Wednesday, November 27, 2013

ছদ্মবেশী রূপবতী বুড়িগঙ্গা

ছদ্মবেশী রূপবতী বুড়িগঙ্গা
 ফোরকান আলী
“বুড়িগঙ্গা”- যে নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত হলো ঢাকা নগরী। একসময় এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্যের একমাত্র মাধ্যম ছিল এ নদীর বুকে ভেসে চলা মানুষ চালিত নৌকা। ফলে নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোর বাতাস প্রায়ই মুখরিত থাকত মাঝির গানের সুরের প্রাণোচ্ছ্বলতায়। কখনো কখনো নিশুতি রাতে। রাত জাগা কোন মাঝি বেদনার সুর ছড়িয়ে দিত নদীর জলভেজা বাতাসে। আজও হয়ত অনেকেই ছড়ায় কিন্তু তা যান্ত্রিক আওয়াজে চাপা পড়ে যায়। কেননা কলের নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার এখন পুরো নদীকে দখল করে নিয়েছে। একসময় এ নদী বর্ষায় ফুলে ফেঁপে চারদিকের সবকিছু গ্রাস করার জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠত। আজও সেই নিয়মেই চলে কিন্তু মানুষের গ্রাসে সে এত বেশি সংকীর্ণ হয়ে গেল যে নিজের সর্বগ্রাসী রূপ দেখানোর মতা তার আর অবশিষ্ট রইল না। কালের সাী এ নদী মানুষের কাছ থেকে অনেক সময় অনেক কিছু ছিনিয়ে নিয়েছে আবার দিয়েছেও অঢেল। এর কাছ থেকে বিশুদ্ধ বাতাস, মনের শান্তি পাওয়ার লোভেই মানুষ একসময় এর তীরবর্তী অঞ্চলে প্রাসাদ গড়েছে। এখনো অবসরে বুক ভরে তাজা নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য, মনের এবং দেহের কান্তি দূর করার জন্য মানুষ ছুটে যায় এর কাছেই। অবিরাম বয়ে চলা, মানুষের সুখ-দুঃখের স্মৃতি বহন করা এ নদীর উৎপত্তি সম্পর্কে হিন্দু পুরাণে কথিত আছে- মহামুনি জমদাগ্নির আদেশে পরশুরাম তার মা রেণুকাকে হত্যা করেছিল। যে কুঠার দিয়ে সে এ মহাপাপ করেছিল সে কুঠার তার হাতে আটকে গিয়েছিল এবং শত চেষ্টাতেও তা ছাড়ানো সম্ভব হয়নি। যখন সে বুঝতে পারল যে তার মহাপাপের কারণেই এমনটি ঘটল তখন সে এর প্রায়শ্চিত্তের মানসে দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গলে ধ্যান-তপস্যায় দিন কাটাতে লাগল। ঘটনাক্রমে একদিন সে ব্রহ্মপুত্রের মাহাত্মের কথা শুনতে পেল এবং আশায় বুক বেঁধে তার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল। এ সন্ধান চলল বহু বছর। কারণ ব্রহ্মপুত্র তখন একটি হ্রদরূপে হিমালয় পর্বতে আত্মগোপন করেছিল। হিমালয়ের দুর্গম পথে চলতে চলতেই একদিন পরশুরাম এ প্রসারিত হ্রদটি দেখতে পায়। তখন সে পরম বিশ্বাসে এ হ্রদকে দেবতার মর্যাদা দিয়ে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত কামনা করে হ্রদে ঝাঁপ দেয় এবং সাথে সাথেই কুঠারটি তার হাত থেকে ছুটে যায়। তার পাপ হরণকারী এ হ্রদের পানিকে সে অতীব পবিত্র জ্ঞান করে তা মর্তের মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল। এ উদ্দেশ্যে সে তার কুঠার লাঙ্গলাবন্ধ করে পর্বতের মধ্যদিয়ে চালিয়ে দিল। অনেকদিন পর তা সমভূমিতে এসে বর্তমান লাঙ্গলবন্ধে আটকে গেল। পরশুরাম তার সফলতা আঁচ করতে পেরে এ নদীর মাহাত্ম্য প্রচারে ও তীর্থ যাত্রায় বের হয়ে গেল। এদিকে ব্রহ্মপুত্র যেখানে গিয়ে থামল তার কাছ দিয়েই যাচ্ছিল অনিন্দ্য সুন্দরী শীতল্যা। শীতল্যাকে কাছ থেকে দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে ব্রহ্মপুত্র তার দিকে ধাবিত হলো। শীতল্যা তা টের পেয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হলো এবং নিজের রূপ সৌন্দর্য লুকিয়ে ফেলে ঘোমটার আড়ালে এক বুড়ির ছদ্মবেশ ধারণ করল। ব্রহ্মপুত্র আশাহত হয়ে ক্রুব্ধভাবে তাকে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় সেই যৌবন গর্বিতা, সুন্দরী শীতল্যা। ঘোমটার আড়াল থেকে সে উত্তর করল, “আমিই সেই ল্যা।” ব্রহ্মপুত্র দ্রুত হাতে তার ঘোমটা খুলে ফেলে দেখতে পেল চঞ্চলা-চপলা, সুন্দরী শীতল্যাকে এবং যারপরনাই মুগ্ধ হলো। এটাই তাদের মিলনস্থল। ব্রহ্মপুত্র আর শীতল্যার পানি এক স্রোতে মিশে গেল। তারই একটি স্রোত আজকের এই বুড়িগঙ্গা। বুড়িগঙ্গা যেমন অতীতের হাজারো স্মৃতি নিজের বুকে জমা করে রেখেছে বর্তমানেও প্রতিদিনের প্রতিমুহূর্তের ঘটনার সাী হয়ে থাকছে। বলাবাহুল্য, যতদিন তার অবিশ্রাম গতি চলতে থাকবে ততদিন তার এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটবে না। হয়ত এ কারণেই বিশেষ-বিশেষ সময়ে তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীরা তাদের আনন্দ বিনোদনের জন্য, নিরেট উচ্ছল সময় ভোগ করার জন্য দল বেঁধে পাড়ি জমায় এ নদীর বুকে। এমনও দেখা যায় অনেক যুগল শহরের বা জনারণ্যের কোলাহলকে পাশ কাটিয়ে তাদের মনের ভাব প্রকাশের মত মধুর সময় যাপনের জন্য আশ্রয় নেয় এ নদীর ভাসমান বিশালত্বে। স্বাস্থ্য সচেতন বা একাকী জীবনে অভ্যস্ত ভাবুক ব্যক্তিও প্রায় সময়ই এর সংস্পর্শ পেতে এর কাছে ছুটে যান। অবসর বিনোদন তো বটেই, একাকীত্বের ভার লাঘবের জন্যও এ নদীর সঙ্গ অতুলনীয়। ব্যবসায়িক মানসিকতার মানুষের কাছে এ তথ্য জানতে খুব বেশি সময় লাগে না। আর তাই তারা নদীর কূল ছাড়া নদীর বুকেও ব্যবসা করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়। এরই একটি নমুনা বুড়িগঙ্গার ভাসমান হোটেলগুলো। এ হোটেলগুলোর কোনটি হিন্দু হোটেল আবার কোনটি মুসলিম হোটেল। অবশ্য এ হোটেলগুলোর প্রধান খরিদদার যদিও অবসর বিনোদনকারী নয় তবে এদের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। হবেই বা না কেন, যে একবার কূলের কোলাহল ছাড়িয়ে মাঝ নদীতে কিছু সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছে কেবল সেই বুঝতে পারে এর কাছে কি অকৃত্রিম সুখ। এ সময় ভেঁপুর আওয়াজে তার চিন্তায়, তার শান্তিতে সাময়িক ছেদ পড়লেও তা খুব একটা বেশি সময়ের জন্য বিরক্তির কারণ হয়ে থাকতে পারে না। অনেকে অবশ্য দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে নদীর বুক ছেড়ে তার ওপর দিয়ে চলে যাওয়া সেতুর আশ্রয় নেয়- একটু সুখ, একটু শান্তির আশায়। তবে এর মূল ল্যও কিন্তু বুড়িগঙ্গার সঙ্গলাভ। এ কারণেই বর্তমানে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা তার অধিবাসীদের জন্য যতই অবসর বিনোদনের ব্যবস্থা করুক না কেন ঢাকাবাসী আজও সময় সুযোগ বুঝে বুড়িগঙ্গার কাছে বারবার ছুটে যায়। হয়ত তাই বুড়িগঙ্গাও অলিখিত চুক্তিমোতাবেক তার সরণাপন্ন মানুষগুলোকে দিয়ে যায় অকৃত্রিম সুখ-শান্তি, দূর করে দেয় গ্লানি-কান্তি।


†jLK: W.†dviKvb Avjx
M‡elK I mv‡eK Aa¨¶
36 MMbevey †ivo,Lyjbv
01711579267



0 comments:

Post a Comment