Sunday, June 28, 2015

ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি

ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি
ড.ফোরকান আলী
গত ২৫ এপ্রিল বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্প দেখা দেয়। এর আগে ৪ ফেব্রুয়ারি রাত ৭টা ৫৩ মিনিটে রিখটার স্কেলে ৬.৪ মাত্রার ভূমিকম্পে ৪৫ সেকেন্ডেরও বেশি সময় কেঁপেছিল রাজধানী ঢাকাসহ প্রায় সারাদেশ। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৪২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা। দেশের কোথাও থেকে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে না লোকজন আতংকিত হয়ে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। ভূমিকম্পের কম্পনে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে আতংকিত হয়ে পড়ি। পরে সময় পেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রভাব আমাদের মন থেকে মুছে যায়। আমরা সব ভুলে যাই। প্রচ- ঝাঁকুনি খেয়ে কম্পিত হলেও আমরা তেমন শঙ্কিত হই বলে মনে হয় না। ভূমিকম্প-পরবর্তী অবস্থা মোকাবেলায় কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও আমরা দৃঢ়ভাবে ভাবি না। রিখটার স্কেলে ৬.৪ মাত্রার ভূমিকম্প একটি মাঝারি মানের শক্তিশালী ভূমিকম্প। কম্পনটি উৎপত্তি‘লের ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ থেকে ৯০ কিলোমিটার গভীরে সংঘটিত হয়। যে কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগটির ভয়াবহতা থেকে সৃষ্টিকর্তা আমাদের রক্ষা করেছেন। তা না হলে এ মাত্রার একটি কম্পন সারাদেশে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করতে পারত। ভূমিকম্পটি যদি ভূগর্ভের এতটা গভীরে না হয়ে ২০ কিলোমিটারের মধ্যেও হতো। সেক্ষেত্রেও এটি ভয়ঙ্কর ধ্বংসলীলা ঘটাতে পারত। খোদা না করুন, এমন যদি কিছু ঘটেই যায়। তা মোকাবেলা করার আমাদের কি কোন ন্যূনতম প্রস্তুতি আছে? প্রায় সবাই সমস্বরেই বলবেনÑ না, একদম না। তাই বসে থাকার কোন অবকাশ নেই। দুর্যোগটি রোধ করার কোন উপায়ই যখন মানুষের হাতে নেই। তাই এখনই ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলার সর্বাÍক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। ভূমিকম্পের কথা আলোচনা করতে গেলেই আমাদের মনে রাখতে হবে। যে বর্তমানে বাংলাদেশ নামক ভূখ-টি বিগত পাঁচশ’ বছরে প্রায় এক ডজন বার ভয়ঙ্করভাবে এ দুর্যোগটির দ্বারা আক্রান্ত হয়। এ কারণে দেশের মানুষের এর বীভৎসতা, ভয়াবহতা ও ধ্বংসলীলার ব্যাপকতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা আছে। অবশ্য মাঝেমধ্যে ছোটখাটো কম্পন যে কত হাজার বার হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাতের ভূকম্পনটিকেও বিশেষজ্ঞরা এক ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের আগাম সংকেত বলেই মনে করছেন। ভূমিকম্প এমনই এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা বলে-কয়ে আসে না। ঝড়-তুফান-বন্যা ঠেকাতে না পারলেও এগুলো থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একটা সুযোগ থাকে। পূর্বাভাস পাওয়ার কোন সুযোগ নেই বলে সর্বনাশা সর্বগ্রাসী ভূমিকম্পের সংহার থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন উপায় থাকে না। একটি বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানলে রাজধানী ঢাকাসহ আক্রান্ত অঞ্চলে কী প্রলয়ংকরী ঘটনা ঘটতে পারে। সে সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য সবারই জানা আছে। তারপরও একশ্রেণীর লোক শহর-নগর-বন্দরে অপরিকল্পিতভাবে বিশাল দালানকোঠা ও অট্টালিকা নির্মাণ করেই চলেছেন। সঙ্গে সঙ্গে বড় বড় হাউজিং কোম্পানি নালা-ডোবা-খাল ভরাট করে নরম মাটিতে দৃষ্টিনন্দন আকাশচুম্বী অট্টালিকা নির্মাণে ব্যস্ত রয়েছে। সুউচ্চ ও সুন্দর বিল্ডিং নগরীর শোভাবর্ধন করলেও তা মাটির নিচে চাপ সৃষ্টি করে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও চরম উদাসীনতার অভিযোগ রয়েছে।আর সে জন্যই দেশে দালানকোঠা নির্মাণে কেউ নিয়মনীতির তেমন একটা তোয়াক্কা করছে না।বিল্ডিংকোড মেনে ঢাকাসহ  দেশের বিভিন্ন শহরে খুব কম বাড়িই নির্মিত হয়। একদিকে আইন অমান্য করা, অন্যদিকে নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে মমারাত্মক কারচুপি। সব ভেজালের এই দেশের সম্রাটদের হাতের জাদুকরি পরশে নির্মাণ কাজে ব্যবহƒত ইট-বালু-সিমেন্ট ও রডের মতো সামগ্রী কতটা খাঁটি তা সবারই জানা। বেশির ভাগ দালানকোঠায়ই ভূমিকম্প প্রতিরোধী ব্যবস্থা নেই। তবে নির্মিত বিল্ডিংয়েও ভূমিকম্প প্রতিরোধী ব্যবস্থা সংযোজন করা যায়। বিষয়টির প্রতি কর্তৃপক্ষের জরুরি ভিত্তিতে নজর দেয়া প্রয়োজন। ৭ মাত্রার মতো শক্তিশালী ভূমিকম্পেও যে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে নিউজিল্যান্ড। গত সেপ্টেম্বর মাসে ওই দেশটির একটি শহরে প্রচ- ভূমিকম্পে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। গত ১২ জানুয়ারি ক্যারিবীয় দ্বীপ রাষ্ট্র হাইতির ২০০ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদসহ লাখ লাখ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্স ধ্বংস স্তুপে পরিণত হয়। এই মহাপ্রলয়ে দুই লাখ ত্রিশ হাজার লোক নিহত ও তিন লক্ষাধিক লোক আহত হন। দশ লাখ লোক হন গৃহহীন। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি চিলিতে সংঘটিত ৮.৮ মাত্রার ভয়াবহতম ভূমিকম্পে মাত্র এক হাজার লোক নিহত হন। যদিও প্রায় বিশ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়েছিল। গত ৪০ বছরে চিলিতে কমপক্ষে এক ডজনবার ৭ বা ততধিক মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানলেও নিয়মকানুন মেনে মজবুত ভিতের ওপর বিল্ডিং নির্মাণ করায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অবিশ্বাস্যভাবে কম হয়। অথচ আমাদের দেশে বিষয়টির প্রতি যথাযথ দৃষ্টি দেয়ার লোক নেই। তাই আজ সবার মনেই ঢুকেছে প্রচ- ভয়। স্বাধীনতা লাভের ৪৪ বছর পরও আমরা সবকিছুতে গা-ভাসিয়ে ফাঁকিবাজি করে দায়সারাভাবে চলতে থাকব কিনা। সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের মানুষের মধ্যে একটা ধারণা আছে। আমাদের এ অঞ্চলটি তেমন ভূমিকম্পপ্রবণ নয়। ভূমিকম্প হলেও তা খুব ভয়াবহ হয় না। শত শত বছরের পুরনো রেকর্ড কিন্তু তা বলে না। বিভিন্ন তথ্য ও রেকর্ড থেকে জানা যায়, দেশে প্রতি বছর গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি মৃদু ভূকম্পন হয়। বিগত কয়েকশ’ বছরে আমাদের দেশসহ এ অঞ্চল ও তার আশপাশ এলাকায় বেশ কিছু ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ১৫৪৮, ১৬৪২ ও ১৬৬৩ সালে সিলেটে; ১৭৬২, ১৭৭৫ ও ১৮৮২ সালে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীতে এবং ১৮৮০ সালে পাবনায়। ১৮৬৯ সালের ৬ জানুয়ারির ভূমিকম্পে সিলেটের সার্কিট হাউস, কোর্ট ও চার্চ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৮৮৫ সালের ১৪ জুলাই রংপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটিকে ‘দ্য বেঙ্গল আর্থকোয়েক’ বলা হয়ে থাকে। তবে ১৮৯৭ সালের ১২ জুনের ৮.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি ছিল এ অঞ্চলের সবচেয়ে প্রলয়ংকরী। দালানকোঠা বিধ্বস্ত হয়। বম্ম্রপুত্র নদের গতিপথের পরিবর্তন হয়। বগুড়া, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, কুমিল্লা, ঢাকা, দিনাজপুর, রংপুর ও ময়মনসিংহে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৭৮২ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে গঙ্গা নদীর গতিপথও পরিবর্তন হয়। বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানলে ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতার দিক থেকে ঢাকা মহানগরীকে সমগ্র বিশ্বে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। গত বছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে বিশ্বের ভূমিকম্পপ্রবণ ২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরান রয়েছে প্রথম স্থানে। ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বহুতল ভবন নির্মিত হওয়ায় রাজধানী ঢাকাকেই এখন ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা শহরে বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানলে হাজার হাজার ভবন ধসে পড়ে এ নগরী এক বিশাল ধ্বংস স্তুূপে পরিণত হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরো ঢাকা শহর এলাকায় ৩ লাখ ২৬ হাজার ভবনের ওপর এক সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছে যে, ৭ থেকে সাড়ে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ৭২ হাজার ভবন সম্পুর্ণভাবে ধসে পড়বে। আরও ৮৫ হাজার ভবন আংশিকভাবে ধসে পড়বে। তবে অনেকেই বলেন, ৭ মাত্রা নয়, সাড়ে ৬ মাত্রার ভূমিকম্পেই রাজধানী ঢাকার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যেতে পারে। পুরান ঢাকার অবস্থা কী রূপ ধারণ করতে পারে তা কল্পনাই করা যায় না। উপর‘যে শহরে নির্মাণ ত্রুটির কারণে বিল্ডিং ধসে পড়ে সেখানে বাকিটা সহজেই অনুমেয়। গত বছরের ২ জুন রাতে বেগুনবাড়িতে অননুমোদিত একটি পাঁচতলা ভবন পাশের টিনের বাড়িতে পড়ে ২৫ জনের প্রাণহানির ঘটনা তো এখনও রাজধানীবাসী ভুলে যায়নি। ঢাকায় সর্বশেষ ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়েছিল ১১৩ বছর আগে ১৮৯৭ সালে। হাজার মানুষের মৃত্যু ছাড়াও তৎকালীন ঢাকার বহু ঘরবাড়ি ও দালানকোঠার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। শতাধিক আকাশচুম্বী বিশাল অট্টালিকাসহ হাজার হাজার বহুতল ভবনের বর্তমান ঢাকা মহানগরীর সঙ্গে তখনকার ঢাকার কোন তুলনাই চলে না। তখন নিশ্চয়ই পুরান ঢাকায় সর্বসাকুল্যে হাজারখানেক পাকা বাড়িও ছিল না। রাজধানী ঢাকায় কোন প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প হলে গ্যাস-বিদ্যুৎ বিস্ফোরণে আগুন লেগে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি ও অন্যান্য বিপদ মিলে যে কী ভয়ঙ্কর অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। সৃষ্টিকতা যেন, তা শুধু আমাদের কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ রাখুন, বাস্তবে তা যেন কখনোই না ঘটে। তারপরও সরকারকে জনগণের মধ্যে এ দুর্যোগের ভয়াবহতা ও ভূমিকম্পের সময় তাদের করণীয় সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টিতে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ও বিভিন্ন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকস্পের সময় নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের রক্ষার্থে কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে সে বিষয়ে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। অনেকেই মনে করছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য ঢাকা শহরে অবিলম্বে ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। উদ্ধার কাজ চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও জরুরি ভিত্তিতে সংগ্রহ করা দরকার।
ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানোর কোন উপায় নেই। এরকম সর্বনাশা দুর্যোগ সংঘটিত হওয়ার পর উদ্ধার কাজ চালানোর জন্য আমাদের অভিজ্ঞ জনবল এবং প্রয়োজনীয় যান-যন্ত্রাদিরও তীব্র সংকট রয়েছে। ইতিমধ্যে সরকার কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দেশের প্রধানমন্ত্রীর ওপর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের কারণে তারা আন্তরিকভাবে মনে করেন, সরকার এ উদ্যোগকে আরও কার্যকর করে তা বাস্তবায়নে যুদ্ধাবস্থার মতো জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। যাতে ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি পরিস্থিতি যথাযথভাবে মোকাবেলা করা যায়। লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ

0 comments:

Post a Comment