Monday, April 18, 2016

রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্র -গোষ্ঠীতন্ত্র- একনায়কতন্ত্র: রবীন্দ্রনাথ


রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্র -গোষ্ঠীতন্ত্র- একনায়কতন্ত্র: রবীন্দ্রনাথ
আলী ফোরকান
আমি ছেড়েই দিতে রাজি আছি সুসভ্যতার আলোক,
আমি চাই না নতে নববঙ্গে নবযুগের চালক।
ক্ষণিকার ‘জন্মান্তর’ কবিতার গোড়াতেই রবীন্দ্রনাথ বলছেন।
আবার পরে পুনশ্চর ‘নতুন কাল’ কবিতায় বলছেনÑ
আমার বাণীকে দিলেম সাজ পরিয়ে
তোমাদের বানীর অলঙ্কারে;
তাকে রেখে দিয়ে গেলেম পথের ধারে পান্থশালায়,
পথিক বন্ধু তোমারি কথা মনে করে।
যেন সময় হলে একদিন বলতে পারো
মিটলো তোমাদেরও প্রয়োজন
লাগলো তোমাদেরও মনে।
হয় তো এই দুই কবিতাই তাঁর নানা রকম কবি সুলভ মুড-বদলের ফসল। তবু বোঝা যায় অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ এই সময়ধারার সম্পর্কে একটা সেচতন চিন্তা বিনিসুুতোর মতো অনুসৃত ছিল তাঁর চিত্তজগতে। না থাকাটাই অবশ্য আশ্চর্য। জীবনের ৬০ বছর ধরেই তো তিনি ছিলেন আমাদের মুকুটহীন পোয়েট লরিয়েট। যোগ দিয়েছেন বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে, রাজনীতির অনৈতিক চেহারা মেনে নিতে পারেননি বলে সরেও এসেছিলেন, কিন্তু হিজলি জেলে বন্দিদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদ করতেও তাঁর আটকায় নি। জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যালীলার প্রতিবাদে নাইটহুড ত্যাগ করতেও  তাঁকে দুবার ভাবতে হয় নি। তাঁর এই সব প্রতিবাদ ছিল একেবারে একক, কোনো সংঘশক্তি দূরের কথা, গান্ধিজীর মতো তখনকার সর্বভারতীয় সর্বমান্য নেতা পর্যন্ত তাঁর পাশে ছিলেন না। এই কবি অল্প বয়সে শিলাইদহের জমিদারির পূণ্যাহে হিন্দু ও মুসলমান প্রজাদের সমান আসনে বসিয়ে নিজে জমিদারি সিংহাসন থেকে নেমে এসে বিপ্লব করেছিলেন শান্ত মুখে। কৃষি ব্যাংক লোকশিল্পের প্রসারের চিন্তাও এই কবি একা হাতেই করেছিলেন।
‘ শেষ সপ্তক’ কাব্যে তিনি বলছেন :
আজ শরতের আলোয় এই যে চেয়ে দেখি
মনে হয়, এ যেন আমার প্রথম দেখা।
আমি দেখলেম নবীনকে
প্রতিদিনের ক্লান্ত চোখ
যার দর্শন হারিয়েছে।
অনাগত যুগ থেকে
তীর্থযাত্রী আমি
 ভেসে এসেছি মন্ত্র বলে।
উজান স্বপ্নের স্রোতে
পৌঁছলেম এই মুহূর্তেই
বর্তমান শতাব্দীর ঘাটে।
কেবল তাকিয়ে আছি উৎসুক চোখে।
আপনাকে দেখছি আপনার বাইরেÑ
অন্য যুগের অজানা আমি
অভ্যন্ত পরিচয়ের পরপারে
যিনি একই সঙ্গে ত্রিকালকে নিজের মধ্যে আত্মস্থ করে নিচ্ছেন বারবার, চোখের  ক্লান্তিকে পরিহার করে নবীনকে দেখার উৎসুক চোখের প্রবর্তন করছেন নিজের মধ্য, তাঁকে আমরা অনায়াসে সব কালের গ্রহিতা বলে চিনে নিতে পারি। তাঁর এক জীবনে বহু জীবনের উপযুক্ত কাজ করে ফেলার মধ্যে দেখতে পাই তাঁর অনায়াস দূরদর্শিতা। জীবনযাপনে প্রত্যেক যুগ কিছু নতুনের আয়োজন করে থাকে হয়তো তা আনা নতুন। নতুনের আঁধারে পুরনোরই পুনরজ্জীবন,তবু সে সময়ের মানুষ মনে করে আনন্দ পায় সে কিছু বদলেছে, প্রগতির পথে এগিয়েছে। এই যে আমরা বিবাহের বিকল্প হিসেবে একত্র-বাসের দিকে ঝুঁকছি ভাবছি এ ইউরোপ থেকে আমদানি নব্য মানসিকতা, প্রগতিশীলতা, আসলে কিন্তু এটা সভ্যতার আদিমতম অভ্যাসে ফিরে যাওয়া। রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্র রূপান্তর ঘটালাম আমরা। রাষ্ট্র ব্যবস্থার সবিস্ময়ে দেখছি গণতন্ত্রের মধ্য থেকে নির্ভুল মাথা তুলছে গোষ্ঠীতন্ত্র, অবশেষে সেই একনায়কতন্ত্র।
সুখ চাহি নাই মহারাজÑ
জয়, জয় চেয়েছিনু, জয়ী আমি আজ।
ক্ষুদ্র সুখে নাহি ভরে ক্ষত্রিয়ের ক্ষুধা।
....একা সকলের ঊর্ধ্বে মস্তক আপন
যদি না রাখিবে রাজা, যদি বহুজন
বহু দূর হতে তার সমুদ্ধত শির
নিত্য না দেখিতে পায় অব্যহত স্থির...
ক্ষমতালোভী মানুষের চিরকাল এই মনের কথা।
উপরন্তু আমরা নিজেদের প্রয়োজনে সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তার খাতিরে যৌথ পরিবার সৃষ্টি করেছিলুম। তারপর একদিন কৃষিসম্পদলব্ধ ধন আমাদের চলে গেল। প্রত্যেকে আমরা একক ভাবে উপার্জনশীল হয়ে উঠলাম। একটি কয়েক মহল্লা কয়েকতল বাড়ি ভেঙে আমরা সিঙ্গল ইউনিটের বাড়ি চাইলাম। এবার আকাশ দখল করে শুরু হল আমাদের বসত গড়া। কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছি এই সব হাউজিং কমপ্লেক্স এক ধরনের যৌথ পরিবারই। সেই নিরাপত্তাই সে আমাদের দেয়। আবার দেয় সেই কুটকচালিও, যা পেছনে ফেলে আসতে চেয়েছিলাম আমরা। যে পরিবার বেশি অর্থবান, বেশি ক্ষমতাশালী সে ছড়ি ঘোরাতে যায়। প্রায়শ সফলও হয়। বাইরের খোলসটার বদল হয়েছে। ভেতরে ভেতরে আমরা কী রাজনীতিতে কী পরিবারনীতিতে কী সমাজনীতিতে মূলত এক রয়ে গেছি। ভেতরের বস্তু এক, বাইরের প্যাকেজ পাল্টে গেছে। মানুষ যে কোথাওই এগোয়নি এ কথাটা অবশ্য ঠিক না। সে উদ্ভাবন করেছে, আবিষ্কার করেছে বিস্তর। জ্ঞানার্জনে এগিয়ে গেছে অনেক। তার সাহিত্য শিল্প সঙ্গীত আরও ব্যাপ্ত হয়েছে, পরিণত হয়েছে। তা হলে ? আসলে হৃদয় আর মস্তিষ্ক দুটো নিয়ে মানুষ। তারপরেও থাকে মানবিকতা বলে কোনো সুক্ষ্ম অধরা গুণ যা মানুষের সার। এই জায়গায় মানুষ কিছুমাত্র বদলায়নি। কোনো রূপান্তর ঘটেনি তার। তাই যা-ই করতে যায়। কোথাও না কোথাও এসে মার খেয়ে যায় সে। জীবনের যে কোনো ক্ষেত্রে-বিজ্ঞান বলুন দর্শন বলুন, শিল্প সাহিত্য বলুন, সর্বত্র কী করে অপরের প্রতিভাকে ছোট করা যায়, অস্বীকার করা যায়, কী করে একটা চেষ্টা ব্যক্তিগত বা সংঘবদ্ধ, পুরু করা যায় তারই চেষ্টায় ক্লিন্ন হয়ে উঠছে, এমন কি সংস্কৃতির জগৎও। নাম যার সংস্কৃতি সেখানেই আজ পরিশীলিত মনোভাবের অভাব সবচেয়ে বেশি। এমনটা কেন হল? এক তো হোমো স্যাপিয়েন্স আমরা বহু দিন ধরে এক জায়গায় বসে আছি আমাদের মধ্যে কেনো বিবর্তনমুখিতা নেই। আমরা কোনো উচ্চতর জীবনের আকাংক্ষায় এখনও একাগ্র হয়নি। দ্বিতীয়ত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় মধ্যে দূরদর্শিতা অভাব আছে। জীবন যাপনের প্রাথমিক শর্তগুলো আমরা অগ্রাহ্য করে থাকি। আমাদের যে পরস্পরের প্রতি সহ্যশীল হতে হবে, কাউকেই অপর, ওরা বলে ঠেলে রাখলে চলবে না, এই সমন্বয়ধর্মী শিক্ষা আজও চালু হল না। ব্যবধান, আর দলবাজি  বেড়েই চলেছে, বেড়েই চলেছে।
৩.
রবীন্দ্রনাথ এই জায়গাটিকে ধরতে পেরেছিলেন। এই জায়গাটিকে ছুঁয়ে থাকতে বলেছিলেন আমাদের। আর সেই জন্যই তাঁর শান্তিনিকেতন সৃষ্টি, তারও ওপরে বিশ্বভারতী, যত্র বিশ্ব ভবত্যেকনীড়ম। যদি সব দেশের সব রকম সমাজের সঙ্গে আমাদের সামাজিক ব্যবহারিক সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান অবারিত হয়, যদি থাকে প্রকৃতির কোলে ন্যূনতম উপকরণ নিয়ে জীবনযাপনের অভ্যাস। তাহলে পৃথিবীর বিপুল ঐশ্বর্যের ধারণা আমাদের ভিতরে সঠিক মনোভঙ্গিটি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। আমরা পৃথিবীর যাবতীয় বিত্তের যথার্থ উত্তরাধিকারী হতে পারব। শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে একটা চিরবস্তু আছে। সেই চিরবস্তুকে কোনো যুগের তাৎক্ষণিক তাগিদেই পাল্টানো চলে না। প্রথমে মানুষকে মানুষ হতে হবে। তারপর কারিগর। তারপরে চাকুরে, তারপরে বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, গায়ক, চিত্রকর, অধ্যাপক, ব্যবসায়ী। প্রত্যেক মানুষের চারপাশে থাকবে জীবিকা ছাড়াও নিজেকে ছড়িয়ে দেবার নানান অবকাশ। নানা উপভোগের সামর্থ্য। এই বহুতার বীজ কিন্তু আমাদের মধ্যে আছে, বর্তমান জীবন তাকে মান দিতে গিয়েও দিচ্ছে না। এখনকার মা বাবারা ছেলেমেয়েদের সর্ব শাস্ত্রবিশারদ করে তুলতে চান বলে আমরা উপহাস করি। কিন্তু এর একটা ইতিবাচক দিক আছে। অনেক দিকে শিশুর চোখ খুলে যায়। আপত্তি হচ্ছে জবরদস্তিতে, ক্রমাগত চাপ বাড়িয়ে যাওয়াতে। তা ছাড়াও কিন্তু অর্থ উপার্জন যাতে বেশি হবে সে দিকে সন্তনকে ঠেলার মানসিকতাও কাজ করে। মনে মনে জানি তাকে ডাক্তার গড়তে চাইছি তার প্রবণতার জন্য নয়। বেশি উপার্জনের লোভে, এবং গড়তে গিয়ে তার মধ্যেকার সত্যিকার গায়কটিকে পুরো মেরে ফেলা হচ্ছে। তার ফল ভালো হবে না সম্পদ উৎপাদন করতে গিয়ে বলি দিতে হচ্ছে মানুষেরই ঘরবাড়ি। সে একদিন কৈফিয়ত চাইবেই। জানি যন্ত্র আরও উন্নত যন্ত্র তৈরি করতে গিয়ে কোথাও সে মানুষকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত, জ্ঞানের বাইরের উপকরণের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে। অকারণ নির্ভরশীলতা কখনো কোনো ক্ষেত্রেই কাম্য হতে পারে না। তাতে এক দিক থেকে যেমন প্রকৃতিকে উচ্ছন্ন করা হচ্ছে, আরেক দিক থেকে তেমন সংকীর্ণ করে ফেলা হচ্ছে মানুষকে। তার ফল সভ্যতাকে ভোগ করতে হবেই। যেমন সে ভোগ করছে দেশ বিভাগের ক্ষত। চতুর্দিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাস। বিশ্ব জুড়ে আবহাওয়ার অবনতি নতুন নতুন রোগ, অস্থির সমাজ। আসলে প্রত্যেকে যাতে রবীন্দ্রনাথ হতে পারে এমন একটা শিক্ষা ব্যবস্থাই রবীন্দ্রনাথ তৈরি করে যেতে চেয়েছিলেন। ছকটা নিয়েছিলেন মূলত ঠাকুরবাড়ির পরিমন্ডল, থেকে। দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে হিমালয় যাত্রা, কুস্তির আখড়ায় গা ঘামানো, চাকরদের তত্ত্বাবধানে অতি সামান্য জামা জুতোয় কালযাপন, নতুন দাদার পিয়ানোর সুরের সঙ্গে বাণী যোজনা, বাড়িতেই বেরোচ্ছে বালক পত্রিকা তাতে লেখা, অভিনয় হচ্ছে তাতে যোগ দেওয়া, ওদিকে দার্শনিক কাব্য লিখছেন বড়দাদা। এই পুরো আবহাওয়াটা শিক্ষায় দরকার, তিনি জীবন দিয়ে তা বুঝেছিলেন। প্রত্যেকের পুরো রবীন্দ্রনাথ হওয়া তো সম্ভব নয়, কিন্তু একটি  বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের দিকে তিনি ছাত্রদের নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। জীবনকে বিন্যস্ত করতে হবে এই বিপুল বহুধা অতুল ঐশ্বর্যময়ী পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে। একমাত্র এই সহাবস্থানের মধ্য দিয়েই একটা পরিপূর্ণ জীবন সম্ভব। তাঁর এই উপলব্ধি তাঁর বিশ্বভারতী তথা শান্তি নিকেতন চিন্তার মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের কাছে গচ্ছিত রেখে গেছেন। ঘরে বাইরে বা তার অধ্যায় এর সত্য যেমন আজও উদঘাটিত হয়ে থাকে তাঁর স্বপ্নদর্শন, শিক্ষাবিষয়ক। খুবই যে আইডিয়ালিস্টিক, প্রয়োগ-প্রতিকুল সে স্বপ্ন, তাও কিন্তু নয়। যতই আজকের শাস্তিনিকেতনে তা অবমানিত হোক। একজন কবি কেন তাঁর জীবনকে বাজি রেখে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছিলেন বিশ্বভারতীর জন্য অর্থ সংগ্রহের কাজে? কেনই বা নোবেল পুরস্কার পেয়ে শান্তিনিকেতনের ড্রেনেজ সমস্যার সমাধান হয়ে গেল  বলে আনন্দ করেছিলেনÑ রবীন্দ্রমানসে কী সাংঘাতিক জরুরি ছিল এই শিক্ষানীতি আমাদের জাতীয় জীবনের জন্য- আমাদের বোঝা চাই, তবেই বুঝব কোন নিত্য বিন্দুতে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান আমাদের এ কালের জীবন পরিকল্পনায়। 
 লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
০১৭১১৫৭৯২৬৭

0 comments:

Post a Comment