Tuesday, November 19, 2013

নদ-নদীর বিপন্নদশা

নদ-নদীর বিপন্নদশা
 ফোরকান আলী
আমাদের নদ-নদীগুলো নাব্যতা হারিয়ে এখন মৃতপ্রায়। নদী নিয়ে কর্মরত সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলো এ বিষয়ে নিয়মিত তথ্য দিয়ে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাম্প্রতিক এক জরিপ থেকে জানা গেছে, পলি পড়ে দেশের বেশিরভাগ নদী বিলীন হওয়ার পথে। গত কয়েক বছরে দেশের ১৭টি নদ-নদী সম্পূর্ন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং আরও ৮টি নদ-নদী খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আশংকা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) দেয়া তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন কারণে উত্তরাঞ্চলের ৬৭টি নদ-নদী হুমকির মুখে পড়েছে। এদিকে দণি-পশ্চিমাঞ্চলের ১২টি এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৩২টি নদ-নদী দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বাকি নদ-নদীগুলোর অবস্থাও খুবই করুণ। তবে আশংকাজনক হচ্ছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র দেশের প্রধান এই ৪টি নদ-নদীও পলি জমে ক্রমশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এসব নদ-নদীর বুকে জেগে উঠছে বিশাল বিশাল চর। ফলে প্রধান নদ-নদীগুলো ঘন ঘন চ্যানেল পরিবর্তন করছে। এ কারণে একদিকে প্রবল ভাঙন সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে ভাঙনের মাটি তলদেশে জমে নদীগুলো ভরাট হয়ে বিলীন হয়ে যেতে শুরু করেছে। এসব প্রধান নদ-নদীগুলোর মাধ্যমে হিমালয় থেকে বয়ে আনা পানি দেশের অন্যান্য নদ-নদীতে সরবরাহ করা হয়। ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে প্রধান নদ-নদীগুলোর প্রবাহ ক্রমান¦য়ে কমে গিয়ে এসব নদ-নদীর শাখা-প্রশাখা, উপনদী ও খালগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। দেশের নদ-নদীগুলো বছরে প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন টন পলি বহন করছে। এই বিশাল পরিমাণ পলি জমে নদীগুলো উৎসমুখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে বিলীন হয়ে যেতে শুরু করেছে দেশের নদ-নদীগুলো। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্র জানায়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মোট নদ-নদীর দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার। ১৯৮৪ সালে বর্ষা মৌসুমে ৮ হাজার ৪০০ কিলোমিটার এবং শুকনো মৌসুমে তা কমে দাঁড়ায় ৫ হাজার ২০০ কিলোমিটার। সর্বশেষ জরিপে দেখা যায়, নদ-নদীর মোট দৈর্ঘ্যরে পরিমাণ বর্ষা মৌসুমে ৬ হাজার কিলোমিটার এবং শুকনো মৌসুমে তা ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটারে নেমে আসে। ৩৮ বছরে ১৮ হাজার কিলোমিটার নদ-নদী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পরিসংখ্যান থেকেই প্রমাণ করে নদ-নদীগুলোর করুণ পরিণতির বিষয়টি।
যুগ যুগ ধরে ড্রেজিংয়ের অভাবে পলি জমে ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে নদ-নদীগুলো। উজান থেকে বয়ে আনা পলি, অতিরিক্ত বন্যা, অতিবৃষ্টি, নদী ভাঙন ইত্যাদি নানা কারণে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ন, নদীর ওপর সড়ক-রাস্তা, ব্রিজ-বাঁধ, কালভার্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ, নদী দখল করে বাড়ি-ঘর, শিল্পকারখানা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান স্থাপন, বর্জ্য নিপে ইত্যাদি নদীবিরোধী মানুষের কর্মকাণ্ডের দরুন নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নদীর বুকে জেগে উঠছে বড় বড় চর। জলবায়ুর পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিকভাবে নদীর গতি পরিবর্তনও ভরাটের গতিকে ত্বরানি¦ত করছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মৎস্যসম্পদ, কৃষি ও সেচব্যবস্থা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচলে সংকট সৃষ্টি, জলজ জীববৈচিত্র্যসহ বিপন্ন হয়ে পড়ছে পরিবেশ।
দেশের নদ-নদীগুলো সচল রাখতে প্রতি বছর অন্তত দেড় থেকে ২ কোটি ঘনমিটার পলি অপসারণ বা ড্রেজিং করা প্রয়োজন। বর্তমানে যে ৬ হাজার কিলোমিটার নদী সচল রয়েছে তার প্রবাহ সারা বছর স্বাভাবিক রাখতে বছরে কমপে ৫০ লাখ ঘনমিটার পলি অপসারণ করা প্রয়োজন। কিন্তু কারিগরি দিক থেকে বিআইডব্লিউটিএ’র বার্ষিক ড্রেজিং মতা রয়েছে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ ঘনমিটার পলি অপসারণের। বিদ্যমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এবং নদ-নদীগুলো পুনঃখননের অগ্রাধিকারভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প প্রণয়ন ও এ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের শতভাগ নদ-নদীই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এমন আশংকা করছে বিশেষজ্ঞরা। অতীতের সরকারগুলোর অদূরদর্শিতা, উদাসীনতা, অবহেলা, অদ নদী ব্যবস্থাপনা, অপ্রতুল অর্থ বরাদ্দ আর সেই সঙ্গে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে দেশের নদ-নদীগুলোর এই দুরবস্থা।
নদ-নদীগুলো টিকে থাকার ওপর নির্ভর করছে আমাদের জীবন-জীবিকা ও অস্তিত্ব। নদ-নদীগুলোর এ করুণ পরিণতির খেসারত দিতে গিয়ে প্রতিবছর আমাদের বঞ্চিত হতে হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার ফসল, মৎস্য-বনজ ও প্রাণীজ সম্পদ, নৌ-পরিবহন এবং নগর ও শিল্পায়নের সুবিধা থেকে। সেই সঙ্গে দেশ হয়ে পড়ছে পরিবেশ বিপর্যয়ের অনাকাক্সিত ও অপূরণীয় তির শিকার। নদ-নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় প্রলম্বিত হচ্ছে খরা। ফলে দেশের উত্তরাঞ্চলে শুরু হয়েছে মরুকরণ প্রক্রিয়া। আবার অকাল বন্যায় ডুবে যাচ্ছে দেশ। সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকা লোনাকবলিত হয়ে পড়তে শুরু করেছে। নদ-নদীগুলোর প্রবাহ কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। আর এ কারণে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে পানি সংকট। এক কথায়, বাংলাদেশের নদীমাতৃক সভ্যতা-সংস্কৃতি ও অর্থনীতি এখন হুমকির মুখে। এ পরিপ্রেেিত, বর্তমান সরকার দেশের নদ-নদী ব্যাপকভিত্তিক খননে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপকে। নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি করে বন্যার আশংকা হ্রাস, নদীভাঙন রোধ এবং নৌপথ সচল রাখতে নদ-নদীগুলো ড্রেজিংয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। বহু বছর ধরে দেশের মানুষ নদী ভরাটজনিত নানামুখী সমস্যার শিকার। দুর্বিষহ এ ভোগান্তি থেকে দেশের মানুষকে নিষ্কৃতি দিতে সরকারের এ যুগান্তকারী মহাপরিকল্পনা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও কল্যাণবাহী।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদ-নদীর বিপন্ন দশার নানামুখী বিরূপ প্রভাবে মানুষের জীবন-জীবিকা ও দেশের অর্থনীতি যথেষ্ট তিগ্রস্ত হয়েছে। একসময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বেশিরভাগ সম্পন্ন হতো নদীকে কেন্দ্র করে। নদীনির্ভর কর্মসংস্থানের যে ত্রে ছিল তাও এখন সংকুচিত। এদেশের জীবন ও অর্থনীতিতে যে নদ-নদীর গুরুত্ব অপরিসীম, সেই নদ-নদীকে এমন বিপন্নদশা থেকে উদ্ধার না করা গেলে নিশ্চিতভাবে আমাদের জন্য অপো করছে ভয়ঙ্কর এক ভবিষ্যৎ।
†jLK: W.†dviKvb Avjx
M‡elK I mv‡eK Aa¨¶
36 MMbevey †ivo,Lyjbv
01711579267




0 comments:

Post a Comment