বিপন্ন চা শিল্প: কর্মসংস্থান সৃষ্টির নির্ভরতার প্রতীক
ড.ফোরকান আলী
পাঁচ হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাসের অধিকারী চা শিল্প। সৃষ্টিশীল সাধুরূপী ‘শেনঙ’ কর্তৃক চৈনিক পুরাণে চায়ের ইতিবৃত্ত সন্নিবেশিত আছে। আড়াই হাজার বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশে ভগবান গৌতম বুদ্ধের জীবনকাহিনীতে চা পাতার অস্বিত্ব গুরুৃত্বের সাথে বর্ণিত রয়েছে। শীতল, তেতো ও কষাটে স্বাদের অধিকারী চা নানাবিধ মাত্রার জারকে জারিত হয়ে সুস্বাদু পানীয়তে রূপান্তরিত হয়। ক্যাফিন, থিয়োব্রোমিন, থিয়োমাইলিন, থিয়ানিন প্রভৃতি অ্যালকালয়েডের অন্যতম ভেষজ উৎস চা। উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, ক্যান্সার, পেটের বিবিধ পীড়া, দন্ত চিকিৎসা, ডায়াবেটিস, লিভারের অসুখ, ওজন হ্রাস, জয়েন্টে ব্যথা নিরাময়ে ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহƒত হয় নিয়মিত মাত্রা ও পরিমাপক চা। লাশ সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় চা পাতার গুণাগুণ সর্বজনগ্রহণীয়। স্বাদের বিচিত্র শিক্ষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পৃথিবীব্যাপী ফল, ফুল, মসলা, দুধ, চিনি, মিষ্টি নানা উপকরণের মিশ্রণ করা হয় চাতে। মার্জিত কৌলিন্য, অভিজাত ব্যক্তিত্বের আলোকছটায় স্বজনবৃত্তে আলোকিত চা উপমহাদেশের ইতিহাসে মাত্র পৌনে দুই শ’ বছরের ঐতিহ্য। ঔপনিবেশিক আমলে বিনা পয়সায় চা খাওয়ানোর কাহিনী এখনো অনেকের মুখে মুখে। ব্রিটিশ চা কোম্পানিগুলো বাণিজ্যিক কৌশলে বাঙালি মস্তিক উদীপ্ত করতে ভারতের আসাম এবং তৎসংলগ্ন সিলেট অঞ্চলে চা চাষ কার্যক্রম সূচনা করে ১৮২৩ সালে। ১৮৪৪ সালে চট্টগ্রাম ক্লাব তৎপরবর্তী সময়ে সিলেটের মালনিছরায় প্রথম বণিজ্যিক চা বাগান প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে ১৬৩টি বাগানে ৫২ হাজার হেক্টর জমি চা চাষে সমৃদ্ধ, কিন্তু বরাদ্দ এক লাখ ১৫ হাজার হেক্টর জমি। ১৩৩টি রয়েছে সিলেট বিভাগে, চট্টগ্রামে রয়েছে ২৫টি। দেশের উত্তর জনপদ পঞ্চগড়ে সৃজন করা হয়েছে পাঁচটি। এর মধ্যে বিদেশী মালিকানায় ২৮টি, পাবলিক লিমেটেড কোম্পানির ৫৩টি, ন্যাশনাল টি কোম্পানির ১৩টি, চা বোর্ডের অধীনে তিনটি, ব্যক্তি মালিকানায় ৬৬টি বাগান ব্যবস্থাপনায় চলমান। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবানসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকাকে চা চাষে এবং শিল্পে রূপান্তর করার উপযোগিতা রয়েছে। ১৬৩টি বাগানে উৎপাদিত বার্ষিক ৫৭ মিলিয়ন কেজি চায়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রফতানি আয় হতো। চা ছিল রফতানি পণ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম অবস্থানে। আয় হতো বার্ষিক মোট রফতানি আয়ের ২০ শতাংশ। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার অভাবে চা শিল্প এখন বিপর্যয়ের মুখোমুখি। ৪৪টি বাগানে দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির চা রুগ্ন। ১৬টি বাগানে আশানুরূপ উৎপাদন নেই। গুণগত মানে ক্রমাবনতি ঘটে রফতানি আয় নিুমুখী। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির হার ৪.৫ শতাংশ। উৎপাদন এবং গুণগত মান বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষার উদ্যোগ শক্তিশালী হয়নি। বাংলাদেশের গুণগত উৎকৃষ্ট চা সারা বিশ্বে ছিল জনপ্রিয়তার এক নম্বরে। কথিত আছে, ব্রিটেনের রাজপরিবারের চা পানের তৃপ্তি মিটত বাংলার চা দিয়ে। ৬০-১০০ বছর বয়সী গাছ থেকে অবৈজ্ঞানিক পন্থায় পাতা সংগ্রহ প্রক্রিয়া এবং বাজারজাতকরণে বাংলার বিখ্যাত চা ইতিহাসের পাতায় স্থান পাচ্ছে। বাংলার চায়ের বাজার দখল করছে যথারীতি ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এবং অতি সম্প্রতি কেনিয়া। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সংযুক্ত করে ভারত গুণগত মানের চা উৎপাদন করে হেক্টরপ্রতি ১৬৭৮ কেজি, শ্রীলঙ্কা ১৫৬৬ কেজি, কেনিয়া ২২৩৫ কেজি। সেখানে বাংলাদেশের উৎপাদন ১২৪৭ কেজি মাত্র। প্রযুক্তি ও গুণগত অবস্থানের কারণে সবুজ শ্যামল সুষম চায়ের বাগান সংস্কার, উন্নয়ন ও পরিচর্যাহীনতায় সমস্যার বেড়াজালে বন্দী রফতানি শিল্প চা। বাংলাদেশসহ বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৩০টি দেশ লাভজনক চা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে প্রক্রিয়ায় জড়িত। গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় এবং ঔষধি গুণে গুণানি¦ত দামি গ্রিন টির উৎপাদন বাংলাদেশে খুবই কম। দেশে উৎপাদিত চায়ের ৭৬ শতাংশই স্বাভাবিক গুণ ও দামের সহজলভ্য ব্ল্যাক টি। চার ধরনের মৌলিক চায়ের মধ্যে ক্রমবর্ধনশীল জনপ্রিয় ওলং টি এবং হোয়াইট টি চাষ পরিকল্পনা এখনো স্বপ্নাশ্রয়ী। পূর্ব, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে চা চাষপ্রক্রিয়া চলছিল দীর্ঘদিন। বাগান ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি পরিকল্পনা প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং দূরদর্শী বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে তিন-চারটি দেশ যেখানে চা শিল্পের বাজার দ্রুত দখলে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সেখানে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর ভারতীয় বংশোদ্ভূত চা শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে রফতানি পণ্য চায়ের বিশাল বাজার ক্রমান¦য়ে হারাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী বার্ষিক ৩৯০ কোটি কেজি চাহিদার বিপরীতে বাংলাদেশে উৎপাদন হয়েছে গতবার মাত্র পাঁচ কোটি ৮০ লাখ কেজি। ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ চাহিদা সাড়ে চার কোটি কেজি পূরণের পর বাকি চা রফতানির প্রচেষ্টা চলে। বাংলাদেশের চায়ের চাহিদা রয়েছে আফগানিস্তান, কাজাখস্তান, পোল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, গ্রিস, কেএসএ, ওমান, আরব আমিরাতসহ প্রায় ৪০টি দেশে। অথচ উৎপাদন, জোগান, সরবরাহ পরিকল্পনা বৃদ্ধি করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১০ লাখ লোকের চলমান কর্মসংস্থানে গতিশীলতা আনা হয়নি। পার্বত্য জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও চা বাগান সংলগ্ন এলাকার কিছু কর্মক্ষম তরুণকে চা চাষে উদ্বুদ্ধকরণ ও সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। তা-ও বিচ্ছিন্নভাবে। স্বদেশ, স্বজাতি, স্বভাষা ও স্বাধীন অর্থনীতিকে অবলম্বন করার বাস্তববাদী পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বর্তমান যুগ প্রযুক্তিপ্রীতির যুগ। অনেক দেশ প্রতিটি পণ্যভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা কোর্স কার্যক্রম চালু করে প্রতিষ্ঠা করেছে প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা প্রযুক্তিবিদ্যা শিক্ষা কোর্স। বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ব্যবসায়িক মূলধন জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে পরিণত করছে। সুফল ভোগ করে নিরবচ্ছিন্ন অগ্রগামী হয়ে বিশ্ব অর্থনীতি শাসন করছে। আমাদের দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ, আবহাওয়া বিস্তীর্ণ চা চাষ উপযোগী ভূ-কে প্রয়োজনীয় সংস্কার, উন্নয়ন ও পরিচর্যা করে চা শিল্পে স্বয়ংসম্পন্নতা অর্জনে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট শিল্পের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা প্রযুক্তিবিদ্যা শিক্ষা কোর্স কার্যক্রম চালু করা। চা শিল্পে ডিপ্লোমাপ্রাপ্ত প্রযুক্তিবিদরা আধুনিক সরঞ্জামাদি ব্যবহার পদ্ধতি প্রতিস্থাপন করবেন। প্রাগৈতিহাসিক আমলের বীজ পদ্ধতির পরিবর্তে ক্লোন পদ্ধতি চালু করবেন। পরিবর্তিত বিশ্ব মোকাবেলায় সর্বময় ব্যবস্থাপনা সংযুক্ত করে চায়ের হারানো গৌরব ফিরিয়ে এনে চাকে আধুনিক শিল্পের মর্যাদা দিতে সচেষ্ট হবেন। চা হয়ে উঠবে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং স্বনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির নির্ভরতার প্রতীক।লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
ড.ফোরকান আলী
পাঁচ হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাসের অধিকারী চা শিল্প। সৃষ্টিশীল সাধুরূপী ‘শেনঙ’ কর্তৃক চৈনিক পুরাণে চায়ের ইতিবৃত্ত সন্নিবেশিত আছে। আড়াই হাজার বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশে ভগবান গৌতম বুদ্ধের জীবনকাহিনীতে চা পাতার অস্বিত্ব গুরুৃত্বের সাথে বর্ণিত রয়েছে। শীতল, তেতো ও কষাটে স্বাদের অধিকারী চা নানাবিধ মাত্রার জারকে জারিত হয়ে সুস্বাদু পানীয়তে রূপান্তরিত হয়। ক্যাফিন, থিয়োব্রোমিন, থিয়োমাইলিন, থিয়ানিন প্রভৃতি অ্যালকালয়েডের অন্যতম ভেষজ উৎস চা। উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, ক্যান্সার, পেটের বিবিধ পীড়া, দন্ত চিকিৎসা, ডায়াবেটিস, লিভারের অসুখ, ওজন হ্রাস, জয়েন্টে ব্যথা নিরাময়ে ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহƒত হয় নিয়মিত মাত্রা ও পরিমাপক চা। লাশ সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় চা পাতার গুণাগুণ সর্বজনগ্রহণীয়। স্বাদের বিচিত্র শিক্ষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পৃথিবীব্যাপী ফল, ফুল, মসলা, দুধ, চিনি, মিষ্টি নানা উপকরণের মিশ্রণ করা হয় চাতে। মার্জিত কৌলিন্য, অভিজাত ব্যক্তিত্বের আলোকছটায় স্বজনবৃত্তে আলোকিত চা উপমহাদেশের ইতিহাসে মাত্র পৌনে দুই শ’ বছরের ঐতিহ্য। ঔপনিবেশিক আমলে বিনা পয়সায় চা খাওয়ানোর কাহিনী এখনো অনেকের মুখে মুখে। ব্রিটিশ চা কোম্পানিগুলো বাণিজ্যিক কৌশলে বাঙালি মস্তিক উদীপ্ত করতে ভারতের আসাম এবং তৎসংলগ্ন সিলেট অঞ্চলে চা চাষ কার্যক্রম সূচনা করে ১৮২৩ সালে। ১৮৪৪ সালে চট্টগ্রাম ক্লাব তৎপরবর্তী সময়ে সিলেটের মালনিছরায় প্রথম বণিজ্যিক চা বাগান প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে ১৬৩টি বাগানে ৫২ হাজার হেক্টর জমি চা চাষে সমৃদ্ধ, কিন্তু বরাদ্দ এক লাখ ১৫ হাজার হেক্টর জমি। ১৩৩টি রয়েছে সিলেট বিভাগে, চট্টগ্রামে রয়েছে ২৫টি। দেশের উত্তর জনপদ পঞ্চগড়ে সৃজন করা হয়েছে পাঁচটি। এর মধ্যে বিদেশী মালিকানায় ২৮টি, পাবলিক লিমেটেড কোম্পানির ৫৩টি, ন্যাশনাল টি কোম্পানির ১৩টি, চা বোর্ডের অধীনে তিনটি, ব্যক্তি মালিকানায় ৬৬টি বাগান ব্যবস্থাপনায় চলমান। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবানসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকাকে চা চাষে এবং শিল্পে রূপান্তর করার উপযোগিতা রয়েছে। ১৬৩টি বাগানে উৎপাদিত বার্ষিক ৫৭ মিলিয়ন কেজি চায়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রফতানি আয় হতো। চা ছিল রফতানি পণ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম অবস্থানে। আয় হতো বার্ষিক মোট রফতানি আয়ের ২০ শতাংশ। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার অভাবে চা শিল্প এখন বিপর্যয়ের মুখোমুখি। ৪৪টি বাগানে দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির চা রুগ্ন। ১৬টি বাগানে আশানুরূপ উৎপাদন নেই। গুণগত মানে ক্রমাবনতি ঘটে রফতানি আয় নিুমুখী। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির হার ৪.৫ শতাংশ। উৎপাদন এবং গুণগত মান বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষার উদ্যোগ শক্তিশালী হয়নি। বাংলাদেশের গুণগত উৎকৃষ্ট চা সারা বিশ্বে ছিল জনপ্রিয়তার এক নম্বরে। কথিত আছে, ব্রিটেনের রাজপরিবারের চা পানের তৃপ্তি মিটত বাংলার চা দিয়ে। ৬০-১০০ বছর বয়সী গাছ থেকে অবৈজ্ঞানিক পন্থায় পাতা সংগ্রহ প্রক্রিয়া এবং বাজারজাতকরণে বাংলার বিখ্যাত চা ইতিহাসের পাতায় স্থান পাচ্ছে। বাংলার চায়ের বাজার দখল করছে যথারীতি ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এবং অতি সম্প্রতি কেনিয়া। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সংযুক্ত করে ভারত গুণগত মানের চা উৎপাদন করে হেক্টরপ্রতি ১৬৭৮ কেজি, শ্রীলঙ্কা ১৫৬৬ কেজি, কেনিয়া ২২৩৫ কেজি। সেখানে বাংলাদেশের উৎপাদন ১২৪৭ কেজি মাত্র। প্রযুক্তি ও গুণগত অবস্থানের কারণে সবুজ শ্যামল সুষম চায়ের বাগান সংস্কার, উন্নয়ন ও পরিচর্যাহীনতায় সমস্যার বেড়াজালে বন্দী রফতানি শিল্প চা। বাংলাদেশসহ বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৩০টি দেশ লাভজনক চা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে প্রক্রিয়ায় জড়িত। গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় এবং ঔষধি গুণে গুণানি¦ত দামি গ্রিন টির উৎপাদন বাংলাদেশে খুবই কম। দেশে উৎপাদিত চায়ের ৭৬ শতাংশই স্বাভাবিক গুণ ও দামের সহজলভ্য ব্ল্যাক টি। চার ধরনের মৌলিক চায়ের মধ্যে ক্রমবর্ধনশীল জনপ্রিয় ওলং টি এবং হোয়াইট টি চাষ পরিকল্পনা এখনো স্বপ্নাশ্রয়ী। পূর্ব, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে চা চাষপ্রক্রিয়া চলছিল দীর্ঘদিন। বাগান ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি পরিকল্পনা প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং দূরদর্শী বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে তিন-চারটি দেশ যেখানে চা শিল্পের বাজার দ্রুত দখলে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সেখানে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর ভারতীয় বংশোদ্ভূত চা শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে রফতানি পণ্য চায়ের বিশাল বাজার ক্রমান¦য়ে হারাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী বার্ষিক ৩৯০ কোটি কেজি চাহিদার বিপরীতে বাংলাদেশে উৎপাদন হয়েছে গতবার মাত্র পাঁচ কোটি ৮০ লাখ কেজি। ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ চাহিদা সাড়ে চার কোটি কেজি পূরণের পর বাকি চা রফতানির প্রচেষ্টা চলে। বাংলাদেশের চায়ের চাহিদা রয়েছে আফগানিস্তান, কাজাখস্তান, পোল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, গ্রিস, কেএসএ, ওমান, আরব আমিরাতসহ প্রায় ৪০টি দেশে। অথচ উৎপাদন, জোগান, সরবরাহ পরিকল্পনা বৃদ্ধি করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১০ লাখ লোকের চলমান কর্মসংস্থানে গতিশীলতা আনা হয়নি। পার্বত্য জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও চা বাগান সংলগ্ন এলাকার কিছু কর্মক্ষম তরুণকে চা চাষে উদ্বুদ্ধকরণ ও সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। তা-ও বিচ্ছিন্নভাবে। স্বদেশ, স্বজাতি, স্বভাষা ও স্বাধীন অর্থনীতিকে অবলম্বন করার বাস্তববাদী পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বর্তমান যুগ প্রযুক্তিপ্রীতির যুগ। অনেক দেশ প্রতিটি পণ্যভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা কোর্স কার্যক্রম চালু করে প্রতিষ্ঠা করেছে প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা প্রযুক্তিবিদ্যা শিক্ষা কোর্স। বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ব্যবসায়িক মূলধন জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে পরিণত করছে। সুফল ভোগ করে নিরবচ্ছিন্ন অগ্রগামী হয়ে বিশ্ব অর্থনীতি শাসন করছে। আমাদের দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ, আবহাওয়া বিস্তীর্ণ চা চাষ উপযোগী ভূ-কে প্রয়োজনীয় সংস্কার, উন্নয়ন ও পরিচর্যা করে চা শিল্পে স্বয়ংসম্পন্নতা অর্জনে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট শিল্পের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা প্রযুক্তিবিদ্যা শিক্ষা কোর্স কার্যক্রম চালু করা। চা শিল্পে ডিপ্লোমাপ্রাপ্ত প্রযুক্তিবিদরা আধুনিক সরঞ্জামাদি ব্যবহার পদ্ধতি প্রতিস্থাপন করবেন। প্রাগৈতিহাসিক আমলের বীজ পদ্ধতির পরিবর্তে ক্লোন পদ্ধতি চালু করবেন। পরিবর্তিত বিশ্ব মোকাবেলায় সর্বময় ব্যবস্থাপনা সংযুক্ত করে চায়ের হারানো গৌরব ফিরিয়ে এনে চাকে আধুনিক শিল্পের মর্যাদা দিতে সচেষ্ট হবেন। চা হয়ে উঠবে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং স্বনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির নির্ভরতার প্রতীক।লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
0 comments:
Post a Comment