Friday, November 22, 2013

নদী বাঁচলে আমরা বাঁচবো


নদী বাঁচলে আমরা বাঁচবো
ফোরকান আলী
প্রকৃতিগত দিক দিয়ে নদী এ দেশের অর্থনীতির বুনিয়াদ। পেশাগত দিক থেকে জীবন-জীবিকার একটি অংশ নির্ভরশীল এদেশের নদ-নদীর ওপর। আমাদের কৃষি সম্পদ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, আমাদের পরিবেশÑ এর সবই নদীনির্ভর। অর্থাৎ নদীকে বাদ দিয়ে এদেশের উন্নয়ন মানুষের জীবন কল্পনাই করা যায় না। সংখ্যার দিক থেকে মতপার্থক্য থাকলেও চার শতাধিক নদ-নদী জালের মতো বিস্তার করে আছে। এক লাখ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ হচ্ছে বাংলাদেশ। এ দেশের বুকের ভেতর নদ-নদীগুলো প্রতিবছর প্রায় আড়াই বিলিয়ন টন পানি বহন করছে। বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যৎ বাণী হচ্ছে- কখনো যদি ৮ রিখটার স্কেলে কোনো ভূমিকম্প বাংলাদেশে হয় তাহলে প্রধান প্রধান নদীগুলোর প্রবাহ পথ পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র এই তিনটি নদীর ওপর আঘাত আসলেই এর অন্তর্গত শাখা ও উপনদীগুলো তিগ্রস্ত হবে এবং শুকিয়ে যাবে, মরে যাবে।
নদী মরে যাওয়ার নেপথ্যে মনুষ্য সৃষ্ট কারণগুলোও কম ভয়াবহ নয়। বাংলাদেশ ভাটির দেশ। উজানের দেশ ভারত। আমাদের ৫৪টি নদীর পানির উৎস হচ্ছে ভারত। ভারত ওসব নদীর উৎস মুখ আটকে দেয় বিভিন্ন বাঁধ ও স্লুইচ গেইটের মাধ্যমে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে আমাদের নদ-নদীগুলোতে পরিমাণ মতো পানি থাকে না। আবার বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানিতে বানে ভাসে এদেশের মানুষ। উজানের দেশ বলে ভারত এ সুযোগ নিচ্ছে। তাদের খেয়াল খুশি মতো নদী শাসন করছে। ভারত ইতিমধ্যে দৃশ্যমান নদ-নদীগুলোর ওপর ৩ হাজার ৬০০টি বাঁধ বেঁধে ফেলেছে। আরো ১০০০টি বাঁধের নির্মাণ কাজ চলছে পুরোদমে। গত ৫৫ বছরে ভারতে বন্যা-খরায় য়তির পরিমাণ কত? এ ব্যাপারে তাদের পরিসংখ্যান নেই। থাকলেও সেটা কেউ জানে না। সেটা রাষ্ট্রীয় গোপন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফারাক্কা বাঁধসহ ভারতের ভূখ- নির্মিত বাঁধের প্রতিক্রিয়া বর্ষা মৌসুমে উপলব্ধি, তেমনি শুষ্ক মৌসুমেও। ভারত একতরফাভাবে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে পদ্মা নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়াও সীমান্ত বরাবর হাইওয়ে সড়ক নির্মাণ করতে গিয়ে অভিন্ন নদী ইছামতি কোদলসহ দণি-পশ্চিম সীমান্তের সব নদী ও খালের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে যা এই অঞ্চলের মানুষের কাছে মিনি ফারাক্কা হিসেবে চিহ্নিত।
পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানা যায়, দণি-পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় এক লাখ খাল-বিল, পুকুর, দীঘি রয়েছে। এর সিংহভাগেই শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকে না। জমিতে চাষাবাদ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই অঞ্চলে মোট ৬০০টি বাঁধও রয়েছে। এদের মোট আয়তন ৫ হাজার ৫০০ হেক্টর। এর মধ্যে মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রয়েছে কোট চাঁদপুর, মহেশপুর ও চৌগাছা এলাকায় ৮টি বাঁওড়। বাঁওড়গুলো দীর্ঘদিন যাবৎ পরিকল্পিতভাবে মৎস্য চাষ করা হচ্ছে। বাঁওড়গুলোতে পানি কমে যাওয়ায় মৎস্য চাষও কমে যাচ্ছে। এটা হচ্ছে দেশের একটি অংশের নদ-নদী, খাল-বিল ও বাঁওড়ের অংশবিশেষের দৃশ্যপট। সব মিলিয়ে সারাদেশে নদ-নদীগুলোর অবস্থা অত্যন্ত করুণ। সামনের দিনগুলোতে নদীগুলো আরো খারাপের দিকে এগুবে। ভারতের কথা বাদ দিলেও আমাদের দেশের অভ্যন্তরে নদী শাসনের নামে এলোপাতাড়ি বাঁধ প্রকল্প, অপরিকল্পিত নগরায়ন, নদী ভরাট করে লোকালয় সম্প্রসারণ, নদীতে গৃহস্থালি, হাসপাতাল, বাজার, শিল্প স্থাপন এবং শিল্পের নির্বিচারে অপরিশোধিত বর্জ্য নিক্ষেপে, বড় বড় শহর-বন্দর সংলগ্ন অনেক নদ-নদী স্বাভাবিক প্রবাহ দ্রুত হারিয়ে ফেলছে। নদী জলজ প্রাণীদের বসবাসের অনুপযোগী করছে এবং তাদের মৃত্যু ডেকে আনছে। নদী বেঁচে থাকলেও নদীর পানি হয়ে পড়েছে বিষাক্ত।
আরেকটি বিষয়, যার কারণে আমাদের নদীগুলো রুগ্নদশা হয়ে যাচ্ছে। সেটি হচ্ছে, নদীর বুকে নাব্য কমে যাওয়া। ভূমি য়জনিত যে পলি নদীর পানির সঙ্গে মিশছে এত করে কালক্রমে নদীর নাব্য কমে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে স্রোতের বেগও। ফলে নদীর বোঝা বহন ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। তখন নদী তার বহন মতার অতিরিক্ত বোঝা নদীর তলদেশ বা মোহনার কাছে অধঃপেণের মাধ্যমে সঞ্চয় করে। তাতে করে নদীর বুকে জেগে উঠে বড় বড় চর। এছাড়া নদী যখন স্রোতের তীব্রতার তুলনায় বালি ও কাঁকরের মাপ বড় হলে নদী পলি সরাতে অসমর্থ হয়ে উঠে। নদী তার বৈশিষ্ট্য হারায়, হারিয়ে ফেলে পানি ধারণ ক্ষমতা। খরস্রোতা ক্ষীণস্রোতে রূপ নেয়। আয়তন কমতে থাকে। শুকিয়ে যায় নদী। কলক্রমে হারিয়ে যায়। নদী দখলের কারণও নদী তার আপন বৈশিষ্ট্য হারায়। ছোট হয়ে পড়ে। দখলদাররা অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলে নদীর বুকে। ভরাট করে নেয় নদীর দুই পাশ। ক্রমান্বয়ে নদীর পাড় দখল হতে হতে এক সময় নদী হারিয়ে যায় জনবসতির ভেতর। রাজধানীর নদী বুড়িগঙ্গার কথা অনেকেরই জানা। অবৈধ স্থাপনা স্থাপনে এবং অবৈধ দখলদারদের অত্যাচারে বুড়িগঙ্গা এখন বুড়ি হয়ে গেছে। ঢাকার অপরদিকে বালু নদী, তুরাগ নদীও ক্রমান্বয়ে দখলদারদের দখলে। ইতোমধ্যে ঢাকার অপর নদী মিরপুর নদী হারিয়ে গেছে। এখন দেশের যেসব নদী অবৈধ দখলদারদের রাহুগ্রাসের কবলে রয়েছে, তাহলো- নারায়ণগঞ্জের শীতল্যা, সাভার, ধামরাইয়ের বংশাই নদী, ময়মনসিংহ (নান্দাইল)-এর নরসুন্দা নদী, যশোরের ভৈরব নদী, কপোতা, রাজশাহীর বড়াল নদীসহ-এ তালিকায় রয়েছে আরো অনেক নদী। মূলকথা হচ্ছে নদীকে না জানলে বাংলাদেশকে জানা যায় না। আর নদী না বাঁচলে, আমরাও বাঁচবো না।


†jLK: W.†dviKvb Avjx
M‡elK I mv‡eK Aa¨¶
36 MMbevey †ivo,Lyjbv
01711579267



0 comments:

Post a Comment