সাপ লুডুর জয়-পরাজয়
একটা বিষয় মাথায় খেলে না, পৃথিবীতে এত খেলা থাকতে ক্রিকেটারদেরই কেন এত গ্যামার, তারাই কেন এত সেলিব্রেটিÑ রোল মডেল। মুম্বাইয়ের এককালীন হার্ট থ্রব জিনাত আমান মজেছিলেন ইমরান খানে; ম্যারাডোনার প্রতি তার কোন ধরনের আবেগ ছিল কিনা, খবর বেরোয়নি। শর্মিলা ঠাকুর বিয়ে করেছিলেন ক্রিকেটার মনসুর আলীকে, সমসাময়িক ভারতীয় বিখ্যাত কোন ফুটবলার তার মধ্যে কোন প্যাসন জš§াতে পারেননি। এক বাঙালি ললনা পাকিস্তানি ক্রিকেটার শহীদ আফ্রিদির প্রেমে মজে পোস্টারে ‘আমাকে বিয়ে করো’ লিখে তা সেঁটেছিলেন বুকে। দাবার গ্র্যান্ড মাস্টার আমাদেরই নিয়াজ মোরশেদকে এভাবে কেউ প্রেম নিবেদন করেছিল বলে খবর নেই। এসবের কারণ কী? ক্রিকেট কি অন্য খেলাগুলোর চেয়ে এমন উঁচুমানের খেলা যে, তা যারা খেলে তারা অতিমানব? অনেকেই পেতে পারেন, তারপরও গণতন্ত্রের সুবিধা নিয়ে বলছি, ক্রিকেট আমার কাছে সাপ-লুডুর অতিরিক্ত কিছু মনে হয় না। এ খেলায় কোন বিজ্ঞান নেই, এর অধিকাংশই নিয়তিনির্ভর। কেমন করে, তা একটু পরে খোলাসা করছি। আপাতত, হতে পারে এটা সম্ভ্রান্তদের খেলা বলেই স্মার্ট হওয়ার স্বার্থে, ভাবমূর্তিতে বনেদিপনা যোগ করতেই ক্রিকেট নিয়ে এত হুলোড়। ইমরান খানের এক সাাৎকারে পড়েছিলাম, স্কুলজীবনে তিনি সহপাঠীদের চোখে ছিলেন এক হতচ্ছাড়া বালক। ক্রিকেট খেলতে নেমে তিনি হয়েছেন সুদর্শন, ভালোবাসার যোগ্য এক মহৎ যুবক।হ্যাঁ, ক্রিকেট সাপ-লুডুই। কারণ এ খেলায় কে জিতবে আগে থেকে বলা যায় না। সাপ-লুডুতে পরের চালে কত উঠবে, তাতে কি ঘুঁটি সাপের মুখে পড়বে নাকি উপরে ওঠার মইয়ে চড়বেÑ খেলোয়াড়রা জানেন না। ক্রিকেটেও পরের বলটিতে ছক্কা হবে নাকি স্ট্যাম্প পড়বেÑ তা বোলার কিংবা ব্যাটসম্যান কেউ জানেন না। তা না হলে, যে খেলোয়াড় আগের ইনিংসে সেঞ্চুরি করল, সে কেন পরেরটায় শূন্য রানে আউট হবে? সেঞ্চুরিয়ান বড়জোর ৮০, ৭০, ৬০ কিংবা ৫০-এ আউট হতে পারে। তাই বলে শূন্য! আয়ারল্যান্ডকে বাংলাদেশ হারিয়েছে, সেই আয়ারল্যান্ড হারাল ইংল্যান্ডকে। এর মানে কী? মানে বাংলাদেশ ইংল্যান্ডকে সহজেই হারাতে পারে। কিন্তু আমরা কী দেখলাম? বাংলাদেশ ইংল্যান্ডকে হারিয়েছে, তবে কি সেটা এত সহজে? শফিউল ও মাহমুদুলা ভাগ্যগুণে টিকে গেলেন বলেই না এলো জয়। এ খেলায় কোন বিজ্ঞান নেই, থাকলে সেই বিজ্ঞান ব্যবহার করে খেলাটার ওপর কমান্ড আনা যেত। বাংলাদেশ ফুটবলে ব্রাজিলের সঙ্গে কোনভাবেই জিততে পারবে না। কিন্তু ক্রিকেটে আমরা হারিয়েছি পৃথিবীর সব সেরা দেশকেই। অর্থাৎ ফুটবলে বিজ্ঞান আছে বলেই ব্রাজিল খেলাটার ওপর এক ধরনের কমান্ড প্রতিষ্ঠা করেছে। দণি আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা পাকিস্তান ক্রিকেটে তা পারেনি। আসলে ক্রিকেটকে মহৎ বানিয়েছেন এর ধারা ভাষ্যকাররা। ক্রিকেট লিটারেচারকে তারা একটা জায়গায় নিয়ে গেছেন। কোন ব্যাটসম্যান যখন একটা ভালো স্ট্রোক করল, কমেন্টেটর চিৎকার করে বলছেনÑ ম্যাগনিফিসিয়েন্ট, ফ্যানটাসটিক, লাভলি, ব্রিলিয়ান্টÑ আরও কত কী? সেই ব্যাটসম্যান যখন আউট হলেন, তখন প্রশংসাটা হচ্ছে বোলারের অথবা যিনি ক্যাচ ধরেছেন তার। এমন প্রশংসা যে, ব্যাটসম্যান কোন পদার্থই নয়। ক্রিকেটের প্রতিটি স্ট্রোকই ম্যাগনিফিসিয়েন্ট, আউট করা প্রতিটি বলই লাভলি। বিশেষণের সুপারলেটিভ ডিগ্রির এমন ছড়াছড়ি অন্য কোন খেলায় নেই। ক্রিকেটের ‘রেকর্ড’ সবচেয়ে হাস্যকর ক্রিকেট-সাহিত্য। এর সবকিছুকেই রেকর্ডের আবরণ দেয়া হয়। ওয়ানডে অথবা টেস্টের ১২তম ওভারে হয়তো ২৫ রান সংগ্রহ করল কোন দল; ব্যস, একটা রেকর্ড হয়ে গেল যেÑ ১২তম ওভারে এটাই সর্বোচ্চ রান! ১৩তম ওভারে কোন রান হল না, তো এবারের রেকর্ডÑ এই প্রথম ১৩তম ওভারে কোন রান হয়নি। শচীন টেন্ডুলকার বোধকরি নিজেও চান না তাকে নিয়ে রেকর্ডের এত সাহিত্য রচিত হোক। ক্রিকেট-সাহিত্য নিয়ে যখন কথা উঠল, তখন বলতে হয় এ সাহিত্যই বলে দেয়Ñ ক্রিকেট একটি অনিশ্চয়তার খেলা, যেমনটা সাপ-লুডু। কোন ফিল্ডার হয়তো ক্যাচ মিস করলেন, ভাষ্যকার বলছেনÑ ব্যাটসম্যান একটা লাইফ পেলেন। আমার জীবন আমার হাতে, কে কাকে লাইফ দেয়? ব্যাটসম্যান যে টিকে গেলেন, সেটা কি তার যোগ্যতায় নাকি ফিল্ডারের অযোগ্যতায়? ক্রিকেটকে বলা হচ্ছে অ্যা গেম অফ গোরিয়াস আনসারটেইনিটি! পাঠক বুঝুন, আনসারটেইনিটিরও গোরি থাকে! অনেকে বলতে পারেন, ক্রিকেট সম্পর্কে যেসব কথা বলা হল, অন্য খেলায়ও তো সেগুলো বিদ্যমান। ব্রাজিল কি হারে না? অনিশ্চয়তা কি নেই ফুটবলে? ক্যাচ ধরা, না ধরার কারণে যেমন ব্যাটসম্যানের ভাগ্য নির্ধারিত হয়, তেমনি গোলকিপারের সাফল্য-ব্যর্থতায় কি শুটারেরও সাফল্য-ব্যর্থতা নির্ধারিত হয় না? কিংবা দাবায় প্রতিপরে ভুল চাল কি আমাকে জিততে সাহায্য করে না? সবই ঠিক আছে। কথাটা হচ্ছে, কোন্ খেলায় এগুলোর পরিমাণ কত কম বা বেশি। দাবায় প্রতিপরে ভুল চাল আমাকে জিততে সাহায্য করবে তখনই, যখন সেই চালের বিপরীতে আমার চালটা হবে শুদ্ধ। খেলার ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটা এখানেই। ক্রিকেটে সেই নিয়ন্ত্রণ নেই অথবা থাকলেও খুব কম। ব্রাজিল হারতে পারে বৈকি। কিন্তু হারলেও ক্রিকেটের ৮/৯ উইকেটে হারার মতো ‘গো’হারা হারবে না কখনোই।নব্বই মিনিটের ফুটবলে খেলোয়াড়রা গতি ও কৌশলের যত ভ্যারিয়েশন (প্রকারভেদ) দেখাতে পারেন, পাঁচ দিনের টেস্টে ক্রিকেটাররা তার ভগ্নাংশও পারেন না। বোলার বল করছেন নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে দৌড়ে এবং একই ভঙ্গিতে। বলের গতিও প্রায় একই থাকছে। স্পিনারদের েেত্র সুইংয়ের ভিন্নতা হয় অবশ্য। একে মুদ্রাদোষের বোলিং ছাড়া কী বলা যেতে পারে? অথচ একজন ফুটবলার মাঠের কোন প্রান্তে কখন কত প্রিতায় বল নিয়ে ছুটবেন, তা কেউ জানে না। প্রতি মুহূর্তেই দর্শক নতুন নতুন বিজ্ঞান আশা করতে পারেন। ব্যাটসম্যানদের অবশ্য স্ট্রোকের ভিন্নতা থাকে এবং তাদের থাকে একটা স্টাইল। ওই স্টাইলটাই বোধকরি ক্রিকেটের গ্যামার, ওটাই জিনাত আমানদের মুগ্ধতা। ক্রিকেটারদের টাইটেলগুলো ল্য করা যাক। গাভাস্কার কী? লিটল মাস্টার। শচীন কিংবা লারা? রান মেশিন। মুরালিধরন কী? মাস্টার অফ স্পিন। হল কী? ম্যান মাউন্টেন। গ্রিনিজ গর্ডন হলেন ফ্যাশ গর্ডন। দ্রাবিড়? দ্য ওয়াল। লিলি দ্য বুচার। ফুটবলারদের এমন টাইটেল নেই। পেলেকেই শুধু বলা হয় ফুটবলের রাজা। ক্রিকেট-সাহিত্য বলে কথা।আসলেই ক্রিকেটের পুরোটাই শিল্পকলা, সাহিত্য। এখানে বিজ্ঞান বলে কিছু নেই। একজন কবি যেমন আগের মুহূর্তেও জানেন না, তার পরবর্তী লাইনটি কেমন হবে, একজন বোলারও তেমনি বলটি ছোড়ার আগ মুহূর্তেও জানেন না, সেটি কেমন সুইং করবে। লাইনটি লেখার পর কবি দেখলেন, সেটি অসাধারণ এক চরণ। বোলারও বল ছোড়ার পর বুঝলেন, ওটি এক চমৎকার গুগলি হয়েছে। ক্রিকেটে কোন্ দল কখন জিতবে অথবা হারবেÑ তা জোর দিয়ে বলা যায় না। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে বাংলাদেশের পরাজয়টা শোচনীয় হয়েছে। তাতে কী? লুডু খেলায় এমনটা হতেই পারে। এতে গানির কিছু নেই। বিস্মিত হয়েছি দেখে যে, হেরে যাওয়ার পর বাংলাদেশের একশ্রেণীর সমর্থক ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলোয়াড় বহনকারী গাড়িতে ঢিল ছুড়েছে। তাদের জন্য ক্রিকেট-সাহিত্যেই তো সান্ত্বনা লুকিয়ে আছে। একে আনসারটেইনিটির গোরিয়াস হার ধরে নিলেই তো হতো! ক্রিকেটে বাংলাদেশ হেরে গেলে মন খারাপ হয়ে যায় আমাদের। বিষণœতায় কারও সঙ্গে কথা বলতেও ইচ্ছে করে না। ভবিষ্যতে আমাদের জয়ের মতো হারের মুখও দেখতে হবে পৌনঃপুনিকভাবে। হারের বিষণœতা থেকে রা পাওয়ার জন্য একটা মেন্টাল থেরাপি ব্যবহার করা যেতে পারে। নিউজিল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশ করার মতো জয় আসবে যখন, তখন ধরে নেব যোগ্যতা দিয়েই আমরা তা অর্জন করেছি। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হেরে যাওয়ার মতো পরাজয়ের সময়গুলোয় ভাববÑ ক্রিকেট তো অনিশ্চয়তার খেলা। এ খেলায় যে কোন কিছুই ঘটতে পারে! পুনশ্চঃ এতণ যেসব বলা হল, বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মাশনাফিরে কণ্ঠে তার মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। ভারতের বিরুদ্ধে পরাজয়ের পর বললেন, তিনি বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে, বাংলাদেশ হেরেছে। এ কথার মানে কী? মানে বিজ্ঞান, মেধা, শ্রম, নিষ্ঠাÑ এসবের কোন মূল্য নেই। শফিউল ঘুঁটি চালার পর দেখলেন, ছয় উঠেছে। এই ছয় বাংলাদেশকে নিয়ে গেল মইয়ের ঘরে। ব্যস, এক লাফে জয়ের ঘর। তার চালে একও উঠতে পারত এবং সেটা সাপের মুখ। তাহলে কী হতো?
একটা বিষয় মাথায় খেলে না, পৃথিবীতে এত খেলা থাকতে ক্রিকেটারদেরই কেন এত গ্যামার, তারাই কেন এত সেলিব্রেটিÑ রোল মডেল। মুম্বাইয়ের এককালীন হার্ট থ্রব জিনাত আমান মজেছিলেন ইমরান খানে; ম্যারাডোনার প্রতি তার কোন ধরনের আবেগ ছিল কিনা, খবর বেরোয়নি। শর্মিলা ঠাকুর বিয়ে করেছিলেন ক্রিকেটার মনসুর আলীকে, সমসাময়িক ভারতীয় বিখ্যাত কোন ফুটবলার তার মধ্যে কোন প্যাসন জš§াতে পারেননি। এক বাঙালি ললনা পাকিস্তানি ক্রিকেটার শহীদ আফ্রিদির প্রেমে মজে পোস্টারে ‘আমাকে বিয়ে করো’ লিখে তা সেঁটেছিলেন বুকে। দাবার গ্র্যান্ড মাস্টার আমাদেরই নিয়াজ মোরশেদকে এভাবে কেউ প্রেম নিবেদন করেছিল বলে খবর নেই। এসবের কারণ কী? ক্রিকেট কি অন্য খেলাগুলোর চেয়ে এমন উঁচুমানের খেলা যে, তা যারা খেলে তারা অতিমানব? অনেকেই পেতে পারেন, তারপরও গণতন্ত্রের সুবিধা নিয়ে বলছি, ক্রিকেট আমার কাছে সাপ-লুডুর অতিরিক্ত কিছু মনে হয় না। এ খেলায় কোন বিজ্ঞান নেই, এর অধিকাংশই নিয়তিনির্ভর। কেমন করে, তা একটু পরে খোলাসা করছি। আপাতত, হতে পারে এটা সম্ভ্রান্তদের খেলা বলেই স্মার্ট হওয়ার স্বার্থে, ভাবমূর্তিতে বনেদিপনা যোগ করতেই ক্রিকেট নিয়ে এত হুলোড়। ইমরান খানের এক সাাৎকারে পড়েছিলাম, স্কুলজীবনে তিনি সহপাঠীদের চোখে ছিলেন এক হতচ্ছাড়া বালক। ক্রিকেট খেলতে নেমে তিনি হয়েছেন সুদর্শন, ভালোবাসার যোগ্য এক মহৎ যুবক।হ্যাঁ, ক্রিকেট সাপ-লুডুই। কারণ এ খেলায় কে জিতবে আগে থেকে বলা যায় না। সাপ-লুডুতে পরের চালে কত উঠবে, তাতে কি ঘুঁটি সাপের মুখে পড়বে নাকি উপরে ওঠার মইয়ে চড়বেÑ খেলোয়াড়রা জানেন না। ক্রিকেটেও পরের বলটিতে ছক্কা হবে নাকি স্ট্যাম্প পড়বেÑ তা বোলার কিংবা ব্যাটসম্যান কেউ জানেন না। তা না হলে, যে খেলোয়াড় আগের ইনিংসে সেঞ্চুরি করল, সে কেন পরেরটায় শূন্য রানে আউট হবে? সেঞ্চুরিয়ান বড়জোর ৮০, ৭০, ৬০ কিংবা ৫০-এ আউট হতে পারে। তাই বলে শূন্য! আয়ারল্যান্ডকে বাংলাদেশ হারিয়েছে, সেই আয়ারল্যান্ড হারাল ইংল্যান্ডকে। এর মানে কী? মানে বাংলাদেশ ইংল্যান্ডকে সহজেই হারাতে পারে। কিন্তু আমরা কী দেখলাম? বাংলাদেশ ইংল্যান্ডকে হারিয়েছে, তবে কি সেটা এত সহজে? শফিউল ও মাহমুদুলা ভাগ্যগুণে টিকে গেলেন বলেই না এলো জয়। এ খেলায় কোন বিজ্ঞান নেই, থাকলে সেই বিজ্ঞান ব্যবহার করে খেলাটার ওপর কমান্ড আনা যেত। বাংলাদেশ ফুটবলে ব্রাজিলের সঙ্গে কোনভাবেই জিততে পারবে না। কিন্তু ক্রিকেটে আমরা হারিয়েছি পৃথিবীর সব সেরা দেশকেই। অর্থাৎ ফুটবলে বিজ্ঞান আছে বলেই ব্রাজিল খেলাটার ওপর এক ধরনের কমান্ড প্রতিষ্ঠা করেছে। দণি আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা পাকিস্তান ক্রিকেটে তা পারেনি। আসলে ক্রিকেটকে মহৎ বানিয়েছেন এর ধারা ভাষ্যকাররা। ক্রিকেট লিটারেচারকে তারা একটা জায়গায় নিয়ে গেছেন। কোন ব্যাটসম্যান যখন একটা ভালো স্ট্রোক করল, কমেন্টেটর চিৎকার করে বলছেনÑ ম্যাগনিফিসিয়েন্ট, ফ্যানটাসটিক, লাভলি, ব্রিলিয়ান্টÑ আরও কত কী? সেই ব্যাটসম্যান যখন আউট হলেন, তখন প্রশংসাটা হচ্ছে বোলারের অথবা যিনি ক্যাচ ধরেছেন তার। এমন প্রশংসা যে, ব্যাটসম্যান কোন পদার্থই নয়। ক্রিকেটের প্রতিটি স্ট্রোকই ম্যাগনিফিসিয়েন্ট, আউট করা প্রতিটি বলই লাভলি। বিশেষণের সুপারলেটিভ ডিগ্রির এমন ছড়াছড়ি অন্য কোন খেলায় নেই। ক্রিকেটের ‘রেকর্ড’ সবচেয়ে হাস্যকর ক্রিকেট-সাহিত্য। এর সবকিছুকেই রেকর্ডের আবরণ দেয়া হয়। ওয়ানডে অথবা টেস্টের ১২তম ওভারে হয়তো ২৫ রান সংগ্রহ করল কোন দল; ব্যস, একটা রেকর্ড হয়ে গেল যেÑ ১২তম ওভারে এটাই সর্বোচ্চ রান! ১৩তম ওভারে কোন রান হল না, তো এবারের রেকর্ডÑ এই প্রথম ১৩তম ওভারে কোন রান হয়নি। শচীন টেন্ডুলকার বোধকরি নিজেও চান না তাকে নিয়ে রেকর্ডের এত সাহিত্য রচিত হোক। ক্রিকেট-সাহিত্য নিয়ে যখন কথা উঠল, তখন বলতে হয় এ সাহিত্যই বলে দেয়Ñ ক্রিকেট একটি অনিশ্চয়তার খেলা, যেমনটা সাপ-লুডু। কোন ফিল্ডার হয়তো ক্যাচ মিস করলেন, ভাষ্যকার বলছেনÑ ব্যাটসম্যান একটা লাইফ পেলেন। আমার জীবন আমার হাতে, কে কাকে লাইফ দেয়? ব্যাটসম্যান যে টিকে গেলেন, সেটা কি তার যোগ্যতায় নাকি ফিল্ডারের অযোগ্যতায়? ক্রিকেটকে বলা হচ্ছে অ্যা গেম অফ গোরিয়াস আনসারটেইনিটি! পাঠক বুঝুন, আনসারটেইনিটিরও গোরি থাকে! অনেকে বলতে পারেন, ক্রিকেট সম্পর্কে যেসব কথা বলা হল, অন্য খেলায়ও তো সেগুলো বিদ্যমান। ব্রাজিল কি হারে না? অনিশ্চয়তা কি নেই ফুটবলে? ক্যাচ ধরা, না ধরার কারণে যেমন ব্যাটসম্যানের ভাগ্য নির্ধারিত হয়, তেমনি গোলকিপারের সাফল্য-ব্যর্থতায় কি শুটারেরও সাফল্য-ব্যর্থতা নির্ধারিত হয় না? কিংবা দাবায় প্রতিপরে ভুল চাল কি আমাকে জিততে সাহায্য করে না? সবই ঠিক আছে। কথাটা হচ্ছে, কোন্ খেলায় এগুলোর পরিমাণ কত কম বা বেশি। দাবায় প্রতিপরে ভুল চাল আমাকে জিততে সাহায্য করবে তখনই, যখন সেই চালের বিপরীতে আমার চালটা হবে শুদ্ধ। খেলার ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটা এখানেই। ক্রিকেটে সেই নিয়ন্ত্রণ নেই অথবা থাকলেও খুব কম। ব্রাজিল হারতে পারে বৈকি। কিন্তু হারলেও ক্রিকেটের ৮/৯ উইকেটে হারার মতো ‘গো’হারা হারবে না কখনোই।নব্বই মিনিটের ফুটবলে খেলোয়াড়রা গতি ও কৌশলের যত ভ্যারিয়েশন (প্রকারভেদ) দেখাতে পারেন, পাঁচ দিনের টেস্টে ক্রিকেটাররা তার ভগ্নাংশও পারেন না। বোলার বল করছেন নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে দৌড়ে এবং একই ভঙ্গিতে। বলের গতিও প্রায় একই থাকছে। স্পিনারদের েেত্র সুইংয়ের ভিন্নতা হয় অবশ্য। একে মুদ্রাদোষের বোলিং ছাড়া কী বলা যেতে পারে? অথচ একজন ফুটবলার মাঠের কোন প্রান্তে কখন কত প্রিতায় বল নিয়ে ছুটবেন, তা কেউ জানে না। প্রতি মুহূর্তেই দর্শক নতুন নতুন বিজ্ঞান আশা করতে পারেন। ব্যাটসম্যানদের অবশ্য স্ট্রোকের ভিন্নতা থাকে এবং তাদের থাকে একটা স্টাইল। ওই স্টাইলটাই বোধকরি ক্রিকেটের গ্যামার, ওটাই জিনাত আমানদের মুগ্ধতা। ক্রিকেটারদের টাইটেলগুলো ল্য করা যাক। গাভাস্কার কী? লিটল মাস্টার। শচীন কিংবা লারা? রান মেশিন। মুরালিধরন কী? মাস্টার অফ স্পিন। হল কী? ম্যান মাউন্টেন। গ্রিনিজ গর্ডন হলেন ফ্যাশ গর্ডন। দ্রাবিড়? দ্য ওয়াল। লিলি দ্য বুচার। ফুটবলারদের এমন টাইটেল নেই। পেলেকেই শুধু বলা হয় ফুটবলের রাজা। ক্রিকেট-সাহিত্য বলে কথা।আসলেই ক্রিকেটের পুরোটাই শিল্পকলা, সাহিত্য। এখানে বিজ্ঞান বলে কিছু নেই। একজন কবি যেমন আগের মুহূর্তেও জানেন না, তার পরবর্তী লাইনটি কেমন হবে, একজন বোলারও তেমনি বলটি ছোড়ার আগ মুহূর্তেও জানেন না, সেটি কেমন সুইং করবে। লাইনটি লেখার পর কবি দেখলেন, সেটি অসাধারণ এক চরণ। বোলারও বল ছোড়ার পর বুঝলেন, ওটি এক চমৎকার গুগলি হয়েছে। ক্রিকেটে কোন্ দল কখন জিতবে অথবা হারবেÑ তা জোর দিয়ে বলা যায় না। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে বাংলাদেশের পরাজয়টা শোচনীয় হয়েছে। তাতে কী? লুডু খেলায় এমনটা হতেই পারে। এতে গানির কিছু নেই। বিস্মিত হয়েছি দেখে যে, হেরে যাওয়ার পর বাংলাদেশের একশ্রেণীর সমর্থক ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলোয়াড় বহনকারী গাড়িতে ঢিল ছুড়েছে। তাদের জন্য ক্রিকেট-সাহিত্যেই তো সান্ত্বনা লুকিয়ে আছে। একে আনসারটেইনিটির গোরিয়াস হার ধরে নিলেই তো হতো! ক্রিকেটে বাংলাদেশ হেরে গেলে মন খারাপ হয়ে যায় আমাদের। বিষণœতায় কারও সঙ্গে কথা বলতেও ইচ্ছে করে না। ভবিষ্যতে আমাদের জয়ের মতো হারের মুখও দেখতে হবে পৌনঃপুনিকভাবে। হারের বিষণœতা থেকে রা পাওয়ার জন্য একটা মেন্টাল থেরাপি ব্যবহার করা যেতে পারে। নিউজিল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশ করার মতো জয় আসবে যখন, তখন ধরে নেব যোগ্যতা দিয়েই আমরা তা অর্জন করেছি। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হেরে যাওয়ার মতো পরাজয়ের সময়গুলোয় ভাববÑ ক্রিকেট তো অনিশ্চয়তার খেলা। এ খেলায় যে কোন কিছুই ঘটতে পারে! পুনশ্চঃ এতণ যেসব বলা হল, বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মাশনাফিরে কণ্ঠে তার মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। ভারতের বিরুদ্ধে পরাজয়ের পর বললেন, তিনি বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে, বাংলাদেশ হেরেছে। এ কথার মানে কী? মানে বিজ্ঞান, মেধা, শ্রম, নিষ্ঠাÑ এসবের কোন মূল্য নেই। শফিউল ঘুঁটি চালার পর দেখলেন, ছয় উঠেছে। এই ছয় বাংলাদেশকে নিয়ে গেল মইয়ের ঘরে। ব্যস, এক লাফে জয়ের ঘর। তার চালে একও উঠতে পারত এবং সেটা সাপের মুখ। তাহলে কী হতো?
0 comments:
Post a Comment