ড.ফোরকান আলী
বাংলাদেশের মানুষের জীবনের সঙ্গে নদী, জলাশয় এবং অরণ্যের একটা অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। আর্থ-সামাজিক প্রোপটেও এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে খাল, জলাশয়গুলি সুসংরতি হলে তাতে পরিবেশ থাকবে নির্মল। ইহা শহরাঞ্চলের শোভা বর্ধন করিতে পারে এবং বাতাসকে রাখিতে পারে স্বাভাবিক ও গতিময়। শহর কিংবা গ্রাম সর্বত্রই জলাভূমির অস্তিত্ব মানব জীবনের জন্যই অপরিহার্য। কিন্তু দিন দিন যেভাবে ঝিল-জলাশয় ভরাট ও বেদখল হইয়া যাইতেছে, তাহাতে উদ্বিগ্ন না হইয়া পারা যায় না। আমাদের দেশে জলাধার সংরণ আইন ছাড়াও পরিবেশ বিভাগ ও স্থানীয় সরকার বিভাগ আছে। আছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপ বা রাজউক। তবু জলাধারগুলি হাতছাড়া হইয়া যাইতেছে। সেইগুলি ভরাট করিয়া গড়িয়া উঠিতেছে বড় বড় বিল্ডিং। এইখানে সংগত কারণে জলাভূমি সংরণে জনসম্পৃক্ততার কথাও আসিয়া পড়ে।
ঢাকায় “মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চল সংরণ” শীর্ষক এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। ইহার আয়োজক ছিল বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)। সভায় বলা হয় যে, বিশেষ করিয়া রাজধানীর জলাভূমির বেশিরভাগ ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। এখনই বাকিগুলি সংরণের উদ্যোগ গ্রহণ না করিলে সর্বনাশের কিছুই অবশিষ্ট থাকিবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, তখন মাটির নিচে আর পানির পুনর্ভরণ হইবে না। ইহাতে কৃষি ও মৎস্য খামার একেবারে বিলুপ্ত হইবে। ধ্বংস হইবে জীব-বৈচিত্র্য এবং নানা দিক দিয়া জনগণ হইবে সুবিধাবঞ্চিত। সভায় আরো বলা হয় যে, রাজউকের মাস্টার প্ল্যানে খুব শক্তভাবে জলাভূমি সংরণের কথা বলা হইয়াছে। কিন্তু রাজউক নিজেই তাহা মানিয়া চলিতেছে না বলিয়া তাহারা অভিযোগ করেন। সভায় উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধ হইতে জানা যায় যে, বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পে প্রায় ৪৫ শতাংশ জমি নেওয়া হইয়াছে জোর করিয়া, প্রায় ২৬ শতাংশ দখল করা হইয়াছে অতর্কিতে বালি ফেলিয়া। ১৮ শতাংশ নেওয়া হইয়াছে নামমাত্র দামে। এমনকি প্রকল্প এলাকায় ৯২ শতাংশ মানুষই জমি বিক্রি করিতে ইচ্ছুক ছিলেন না।পরিসংখ্যানে আরো বলা হয় যে, রাজধানী ও আশেপাশের ৪৯টি আবাসন প্রকল্প রহিয়াছে বন্যাপ্রবণ এলাকায়। ইহাছাড়া বেসরকারী আবাসন প্রকল্পগুলির মধ্যে অনুমোদিত ৩৪টি। আর অননুমোদিত ৮৭টি। অননুমোদিত প্রকল্পগুলি যেন দেখার কেহ নাই। এভাবে রাজধানীর লেকের সঙ্গে অন্যান্য জলাশয়ের যে সংযোগ ছিল তাহা ভূমিদস্যুদের দখল প্রক্রিয়ায় চলিয়া গিয়াছে। ইহাতে ধ্বংস হইয়া গিয়াছে হাতির ঝিল ও বেগুনবাড়ি খাল দিয়া মহানগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। ফলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে সংশ্লিষ্ট এলাকায় জলাবদ্ধতাজনিত যে দুর্ভোগ দেখা দিবে ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। জলাবদ্ধতায় সীমাহীন কষ্ট করিবার অভিজ্ঞতা নগরবাসীর ইতিমধ্যেই হইয়াছে। জলাশয়গুলি সংরণ ও উন্নয়নের পদক্ষেপ গৃহীত না হইলে ভবিষ্যতে ইহার পরিণাম হইবে আরো ভয়াবহ।বুড়িগঙ্গা, শীতল্যা, তুরাগ, বালু ও ধলেশ্বরী -এই পাঁচটি নদী ঢাকাকে ঘিরিয়া রাখিয়াছে। কিন্তু নদী ও নদীসংলগ্ন খালগুলি ক্রমান্বয়ে ভরাট হইয়া যাইবার ফলে ঢাকা বিপর্যয়ের মুখে পড়িয়াছে। ঢাকা ছাড়াও সারাদেশে ছিল অসংখ্যা খাল-বিল-হাওর-পুকুর-ডোবা ইত্যাদি। কিন্তু তাহার অধিকাংশই এখন বিলীন হইয়া গিয়াছে। বর্তমানে ঢাকায় ২৫/২৬টি খালের অস্তিত্ব পাওয়া যায় কিন্তু এইগুলিও স্থানে স্থানে ভরাট কাজ চলিতেছে। জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী ভরাট খালগুলি পুনরুদ্ধার করিয়া খনন করিবার নির্দেশ দিয়াছিলেন। এইজন্য একটি কমিটিও গঠন করা হইয়াছিল। কমিটি ঢাকার ৪৩টি খাল চিহ্নিত করিয়া ১৩টি খাল পুনরুদ্ধারে অভিযান চালাইবার ঘোষণা দেয়। কিন্তু সেই ঘোষণা কাগজেই থাকিয়া গিয়াছে। বাস্তবে ইহার প্রতিফলন আমরা দেখিতে পাই নাই। এ রূপ নির্দেশ আরো অনেক রহিয়াছে। ২০০০ সালের ২২ মে সরকারি এক আদেশে বলা হইয়াছিল যে, কোন অবস্থাতেই খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের স্বাভাবিক গতি ও প্রকৃতি পরিবর্তন করা যাইবে না। এমনকি সড়ক, মহাসড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণকালেও প্রাকৃতিক জলাশয়, জলাধার, খাল, নদী ইত্যাদির স্বাভাবিকতা নষ্ট করা যাইবে না। জনস্বার্থে সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য একান্তই যদি তাহা করিতে হয় তাহা হইলে সরকারের অনুমতি গ্রহণ করিতে হইবে। কিন্তু সরকারের আদেশের কেউ তোয়াক্কা করিতেছে না বলিয়াই জলাশয়গুলি ভরাট হইয়া যাইতেছে। বাস্তবে ইহার পশ্চাতে রহিয়াছে আরো কয়েকটি কারণ। বিশেষ করিয়া জনসংখ্যার চাপ ও অন্যান্য কারণে শহর ও মহানগরের জমির দাম হইয়াছে আকাশচুম্বী। জলাভূমি রার স্বার্থে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করা প্রয়োজন। তবে ইহার জন্য সরকারের পাশাপাশি জনগণের সম্পৃক্ততা কাজে দিতে পারে। বর্তমান দেশের নূতন প্রোপট ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ইহার গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ সর্বশ্রেণীর মানুষ একত্রিত হইয়া নাগরিক আন্দোলন গড়িয়া তুলিলে জলাভূমিগুলি অচিরেই রা পাইতে পারে। এইজন্য মহল্লায় মহল্লায় নাগরিক কমিটি গড়িয়া তোলা প্রয়োজন। আইনগত ও নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থাদিও গ্রহণ করা দরকার। সর্বোপরি জলাভূমি রায় সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়েরও প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে।
†jLK: W.†dviKvb Avjx
M‡elK I mv‡eK Aa¨¶
36 MMbevey †ivo,Lyjbv
01711579267
Email- dr.fourkanali@gmail.com
0 comments:
Post a Comment