ড.ফোরকান আলী
বাংলাদেশের গ্রামগুলো একসময় দারিদ্র্য, শিাহীনতা, ুদ্রতা, কূপমণ্ডূকতা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদিতে ভরপুর ছিল। তখনকার অবস্থা ছিল কিছুটা হবস কথিত প্রকৃতির রাজ্যের মতো। সেসব পরিস্থিতি এখন অনেকটা পাল্টেছে। এখন গ্রামের মানুষ চাইছে তাদের বাড়ির কাছের রাস্তা পাকা হোক, বাড়িতে বিদ্যুৎ, টেলিফোন, ইন্টারনেট ও গ্যাসের সংযোগ আসুক; গ্রামের মধ্যেই আধুনিক বাজার, শিা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসালয়, যন্ত্রযান ব্যবস্থা, লাইব্রেরি, বিনোদনকেন্দ্র, ক্রীড়া কাব গড়ে উঠুক এবং সর্বোপরি তাদের অকৃষি পেশার সুযোগ ব্যাপকতর হোক। সরকারও জনগণের এসব আকাা পূরণে যথাসাধ্য চেষ্টা করে চলেছে। এ ধারা বজায় থাকলে ২০২০ সালের মধ্যে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী এবং ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় পুরো জনগোষ্ঠী নগরবাসী হয়ে যাবে। কিন্তু একশ্রেণীর নগরীয় বুদ্ধিজীবী(!) এই পরিবর্তনের ধারাকে মেনে নিতে পারছেন না। নিজেরা নগরবাসী হয়েও তারা এক ধরনের নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বলছেন, ‘এতে গ্রামবাংলার আবহমানকালের চিত্র হারিয়ে যাবে। গ্রামের মানুষগুলো সহজ-সরল জীবন ত্যাগ করে যান্ত্রিক জীবনে চলে যাবে। তাই বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে এ প্রক্রিয়া এখনই বন্ধ হওয়া উচিত।’ প্রসঙ্গক্রমেই প্রশ্ন হল, তারা উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রগতি ও ভবিষ্যৎমুখী মানুষের প্রবল আকাার চাকা পেছনের দিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছেন কেন? চাইলেও তা কি তাদের পে করা সম্ভব হবে?
সভ্যতার ঊষালগ্নে মানুুষ যাযাবর জীবন পরিত্যাগ করে কৃষিযুগে প্রবেশ করে। কৃষিজমি আবাদ ও সেখানকার উৎপাদিত ফসল রার জন্য তারা এক জায়গায় স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রয়োজন অনুভব করে। কৃষিকেন্দ্রিক এই স্থায়ী বসবাস থেকেই গ্রামের উৎপত্তি। বহুকাল পরে কলকারখানার বিস্তার গ্রামীণ জীবনে ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করে। শিল্পায়ন ও নগরায়ন হাত ধরাধরি করে চলায় কৃষিকে বাদ দিয়ে নগরায়ন ঘটতে থাকে। ফলে ‘নগর মানে কৃষি নয়’ এ ধরনের একটি বদ্ধমূল ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে এ ধারণা পাল্টাতে শুরু করেছে। কেননা কৃষিকে বাদ দিয়ে শুধু শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি দিয়ে মানুষের নিরাপদ খাদ্যচাহিদা পূরণ সম্ভব নয়; বাস্তব প্রয়োজনেই কৃষি, শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তিকে একসঙ্গে সমগুরুত্বে ধরে রাখতে হবে। এই প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেই বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বে ‘কৃষিকে নিয়েই নগর’ এ ধারণাটি প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি ‘নগরীয় কৃষি’ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’য় বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে লাগাতার ক্যাম্পেইনের ফলে এখন অনেকেই ‘কৃষিকে নিয়েই নগর’ ও ‘নগরীয় কৃষি’ নিয়ে ভাবনা শুরু করেছেন বলা যায়।
একজন নাগরিক কোথায় বসবাস করছেন সেটা বড় কথা নয়, তিনি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন কিনা সেটাই আসল কথা। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান প্রভৃতি দেশে প্রায় শতভাগ নগরায়ন ঘটে গেছে বলে ধরা হয়। একই কারণে অদূর ভবিষ্যতে এদেশের শতভাগ মানুষই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বসবাস করবে। এ রকম একটি যুগান্তকারী ভবিষ্যদ্বাণী ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’য় তুলে ধরা হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে একজন বুদ্ধিজীবী বলে ওঠেন, ‘বলেন কি! আমার এতদিনকার গ্রামভিত্তিক সমাজ গঠনের চিন্তার কী হবে! আমার চাষী ভাইয়েরা কি কৃষিকাজ বাদ দিয়ে সব অকৃষিজীবী হয়ে যাবে!’ আরেকজন কলাম লেখক একটি কলামে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ নগরের দেশ হয়ে গেলে এটি আর বাঁচবে না।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক আরও মজার কথা বলেছেন, ‘মোগল আমলে দুটি স্তর ছিল। ওপরে ছিল সম্রাট আর নিচে ছিল গ্রাম। তখন কি দেশ চলেনি? শোষকরা তাদের স্বার্থে শহর সৃষ্টি করে কিছু অপরিশ্রমী নাগরিক তৈরি করেছে। বর্তমানে পুরো দেশটাই শোষকদের হাতে ছেড়ে দেয়ার জন্য নগরায়ন চাওয়া হচ্ছে।’ কিন্তু উপরিউক্ত বুদ্ধিজীবীদের কেউই গ্রামে বসবাস করেন না; ভবিষ্যতে গ্রামে বসবাস করবেন, এমন কথাও তারা বলেন না। তাদের সন্তান-সন্ততিরা কৃষিকাজ করুক, এটাও তারা কামনা করেন না। কিন্তু গ্রামের মানুষ গ্রামে থাকুক, শুধু কৃষিকাজ করুক, এটাই নগরীয় বুদ্ধিজীবীদের একান্ত কামনা। গ্রামের মানুষগুলোরও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার, পেশাগত পরিবর্তন সাধন করার অধিকার রয়েছে; এসব নগরীয় বুদ্ধিজীবী কেন যে তা চাইছেন না, তার আসল কারণ প্রকাশ্যে বলছেন না। তবে জনগণ আসল কারণটি অবশ্যই বুঝে নেবে বলে আশা করি।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটি লোক ৩১৫টি নগরে বসবাস করে। ২০২০ সাল নাগাদ প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী এবং ২০৫০ সাল নাগাদ প্রায় সমগ্র জনগোষ্ঠী নগরে বসবাস করবে। তাই ক্রমাগত নগরায়নের ধারায় গ্রামীণ স্থানীয় ইউনিটগুলোর জনসংখ্যা হ্রাস পেতে থাকবে এবং নগরীয় স্থানীয় ইউনিটগুলোর সংখ্যা ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। বর্তমানের ৫ হাজার ৩৭১টি স্থানীয় ইউনিটের মধ্যে ৭টি বিভাগ, ৬৪টি জেলা, ৪৮২টি উপজেলা, ৩০৯টি পৌরসভা, ৬টি নগর কর্পোরেশন ও ৪ হাজার ৫০৩টি ইউনিয়ন রয়েছে। স্থানীয় সরকার গবেষক ও সিডিএলজির নির্বাহী পরিচালক আবু তালেব তার প্রণীত ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’য় এসব ইউনিটকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। এ তিনটি ভাগ হলÑ এক. গ্রামীণ স্থানীয় ইউনিট; দুই. নগরীয় স্থানীয় ইউনিট এবং তিন. গ্রামীণ-নগরীয় স্থানীয় ইউনিট। তার এই প্রকারভেদকরণ অনুসারে ৪ হাজার ৫০৩টি ইউনিয়ন ও ১৭৩টি উপজেলা গ্রামীণ স্থানীয় ইউনিট, কারণ এসব প্রতিষ্ঠান শুধু গ্রামীণ এলাকা নিয়ে গঠিত হয়েছে; ৩১৫টি শহর নগরীয় স্থানীয় ইউনিট, কারণ এসব শহর (৩০৯টি পৌরসভা ও ৬টি নগর কর্পোরেশন) আইনত শুধু নগরীয় এলাকা নিয়ে গঠিত; এবং ৩০৯টি উপজেলা, ৬৪টি জেলা ও ৭টি বিভাগ গ্রামীণ-নগরীয় স্থানীয় ইউনিট, কারণ এসব ইউনিট নগরীয় ও গ্রামীণ এলাকার সমন¦য়ে গঠিত। তিনি ২০২০ ও ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ ও গোটা বিশ্ব প্রেতি বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় সরকারের একটি সমনি¦ত স্তরবিন্যাস তৈরির জন্য একটি তত্ত্বগত ফর্মুলা উপস্থাপন করেছেন। এই তত্ত্বগত ফর্মুলা অনুযায়ী স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট হবে গ্রামীণ-নগরীয় স্থানীয় ইউনিট। এরপর একদিকে থাকবে গ্রামীণ স্থানীয় ইউনিট এবং অপরদিকে থাকবে নগরীয় স্থানীয় ইউনিট।
বাংলাদেশের েেত্র বাস্তবে বিভাগকে স্থানীয় সর্বোচ্চ ইউনিট করলে ২০৫০ সাল নাগাদ সরকার ব্যবস্থা নগর, বিভাগ এবং কেন্দ্রÑ এ তিন স্তরবিশিষ্ট হয়ে পড়বে। আর বিভাগকে বিলুপ্ত করে জেলাকে সর্বোচ্চ ইউনিট করা হলে ২০৫০ সাল নাগাদ সরকার ব্যবস্থা নগর, জেলা এবং কেন্দ্রÑ এ তিন স্তরবিশিষ্ট হয়ে পড়বে। তাই আমরা যদি প্রয়োজনীয় কৃষিজমিকে রা করে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগর ও নগরায়ন চাই তাহলে এখন থেকেই একটি উপযুক্ত ডিজাইন মোতাবেক অগ্রসর হওয়ার চিন্তা করতে হবে। সে কারণে ৩১৫টি নগরে ৩১৫টি নগর সরকার প্রতিষ্ঠা করে স্থানীয়দের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগর গঠনের পদপে নিতে হবে। বিভাগকে সর্বোচ্চ ইউনিট ধরা হলে বিভাগের চরিত্র হবে গ্রামীণ-নগরীয়। বিভাগ এক হাতে নগরীয় ইউনিটগুলো (পৌরসভা ও নগর কর্পোরেশন) এবং অন্য হাতে গ্রামীণ ইউনিটগুলো (ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা) তদারকি করবে। আর জেলাকে সর্বোচ্চ ইউনিট ধরা হলে জেলা হবে গ্রামীণ-নগরীয় স্থানীয় ইউনিট। সে েেত্র বিভাগকে অবশ্যই বিলুপ্ত করতে হবে। তখন জেলা এক হাতে নগরীয় ইউনিটগুলো এবং অন্য হাতে গ্রামীণ ইউনিটগুলো পরিচালনা করবে। এভাবে স্তরবিন্যাস করা হলে কোন স্তরটি প্রয়োজনীয় আর কোনটি অপ্রয়োজনীয় তা আপনা আপনি চিহ্নিত হয়ে যাবে এবং স্থানীয় সরকারের স্তরের ও ইউনিটের সংখ্যা কমানোর বিষয়টি সামনে চলে আসবে। কারণ স্থানীয় সরকারের স্তর ও সংখ্যা কমানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে আমরা মনে করি।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অন্য সব গবেষক এবং সরকার নিযুক্ত বিভিন্ন কমিশন/কমিটি দেশের শত শত কোটি টাকা খরচ করে প্রতিবেদন তৈরি করলেও তাতে সরকার ও স্থানীয় সরকারের যথার্থ প্রকারভেদকরণ ও একটি সমনি¦ত স্তরবিন্যাসকরণে সমর্থ হননি। তারা বটম-আপ পদ্ধতি অনুসরণ করে স্থানীয় সরকারের মতা, দায়িত্ব ও অধিকার যথাযথভাবে নির্ধারণ করতে পারেননি, স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ও সর্বনিু ইউনিট নির্ধারণে ব্যর্থতার পাশাপাশি মধ্যবর্তী ইউনিটের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু রয়েছে তা মূল্যায়নে সম হননি, একে গণতন্ত্রের ভিত, স্বশাসিত, স্বাবলম্বী ও গতিশীল করতে প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য ও উপাদান যুক্ত করতে পারেননি। ফলে জনগণ এজেন্টধর্মী স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে প্রত্যাশিত ফলাফল প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। তাই উপরোক্ত বিষয়গুলো যথাযথভাবে ঠিক করে একটি সমনি¦ত স্তরবিন্যাস গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা খুবই জরুরি বলে প্রতীয়মান হয়।
পত্রিকামতে রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপ) শুধু ঢাকার আশপাশেই ড্যাপ (ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান) বাস্তবায়ন করতে চাইছে না, অন্যান্য বিভাগীয় শহরেও এর কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে চাইছে। রাজউক হচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকারের ঢাকা নগরকেন্দ্রিক একটি প্রতিষ্ঠান। এটা রাজধানীর জন্য গঠিত হয়েছে। এর নামটিও তা-ই বলে। এটি রাজধানী অর্থাৎ ঢাকা নগরের পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে; তবুও কেন যে ঢাকা নগরের আয়তন আরও বৃদ্ধি করে তার ও অন্যান্য স্থানীয় ইউনিটের (গ্রামীণ ও নগরীয়) ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করতে চাইছে তা বোধগম্য নয়। রাজউক যেসব জায়গায় আবাসন প্রজেক্ট করতে চাইছে সেখানে কোন না কোন স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট রয়েছে। সেখানকার বাসিন্দারাও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত স্থানীয় ইউনিট চাইছে, চাইবে। তাদের অর্থাৎ তাদের প্রতিনিধিত্বশীল স্থানীয় সরকারকে স্বাধীনতা ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দেয়া হলে তারা সংশ্লিষ্ট শহর ও ইউনিয়নে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগর ও ইউনিয়ন গঠনের মাধ্যমে সেখানকার নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, জলাশয়, খেলাধুলার মাঠ, পার্ক, গোরস্থান, রাস্তাঘাট, পরিবেশসহ সবকিছু রা করতে সম হবে। সেজন্য শুধু ঢাকা শহরকেন্দ্রিক মাতম পরিহার করে এখনই একইসঙ্গে সারাদেশে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত ৩১৫টি নগর ও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত ইউনিয়ন গড়ে তোলা হবে খুবই যুক্তিযুক্ত। এখানে মনে করিয়ে দেয়া উচিত হবে, প্রতিটি ইউনিয়ন হচ্ছে কয়েকটি গ্রামেরই একটি সমষ্টিগত নাম; ইউনিয়নকেন্দ্রিক উন্নয়ন মানেই গ্রামকেন্দ্রিক উন্নয়ন; ইউনিয়নের সঙ্গে ‘গ্রাম’ শব্দটি না থাকার কারণে বিভ্রান্ত হওয়ার কিংবা মানুষকে বিভ্রান্ত করার কোন অবকাশ নেই।
তাই সিডিএলজি’র প্রস্তাব অনুযায়ী স্থানীয় সরকারের সর্বনিু ইউনিট হিসেবে নগর এলাকায় ৩১৫টি নগর সরকার ও গ্রামীণ এলাকায় ইউনিয়ন সরকার গঠন করে এসব সরকারের মাধ্যমে সারাদেশে একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগর ও ইউনিয়ন গড়ার কাজ এখনই শুরু ও তাকে জোরদার করতে হবে।
†jLK: W.†dviKvb Avjx
M‡elK I mv‡eK Aa¨¶
36 MMbevey †ivo,Lyjbv
01711579267
Email- dr.fourkanali@gmail.com
0 comments:
Post a Comment