পর্যটন শিল্প বিকাশে প্রয়োজন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ
ড. ফোরকান আলী
আমরা একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তি সমন¦য়ের যুগে বাস করছি। এ শতাব্দীতে সারা বিশ্বে প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে নানা বিস্ময়কর ঘটনা। সেই সঙ্গে বিশ্বে পরিবর্তন ঘটেছে অর্থনৈতিক, সামাজিক, ভৌগোলিক অবস্থানের। হোটেল, পর্যটনকে আধুনিক প্রযুক্তি সংযুক্ত করে শিল্প হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। দক্ষ প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিবিদরা এ শিল্পকে পরিচালনা করছে মনমুগ্ধকরভাবে। ট্রাভেল এজেন্সি আরামদায়ক ভ্রমণের নিশ্চয়তা প্রদান করছে। পর্যটনকে রূপান্তরিত করছে বিনোদন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে। আমাদের দেশে হোটেল ম্যানেজমেন্ট, ট্রাভেল ও পর্যটন প্রযুক্তিবিদ্যায় প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা শিক্ষা কোর্সের অভাবে দেশে-বিদেশে ২০ লাখ লোক পর্যটন শিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ট্রাভেল এজেন্সিকে আধুনিক শিল্পের মর্যাদা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। পর্যটন শিল্পে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছি। আবাসিক হোটেল শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের সামগ্রিক উন্নতি। দেশের কৃষি, শিল্প, চিকিৎসা, ক্রীড়া, যোগাযোগ, অর্থনীতি, বিদেশি বিনিয়োগ, বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি, পর্যটন, অভ্যন্তরীণ ব্যবসা বাণিজ্যসহ সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হলো আবাসিক হোটেল। গত শতাব্দীতে আবাসিক হোটেল নির্মাণে বিশ্বব্যাপী ঘটে একটি নীরব বিপ্লব। প্রতিটি আবাসিক হোটেল নির্মাণ ও পরিচালনায় জাতীয় সাংস্কৃতিক ও কৃষ্টিকে প্রাধান্য দেয়া হয়। হোটেল ও পর্যটনের মাধ্যমে নিজ দেশকে পরিচিতি এনে দিচ্ছে বিশ্বব্যাপী। অনেক দেশের বড় ও গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে নির্মাণ করা হয় আর্šÍজাতিকমানের থ্রি স্টার, ফাইভ স্টার, সেভেন স্টার হোটেল। নয়নাভিরাম সৌন্দর্যমন্ডিত হোটেলগুলোর নির্মাণ শৈলীতা দেখলেই দেশটির অর্থনৈতিক উন্নতি সম্বন্ধে ধারণা করা যায়। জাতির আশা-আকাক্সক্ষা প্রতিফলিত হওয়ার মতো নির্মাণ শৈলীতার হোটেল দেশের পর্যটন এলাকায় প্রতিষ্ঠা হয়নি। দেশে প্রাকৃতিকভাবে ছোট-বড় মাঝারি ৩০ হাজার আবাসিক হোটেল গড়ে উঠেছে। এ হোটেলগুলো পরিচালনা করছে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণবিহীন পিতা-পুত্র, মামা-ভাগিনা, চাচা-ভাতিজা। এই হোটেলগুলো নিয়ন্ত্রণ করার সরকারি কোন প্রতিষ্ঠান বা নীতিমালা না থাকায় সরকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা পরিবর্তন হয়েছে ব্যাপক। এ পরিবর্তন স্পর্শ করেছে হোটেল ও পর্যটন শিল্পে। এ শিল্প বিকাশে গত শতকে ব্যাপক প্রতিযোগিতা হয়। বিশেষ করে আরব বিশ্বে তেলের খনি আবিষ্কারের পর আরবীয়রা বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তাদের চাহিদা পূরণে মধ্যপ্রাচ্যে শতাধিক থ্রি স্টার, ফাইভ স্টার ও সেভেন স্টার হোটেল ও বিনোদন কেন্দ্র নির্মিত হয়। এই লাক্সারি হোটেল ও বিনোদন কেন্দ্র পরিচালনা করার জন্য ২ লাখ হোটেল ম্যানেজমেন্ট ও পর্যটন প্রযুক্তিবিদের চাহিদা সৃষ্টি হয়। হোটেল ম্যানেজমেন্ট পর্যটন প্রযুক্তিবিদ্যায় প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট না থাকার ফলে আরব দেশের প্রযুক্তিগত লোভনীয় চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ। হোটেল প্রযুক্তিবিদ্যায় ব্যাপক কোর্স পরিচালনা করার ফলে ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ফিলিপাইন মর্যাদাকর এই সুযোগ গ্রহণ করে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের মাধ্যমে আয় করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। সম্প্রতি লন্ডনের বাংলাদেশি মালিকানার হোটেলগুলোতে কিছু শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণবিহীন লোকদের ভিসা প্রদানে ব্রিটিশ সরকার অপরাগতা প্রকাশ করে। বিশ্বের উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পর্যটনের সঙ্গে বেকারি শিল্পে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। গত শতাব্দীতে এ শিল্পে মেকানিক্যাল পদ্ধতি বাতিল করে সংযুক্ত করা হয়েছে অটো ও হাইটেক পদ্ধতি। গুণগতমানের অভাবে ইতোমধ্যে দেশের শুকনো খাবারের রকমারি মোড়কে কেক, বিস্কুট, রুটি, জুস, চকলেট ইত্যাদির বাজার পার্শ্ববর্তী দেশগুলো দখল করে এদেশের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙে দিয়েছে। বাঙালি সাংস্কৃতিমনা ও ভোজন বিলাসী উৎসব আনন্দে আরও বর্ণালী বিনোদন ভোগ করতে অভ্যস্ত। খাবারের ভিন্নতা এখন শুধু ভূরি ভোজন নয় বিনোদনেরও অংশ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দেশে শহর-উপশহরে আত্মপ্রকাশ করেছে থাই, ফ্রেঞ্চ, সুইস, চাইনিজ ও মিনি চাইনিজ নামের রেস্টুরেন্ট। বিনোদনের খোঁজে এসব বিলাসবহুল রেস্টুরেন্টে আগমন ঘটে অনেক পরিবারের। অভিজাত মহলের অলক্ষে এসব রেস্টুরেন্টগুলোতে অখাদ্য, অনুপযোগী ও কুখাদ্য পরিবেশন করছে। আধুনিক প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিবিদ এদেশে তৈরি হলে হোটেল রেস্টুরেন্টের খাবারের মান বৃদ্ধি পাবে এবং দেশীয় শিল্প হিসেবে বিনোদনে অবদান রাখতে পারবে। উন্নত দেশে ট্রাভেল এজেন্সিতে কর্মকর্তা নিয়োগের পূর্বশর্ত ট্রাভেল প্রযুক্তিবিদ্যায় ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট। ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ ৪ বছর সারা বিশ্বের শহর-উপশহর, গ্রাম এমনকি অভিজাত পরিবারের কৃষ্টি, শিল্প, শিক্ষা, সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন সম্পর্কে দীর্ঘ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মপোযোগী হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এদের লব্ধজ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বিশ্ব শ্রম বাজারের আকর্ষণীয় ক্ষমতাধর চাকরিগুলি এদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। এই শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ৪০ কোটিতে উপনীত হবে। অন্তত ১০ কোটি যুবককে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে না পারলে বাংলাদেশ বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। এখন থেকেই আমাদের প্রযুক্তি জ্ঞানসমৃদ্ধ জনশক্তি রপ্তানি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের রয়েছে প্রাকৃতিক উপাদান এবং সম্ভাবনা। বিশ্বব্যাপী ইকো টুরিজম বা প্রকৃতিবান্ধব পর্যটন ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ইকো টুরিজমের জন্য আমাদের দেশের পরিবেশ-প্রকৃতি ভৌগোলিক অবস্থান খুবই উপযোগী। পর্যটন শিল্পের উপযোগিতা এবং উপাদান থাকা সত্ত্বেও এ শিল্প বিকাশ ঘটানো যাচ্ছে না। বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। বিদেশি পর্যটকরা চায় নিরাপত্তা, সামাজিকতা, আতিথিয়তা, সর্বোপরি একজন ইয়ং, মডার্ন, স্মার্ট মুক্তমনের অধিকারী ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী গাইড। পর্যটনকে বিকশিত, পেশাদার ও যুগোপযোগী করে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে প্রয়োজন একদল ডিপ্লোমা পর্যটন প্রযুক্তিবিদ। বিশেষায়িত পেশাজীবীর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার সংস্কৃতি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এদেশের হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বেকারি, ট্রাভেল এজেন্সি ও পর্যটনে উন্নত দেশের সমকক্ষতা অর্জন করতে হলে এ শিল্পগুলোকে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করতে হবে। হোটেল ম্যানেজমেন্ট ও টুরিজম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা প্রযুক্তিবিদ্যা শিক্ষাই পারে এ শিল্প বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে। লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
Monday, June 29, 2015
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
0 comments:
Post a Comment