ্ধ জলাশয় থেকে গড়ে হেক্টর প্রতি উৎপাদনের পরিমাণ মাত্র ১,৫১৫ কেজি । যা অনায়াসেই ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার কেজিতে উন্নীত করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ও বেকার জনগণকে সংগঠিত করে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে পুকুর দিঘী ব্যবস্থাপনার কাজে লাগিয়ে হেক্টর প্রতি উৎপাদন বৃদ্ধির কাজে লাগানো যেতে পারে। তা ছাড়া পতিত ও চাষযোগ্য জলাশয় সংস্কার করে বেকারগণকে কাজে লাগিয়ে অধিক পরিমাণ জলাশয় মাছ চাষের আওতায় আনায়ন করা যেতে পারে।
মাছ চাষের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন জলাশয়! অথচ বেকারদের অনেকরই জলাশয় নেই। যদিও দেশের আনাচে কানাচে প্রচুর জলাশয় অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে। তা ছাড়া তাদের প্রশিক্ষণ এবং পুঁজির অভাবও তাদেরকে স্বউদ্যোগ মাছ চাষের পথে বাধা হয় আছে।
মাছ চাষের মাধ্যমে বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু চিহিৃত সমস্যা সমাধান করা প্রয়োজন। এসব সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে বেকার জনগোষ্ঠীকে মাছ চাষে সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে-
(ক) পতিত পুকুর-দিঘী বাধ্যতামূলকভাবে মাছ চাষের আওতায় আনয়নের জন্য পুকুর উন্নয়ন আইন, ১৯৩৯ এর আওতায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। এজন্যে জলাশয় ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বেকারগণকে অগ্রাধিকার প্রদান করা যেতে পারে।
(খ) পতিত পুকুর-দিঘী সরকারের নিজস্ব সম্পদের মাধ্যমে উন্নয়ন করে পার্শ্ববর্তী সংগঠিত বেকারগণকে মাছ চাষের সুযোগ প্রদান করা যেতে পারে। বেকারগণকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভূমিকা রাখতে পারে।
(গ) সরকারী জলাশয়ের প্রাপ্যতা ও ব্যবহারের অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে জলাশয়ের পার্শ্ববর্তী বেকার জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে কমপক্ষে ৫ থেকে ৭ বৎসরের জন্য জৈবিক ব্যবস্থাপনা ভিত্তিক ইজারা প্রদান করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে মুল লক্ষ্য হতে পারে স্বল্প ইজারা মূল্যের বিনিময়ে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন।
(ঘ) প্রশিক্ষনের অভাব মাছ চাষের একটা বড় অন্তরায়। বেকার জনগণকে মাছ চাষে ব্যাপক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তির রূপান্তর করা যেতে পারে।
(ঙ) ব্যক্তিগত পুঁজি স্বল্পতা মাছ চাষে একটি চিহিৃত বাধা। আর মাছ চাষের জন্য প্রয়োজন মূলত ক্ষুদ্র ঋণ। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্যাংকিং সেক্টর এসব ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। কাজেই বেকারদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্নতর কৌশল উদ্ভাবন ও প্রয়োগ করা যেতে পারে।
(ছ) প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বেকারগণকে ছোট ছোট গৃহাংগন চিংড়ির হ্যাচারি স্থাপনে সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে। তাতে চিংড়ির বাজার মূল্য অধিক হওয়ার কারণে এক্ষেত্রে থেকে বর্ধিত হারে আয় বাড়ানো সম্ভব হবে।
(ঙ) দেশে এখনও চিংড়ি / মাছের সম্পূরক খাদ্যের ঘাটতি রয়েছে। এক্ষেত্রে বেকারগণকে এগিয়ে আসার জন্য উৎসাহ প্রদান করা যেতে পারে।
এভাবে জলাশয় ব্যবহারের সুযোগ প্রদান, প্রশিক্ষণদান এবং পুঁজি সরবরাহের মাধ্যমে বেকার জনগণকে উদ্ধুদ্ধ করে মাছ চাষের মাধ্যমে বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য অত্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
0 comments:
Post a Comment