Wednesday, April 1, 2015

গঙ্গার আদলে তিস্তা চুক্তি!




গঙ্গার আদলে তিস্তা চুক্তি!
ড.ফোরকান আলী
অবশেষে তিস্তার অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির দিকে এগোচ্ছে ভারত। এরই মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকার পানি বণ্টনের খসড়া প্রণয়ন করে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠিয়েছে। এতে পশ্চিমবঙ্গ নিজেদের জন্য ৮৩ ভাগ পানি রেখে বাকি ১৭ ভাগ বাংলাদেশকে দেয়ার সুপারিশ করেছে। একইসঙ্গে খসড়ায় আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টন প্রক্রিয়াকে প্রাধান্য দেয়ার কথা বলা হলেও শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজনে বাংলাদেশকে ২৫ ভাগ পানি দেয়ার কথা বলা হয়েছে। খসড়াটি চ‚ড়ান্ত হয়ে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির দিকে এগোলে গঙ্গার আদলে তিস্তা চুক্তি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গঙ্গার আদলে তিস্তা চুক্তি হলে পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হবে বাংলাদেশ। তবে পররাষ্ট্র ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থহানির কোনো সুযোগ থাকবে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশে তিস্তা নদীর অববাহিকা অঞ্চলের মোট পরিমাণ ১২ হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অববাহিকার পরিমাণ ১০ হাজার ৪৫৮ কিলোমিটার ও বাংলাদেশের ১ হাজার ১৪২ কিলোমিটার। অর্থাৎ নদীর মোট অববাহিকার ৮৩ শতাংশ পশ্চিমবঙ্গে এবং ১৭ শতাংশ বাংলাদেশে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গোমতী, মাতামুহুরি, মনু, খোয়াই, ধরলা ও দুধকুমার, মহানন্দা, পুনর্ভবা, করতোয়া, ফেনী, ইছামতি, কালিন্দি, রায়মঙ্গল, হাড়িয়াভাঙ্গা, আশালং, আত্রাই, সুরমা ও কুশিয়ারা নদী প্রবাহমান। এসব নদীর উৎসস্থল ভারতেরও উজানে হওয়ায় তা ভারতের হয়ে বাংলাদেশর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের চাষাবাদের সফলতা নির্ভর করে এসব নদীর পানির ওপর। আর বর্ষাকালে সৃষ্ট বন্যায় নদীপাড়ের মানুষের কপাল পুড়ে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১১ ডিসেম্বর দিল্লিতে দুই দেশের নদী ব্যবস্থার জন্য গঠিত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) তৃতীয় সভায় প্রথমবাবের মতো তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি ওঠে।
পরবর্তী সময়ে ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দিল্লিতে দুদেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে পাঁচ বছর মেয়াদি সমঝোতা চুক্তি হয়। অভিযোগ রয়েছে, সমঝোতা চুক্তি হলেও হিস্যা অনুযায়ী পানি পায়নি বাংলাদেশ। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের প থেকে ভারতের কাছে বহুবার আবেদন, নিবেদন ও অনুরোধ করা হলেও তেমন কোনো সাড়া মেলেনি। এরপর ২৭ বছর অপো করতে হয়েছে। সর্বশেষ গত ১০ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালে বহুল প্রতীতি এ চুক্তি স্বারের ওপর জোর দেয়া হয়। পরে ১৭ মার্চ নয়াদিলিøতে অনুষ্ঠিত জেআরসির বৈঠকে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির ব্যাপারে আশায় বুক বাঁধে বাংলাদেশ। কিন্তু ওই বৈঠকে শুধু অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির ব্যাপারে ঐকমত্যের কথা বলা হয়। এ ব্যাপারে ভারতের পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, তিস্তার অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির ব্যাপারে বাংলাদেশের দাবিটি ভারত আমলে নিয়েছে, তবে একটি চুক্তি করতে সমীাসহ নানা ধরনের প্রক্রিয়া থাকায় কিছুটা বিলম্বিত হওয়াই স্বাভাবিক। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দণি এশিয়া অনুবিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ৭ আগস্ট ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি ঢাকা সফরে এলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তৎ সময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে বাংলাদেশের দাবির কথা তুলে ধরেন। পশ্চিমবঙ্গের সেচ ও পানিসম্পদ দপ্তরের বরাত দিয়ে ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফর শেষে দেশে ফিরে গেলে তিস্তা চুক্তির বিষয়টি সামনে চলে আসে। এরপরই কেন্দ্রীয় সরকারের পরামর্শে তিস্তার পানি বণ্টনের একটি খসড়া নীতি প্রণয়ন করে পশ্চিমবঙ্গের সেচ ও পানিসম্পদ দপ্তর। যেহেতু তিস্তা আন্তর্জাতিক নদী, তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকার চাইছে আন্তর্জাতিক বিধি মেনেই বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে এ নদীর পানি ভাগ হোক। রাজ্য সরকারের প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছে, তাদের প্রয়োজন মেটানোর পর বাড়তি পানি গজলডোবা তিস্তা ব্যারেজ দিয়ে স্বাভাবিক পদ্ধতিতেই ছেড়ে দেয়া হবে। এদিকে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার ব্যাপারে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেেিত পশ্চিমবঙ্গের বক্তব্য, তিস্তা নদীর উৎসমুখ হিমালয় এবং বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে যুক্ত আন্তর্জাতিক এ নদী সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে প্রবাহিত। তাই এর পানি বণ্টনও আন্তর্জাতিক নীতি মেনেই হওয়া বাঞ্ছনীয়। রাজ্য সরকারের তৈরি খসড়ায় আরো বলা হয়, জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তিস্তায় পানির কোনো সমস্যা থাকে না। কিন্তু ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত যে পানি পাওয়া যায়, তা তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের ‘কমান্ড’ অঞ্চলের জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজন। ওই সময় পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ ুণœ করে কোনোভাবেই বাংলাদেশে পানি দেয়া সম্ভব হবে না। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বক্তব্য, বাংলাদেশের সঙ্গে বর্তমানে ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তাই তিস্তার পানি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যাতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি, তিক্ততা বা মনোমালিন্য সৃষ্টি না হয় তা বিশেষভাবে দেখা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খসড়া নীতিতে আরো বলা হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্ট থেকে বাংলাদেশের জন্য ২৫ শতাংশ পানি ছাড়া হবে। পানি ছাড়ার ব্যাপারে একটা বিকল্প প্রস্তাবের কথাও রাজ্য সরকারের খসড়া নীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বলা হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমের সময় পানি বণ্টন বিষয়টি উভয় দেশই প্রতি দুই বছর অন্তর পর্যালোচনা করবে। সূত্র মতে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার তিস্তার পানি বণ্টনের যে খসড়া প্রস্তাব বা নীতি প্রণয়ন করেছে, তা ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, গেল জেআরসির বৈঠকে গঙ্গা চুক্তির আদলে ২০ বছর মেয়াদি তিস্তা চুক্তি করার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টন নীতি অনুযায়ী বাংলাদেশকে ১৭ ভাগ পানি দেয়ার কথা বলা হয়। আর এখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের তিস্তার পানি বণ্টন খসড়া নীতিতে একই বিষয় স্থান পেয়েছে।
পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রণীত খসড়াটি চ‚ড়ান্ত হয়ে তিস্তা চুক্তির দিকে এগোলে বাংলাদেশের কোনো লাভ হবে না। কারণ এরই মধ্যে তিস্তার উজানে গজলডোবায় বাঁধ দেয়া হয়েছে এবং এখন পানি প্রত্যাহার করা হয়। সর্বোপরি গঙ্গার আদলে তিস্তা চুক্তি হলে এতে কোনো ‘গ্যারান্টি কোজ’ থাকবে না। সূত্র জানায়, ১৯৯৬ সালে দুই দেশের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বারিত হয়। তাতে শুষ্ক মৌসুমে প্রাপ্যতা অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে পানি ভাগাভাগি করা হয়। কিন্তু চুক্তির পর আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ হিস্যা অনুযায়ী পানি পায়নি। প্রসঙ্গত বর্তমানে দুই দেশেই রয়েছে তিস্তা প্রকল্প। বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্পের মাধ্যমে রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও বগুড়ায় তিন লাখ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনা হয়েছে। এ প্রকল্পের জন্য শুষ্ক মৌসুমে ৮ হাজার কিউসেক পানির প্রয়োজন। আমরা আশাকরি ভারত বাংলাদেশ সমঝোতায় পৌঁছাতে সম হবে। লেখক: গবেষক


0 comments:

Post a Comment