পথশিশুর অবহেলা: কারো কাম্য নয়
ফোরকান আলী
পথের মাঝেই তাদের জন্ম। তাই পথকেই তারা বন্ধু ভেবে নিয়েছে। জীবনের পথ আর বাস্তবতার সিঁড়ি এক বিন্দুতেই তাদের জন্য ধরা দেয়। পথকলি, টোকাই কিংবা পথ শিশু যে নামেই ডাকা হোক না কেন এই শহরের রাস্তায় তারা যাপন করছে এক দুর্বিষহ জীবন। জীবনের স্বাভাবিক চাহিদাগুলো তাদের বৃত্ত থেকে অনেক দূরে, ব্যাস আর ব্যাসার্ধের সীমনার বাইরে। এদের‘কেউ বলে পথশিশু, কেউ বলে টোকাই। তাদেরও নাম আছে, সে নাম ধরে ডাকার মতো কেউ নাই।’-এদের একটি অংশকে দেখা যায় রাজধানীর রমনা পার্কে। এ পথশিশুদের কারো গায়ে জামা নেই, কারো পরনের প্যান্টও ছিঁড়ে ফাড়া। সারাদিনের কর্মব্যস্ত অসহায় জীবন শেষে একটু বিশ্রামের জন্য এখানে জড়ো হয় সবাই। হাজারো ঝঞ্ঝার মাঝেও সবার মুখে হাসি থাকে। এরা যখন পার্কে একত্রিত হয়ে থাকে, তখন ওরা গান গায়। সম্প্রতি এমনি একদিনে রমনাপার্কে তাদের সাথে কথা হয়। তখনো একজন গান গাছ্চিল। গান শেষে ওদেরই এক শিশু কামাল জানায়, সময় পেলেই তারা এখানে এসে জড়ো হয়ে গান করে। আর এখন তারা যে গানটি করছে এটি তাদের খুবই পছন্দের গান। এরই ফাঁকে আরেক শিশু জাকির লাফিয়ে উঠে জানায়, তাদের নিয়ে একটি বাংলা সিনেমা হয়েছে। সেই সিনেমায় এ গানটি রাখা হয়েছিল। আর সে সিনেমায় অভিনয়ও করেছিল জাকির। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ানো শিশুদের একটি বড় অংশই ঠিকানাবিহীন। ফুটপাত আর রাজপথেই কাটে তাদের দিন, রাত। এদের পরিচয় কখনো টোকাই কখানো ছিন্নমূল। আবার কোনো কোনো সাহিত্যমনা আদর করে তাদের নাম দিয়েছেন পথশিশু। এমনই এক শিশু আকরাম। রয়স দশ। ২ বছর ধরে রাজধানীর এখানে ওখানে ময়লা আবর্জনা টোকায় সে। সেই ময়লা বিক্রি করেই চলে তার জীবন। বাবা মা বলতে কিছুই নেই তার। তাদের নামও জানেনা আকরাম। তবে সে জানায়, তাদের বাঁচাতে পারে শুধুই মহাজনরা। মহাজন চাইলেই তাদের পেটে ভাত জুটবে। সে রাগলেই খাওয়া বন্ধ। আর এভাবে ময়লা কুড়িয়েই বাকিটা জীবন পার করতে হবে তার। আকরাম জানায়, দিন-রাত অমানুষিক পরিশ্রম করে যা আয় হয় তাতেও ভাগ বসায় পুলিশ, নাইটগার্ড ও সন্ত্রাসীরা। তবে নিজের কাছে টাকা রাখে না কোনো শিশুই। সারাদিন যা আয় হয় তা জমা রাখা হয় মহাজনদের কাছে। আকরাম জানায়, মহাজনের কাছে টাকা রাখাও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। তিল তিল করে জমিয়ে রাখা এ টাকাও অনেক মহাজনরা আর ফেরত দেন না। নিজের জমা রাখা টাকা চাইতে গিয়ে উল্টো হজম করতে হয় মারধর। চরম নিরাপত্তাহীনতায় কাটে তাদের দিন। ঠিকানাবিহীন এসব শিশুদের রাত কাটে এখানে ওখানে। ঘুমাতে গেলেও তাদের পোহাতে হয় অনেক ঝক্কিঝামেলা। পথশিশু ইব্রাহিম জানায়, পুলিশ মাঝে মাঝেই লাঠিপেটা করে তাদের উৎখাত করে। কোনো কোনো সময় হঠাৎ পুলিশ এসে মারধর করে তাদের ধরে নিয়ে যায়। তবে কিছু টাকা-পয়সা দিলে পুলিশের কাছ থেকে ছাড়া পাওয়া যায়। আর টাকা দিতে না পারলে তাদের ঠিকানা হয় ভবঘুরে কেন্দ্রে। সে জানায়, অনেক সময় তাদের কোর্টে চালান দিয়ে দেয়া হয়। কোর্টে চালান দিলে ওদের অবস্থা হয় আরো করুণ। আগে কোর্টে চালান দিলে তিন মাসের জেল হত। আর এখন হয় সাত মাস। রাত ওদের জন্য বেশ ভয়ের। মেয়েশিশুরা আরো বেশি নিরাপত্তাহীন। শুধু তাই নয়, প্রতিবছর দেশ থেকে পথশিশুদের একটি বড় অংশই পাচার হয়ে যায়। কোনো পারিবারিক পরিচয় না থাকায় এদের আর হিসেবও পাওয়া যায় না। শিশুদের নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠনের সূত্র মতে, দেশে বর্তমানে পথশিশুর সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ। টিভিসি’র আরেক জরিপ অনুযায়ী, শুধু ঢাকা শহরেই রয়েছে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৮শ’রও বেশি শিশু। যেখানে সহজে কাজ পাওয়া যায় এমন জায়গায়ই এদের বেশি দেখা যায়। বাজার, রেলস্টেশন, বাসস্টপেজ, লঞ্চঘাট বা রমনা পার্ক, চন্দ্রিমা, ওসমানী, সৈাহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো খোলা পার্ক, স্টৈডিয়াম, মাজার এলাাকায় রাত কাটে তাদের। সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশুরা বেঁচে থাকে শুধু নিজেদের ওপর নির্ভর করে। দু’বেলা পেটপুরে খাবার, রাতে মাথা গোঁজার ঠাঁই, একটু চিকিৎসা সেবা কিছুই তাদের ভাগ্যে জোটে না। যেখানে রাত সেখানেই ঘুমিয়ে পড়তে হয়। রোদ, বৃষ্টি, শীত, মশা তাদের কাছে নিত্য মামুলি ব্যাপার। দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে বাঁচতে অনেক সময়ই এরা জড়িয়ে পড়ে নানা অনৈতিক কর্মকান্ডে। এদের ব্যবহার করে এক শ্রেণীর অপরাধীচক্র হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। কোনো কোনো েেত্র অস্ত্র ও মাদক বহনের কাজে ব্যবহৃত হয় পথশিশুরা। ছোটখাটো চুরি, ছিনতাই করতে গিয়ে এরা হয়ে উঠছে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী। এরপর তারা জড়িয়ে পড়ে চাঁদাবাজি, খুনের মত ভয়াবহ সব অপরাধে। পুলিশ, সন্ত্রাসীরাও তাদের প্রয়োজনে এসব শিশুদের ব্যবহার করে। এ ছাড়াও শিশুরা মাদক বিক্রির ফাঁদে পা দিয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। ফলে তারা অকালে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। মেয়েশিশুরা নিয়োজিত হয় পতিতাবৃত্তিতে। জীবিকার তাগিদে এরা ফুটপাতে ফুল, পপকর্ন, খেলনা বিক্রি করে। কিন্তু এসব বিক্রি করতে গিয়ে তারা যৌন নির্যাতনসহ নানা ধরনের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। ময়লা আবর্জনার মধ্যে বসবাস করতে করতে এসব শিশুরা বছরের প্রায় বারো মাসই চর্মরোগে ভোগে। দূষিত পানি পান ও খাবার গ্রহণ, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যকর স্যানিটেশনের অভাবে তারা নানা রোগে ভোগে। ব্যাহত হয় স্বাভাবিক বৃদ্ধিতেও।অপর একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার পথশিশু রয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক পথশিশুর বেশির ভাগকেই ঘুমাতে হয় ফুটপাতে। আর এ কারণেই পথশিশুদের অধিকাংশকেই শিকার হতে হয় শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতনের । অনিরাপদ পরিবেশে রাত্রিযাপনের ফলে এরা সমাজের নানা অসঙ্গতির সঙ্গে পরিচিত হয়। যা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত করে, নষ্ট করে দেয় তার সুন্দরের স্বপ্ন আর কোমল অনুভূতিগুলোকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত এবং সরকারের অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও পথশিশুদের রাত্রিকালীন আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়ায় পথশিশুরা প্রতিমুহূর্তে যে সকল পাশবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তা আমাদের উদ্বিগ্ন করে। তারা বলেন, আমাদের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের একটা বিরাট অংশকে অবহেলায় রেখে দেশের কোন উন্নয়ন প্রচেষ্টা অর্থপূর্ণ ও মানবিক হতে পারে না। সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস-এর হিসাব অনুযায়ী দেশে বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার পথশিশু রয়েছে। সামাজিক নানা অসঙ্গতির শিকার এসব শিশু বেড়ে উঠছে চরম হতাশা ও আশংকার মধ্য দিয়ে। অথচ সরকারের ইতিবাচক মনোভাব ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ পথশিশুদের এই হতাশা ও আশংকা কমিয়ে আনতে পারে। আর তা নিশ্চিত করতে পথশিশুদের প্রয়োজন রাত্রিকালীন নিরাপদ আশ্রয় সমস্যার সমাধান করা। শুধু রাত্রিকালীন আশ্রয় একজন শিশুর জীবনে হয়তো তেমন কোন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না; যদি না শিশুটির শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। তারপরও পথশিশুদের রাত্রিকালীন নিরাপদ আশ্রয়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ২০০৯-১০ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে পথশিশুদের রাত্রিকালীন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে প্রথমবারের মতো ৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছিলেন। বর্তমান সরকারের এ ঐতিহাসিক উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা কিছুটা হলেও সমাজের সবচাইতে অবহেলিত ও নিপীড়িত মানুষের দুর্দশা লাঘবে কার্যকর ভূমিকা রাখতো। তবে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বাজেট বরাদ্দের পরও পথশিশুদের জন্য রাত্রিকালীন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কাঙ্কিত কাজটি এখনো বাস্তবায়নের অপোয় রয়েছে। মনোবিজ্ঞানি ডা. মোহিত কামাল বলেন, উঠতি বয়সি এসব পথশিশুর মধ্যে ছেলে-মেয়ে উভয়েই নির্যাতনের শিকার হয়। এর মধ্যে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নিপীড়নে যে শিশুরা শিকার হয় তাদের মনোজগতে একটা ভীতির সৃষ্টি হয়ে যায়। এখান থেকে অনেকে সন্ত্রাসী হয়ে ওঠে। কেউ কেউ পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করে। এসব শিশু স্নেহ মায়া মমতা বঞ্চিত বলে এরা পরবর্তী জীবনে নিষ্ঠুর প্রকৃতির হয়ে থাকে। এরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। অনেকে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। এদের জীবনে আগ্রহ, চাহিদা, উৎসাহ, আকাক্সক্ষা বলে কিছু থাকে না। ইনসিডিন বাংলাদেশের পরিচালক বলেন, পথশিশুদের উন্নয়নের প্রধান শর্ত হচ্ছে রাত্রিকালীন নিরাপদ আশ্রয়। তাদের শারীরিক ও মানসিক সুরা, উপযুক্ত পরিবেশ, শিা ও উন্নয়নের অধিকার, ব্যক্তিগত সম্পদ সুরার অধিকার এবং সর্বোপরি বিকাশের অধিকার, সবকিছু নির্ভর করে পথশিশুর রাত্রিকালীন নিরাপদ আশ্রয়ের উপর। সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে বিশেষ করে প্রকল্প ভিত্তিক উদ্যোগে কেবল গুটিকয়েক পথশিশুর রাত্রিকালীন নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও মোট পথশিশুর অধিকাংশই রাত কাটায় নিরাপত্তাহীনতা ও চরম উৎকণ্ঠায়- যা আমাদের কারো কাম্য নয়।
†jLK: W.†dviKvb Avjx
M‡elK I mv‡eK Aa¨¶
36 MMbevey †ivo,Lyjbv
01711579267
Email- dr.fourkanali@gmail.com
0 comments:
Post a Comment