ফোরকান আলী
নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে এনে নদীকে সচল করার জন্য মাটি খনন (নদী খনন) এবং বর্ষায় নদীভাঙনের হাত থেকে দেশের বিভিন্ন জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে রার জন্য বক ফেলার কাজে শত শত কোটি টাকা লোপাট ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান কাজ শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে নদী খননের দুটি প্রকল্প থেকেই ১০ কোটি টাকার কাজে রাষ্ট্রের অন্তত ৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার জলজ্যান্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, দেশে এ ধরনের প্রকল্প রয়েছে শতাধিক। সব প্রকল্প থেকেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহায়তায় ঠিকাদাররা হাতিয়ে নিয়েছে শত শত কোটি টাকা। দুদক মনে করে, বক ফেলা ও নদী খননের নামে কি পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে তা নির্ধারণ করাও কঠিন। তবে তাদের ধারণা, এই খাতে স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। এর সঙ্গে মতাসীন রাজনৈতিক দলসহ বিগত সরকারের স্থানীয় নেতারাও জড়িত রয়েছেন বলে জানা গেছে। দুদকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, যেসব ঠিকাদার এসব প্রকল্পের কাজ পান তারা সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে কোন না কোনভাবে সম্পৃক্ত। এজন্য সুযোগ ও দলীয় আনুকূল্য পেয়ে দুই হাতে টাকা কামিয়ে নেন। অনেকে নামে ঠিকাদার। প্যাডসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের। বাস্তবে তারা জেলার রাজনীতি করেন এবং মতাসীনদের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কাজ বাগিয়ে নেন। এমনও নজির রয়েছে, তারা এক সরকারের আমলে নদীতে বক ফেলার কাজ পেয়েই কোটিপতি হয়ে যান। গড়ে তোলেন বাড়ি-গাড়ি। এমন বহু দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ এখন দুদকের হাতে। দেশের মানুষকে ঠকিয়ে রাষ্ট্রের অর্থ তছরুপকারী দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের অনেকের নাম-ঠিকানা সংগ্রহের কাজও চলছে বলে জানা গেছে।
এমনও তথ্য পাওয়া গেছে, প্রকল্পগুলোতে কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে টেন্ডার অনুযায়ী যে পরিমাণ ব্লক ফেলা দরকার তা ফেলা হয়েছে। কিন্তু তা কে তদারকি করেনি। কেউ দেখেনি কতগুলো বক নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় ফেলা হয়েছে। তাই পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের যোগসাজশে তারা সহজেই সরকারি টাকা নিজের পকেটে ভরে নিতে পারে। ভোলা জেলার নদী এলাকা চৌধুরী লঞ্চঘাট থেকে মেঘনা রিভার রুট (নৌ-রুট) পর্যন্ত নদী খননের একটি প্রকল্পে ২ লাখ ঘনমিটার মাটি কাটা বা খনন করার জন্য লোক দেখানো টেন্ডার আহ্বান করা হয়। টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী রাজধানীর ৫৬-৫৭, মতিঝিলের শরীফ ম্যানশনের মেসার্স মাইক্রোম্যাক্স অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস ২ লাখ ঘনমিটার মাটি খননের কাজ নিয়ে মাত্র ৬৫ হাজার ২১৩ ঘনমিটার মাটি উত্তোলন করে। টেন্ডার অনুযায়ী মোট কার্যাদেশ ছিল ২ কোটি ২৪ লাখ টাকার। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৭৩ লাখ ৩ হাজার ৯১৬ টাকার মাটি খনন করে ২ কোটি টাকারই বিল তুলে নেয়। এ টাকা থেকে ভাগ পান পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওই প্রকল্পের পরিচালক ও বিআইডবিব্লউটিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম, প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী মোঃ সানাউলাহ, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ আনোয়ার হোসেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোম্যাক্সের স্বত্বাধিকারী বিমল চন্দ্র ভদ্র প্রকল্পের কর্মকর্তাদের হাতে নগদ টাকা এবং চেক তুলে দিয়ে নিজে প্রায় দেড় কোটি টাকা মাটি খনন না করেই তুলে নিতে সম হন।দুদকের সহকারী পরিচালক ভোলায় ওই প্রকল্পে মাটি খননের কাজে দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধান করেন। অনুসন্ধানে তিনি জানতে পারেন, প্রকল্প পরিচালক ঠিকাদারকে কাজ না করে অতিরিক্ত দেড় কোটি টাকা ছাড় করিয়ে দিতে নিজে ৩০ লাখ টাকা নিয়েছেন। এই টাকা তিনি নিজের নামে এবং স্ত্রীর নামে ঠিকাদারের কাছ থেকে চেকের মাধ্যমে নেন। বাকি দুই প্রকৌশলীও কয়েক লাখ টাকার সুবিধা পান। প্রাথমিক অনুসন্ধানে দুর্নীতির হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়ায় বিআইডব্লিউটিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম ও ঠিকাদারসহ চারজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করেছেন। সোমবার রাজধানীর মতিঝিল থানায় এ মামলা করা হয়। এদিকে বিআইডবিব্লউটিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করতে গিয়ে দুদক আরও জানতে পারে, তিনি শুধু ভোলার একটি প্রকল্প থেকেই ঠিকাদারের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তা নয়, রাজবাড়ী জেলার দেলদিয়াঘাট এলাকায় মোহনপুর দই খাওয়া রুটে পদ্মা নদীতে ৮ লাখ ঘন ফুটমিটার মাটি খননের কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও মোটা দাগে টাকা নিয়েছেন। করেছেন ব্যাপক অনিয়ম। টেন্ডার অনুযায়ী ওই নদীতে মাটি খননের কথা ছিল ৮ লাখ ঘনমিটার। কিন্তু মাটি খনন করা হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৪১ হাজার ১৮৬ ঘনমিটার। এই প্রকল্প থেকে ৮ লাখ ঘনমিটার মাটি খনন করা হয়েছে বলে ৮ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৩৪ টাকা বিল তুলে নেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ৮ কোটি টাকার মাটি খননের কাজে মাটি খনন না করেই দুর্নীতির মাধ্যমে অতিরিক্ত ৫ কোটি ৬২ লাখ ১৩ হাজার ১০১ টাকা তুলে নেয়া হয়। ভয়াবহ এই দুর্নীতির বিষয়েও মামলা করেছে দুদক। দুদকের সহকারী পরিচালক হক বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় এ মামলা করেন। মামলায় সাইফুল ইসলাম ছাড়াও প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী (ড্রেজিং) ও বর্তমানে নির্বাহী প্রকৌশলী (ড্রেজিং) বিআইডবিব্লউটিএ’র এসএম মাসুকুল আলম, সহকারী প্রকৌশলী (ড্রেজিং) মোঃ আক্তারুজ্জামান ভূঁইয়া, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপরে ড্রেজিং বিভাগের এসএই রোমান হোসেন এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাজধানীর ১২, আউটার সার্কুলার রোডের সেল অ্যান্ড কিটওয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ শেখ আল আরেফিনকে আসামি করা হয়েছে। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা জানান, দেশের নদী খনন এবং নদীতে ব্লক ফেলার কাজে কি পরিমাণ দুর্নীতি হচ্ছে তার সামান্য ধারণা মেলে দুটি প্রকল্পের লোপাট থেকেই। তিনি বলেন, প্রকল্প দুটিতে ১০ কোটি টাকার কাজের মধ্যে ৭ কোটি টাকারই কাজ করা হয়নি। খনন করা হয়নি ভরা নদীর মাটি। অথচ রাষ্ট্রের টাকা ঠিকই ভাগবাটোয়ারা হয়ে গেছে। জানা গেছে, মাটি খনন ঠিক মতো না করার কারণে ওইসব নদী দিয়ে লঞ্চ-স্টিমার চলতে পারছে না। অন্যদিকে নদী খনন না হওয়ায় এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নদী সচল না হওয়ায় নদীতে মাছও কমে যাচ্ছে এবং নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। দুদক চেযারম্যান বলেন, নদীপথে এত বড় বড় দুর্নীতি হয় এতদিন জানা ছিল না। এখন দেখা যাচ্ছে সর্বত্রই এক অবস্থা। আমরা নদীভাঙন ঠেকাতে বব্লক ফেলা এবং নদী খননে দুর্নীতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা আশাকরি দেশের নদী বাঁচাতে সংশ্লিষ্ট কতৃপ পদপে নিবেন।
†jLK: W.†dviKvb Avjx
M‡elK I mv‡eK Aa¨¶
36 MMbevey †ivo,Lyjbv
01711579267
Email- dr.fourkanali@gmail.com
0 comments:
Post a Comment