ড.ফোরকান আলী
আমি যখন বাংলাদেশের ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি চিন্তা করি তখন শঙ্কিত হয়ে পড়ি। খুব সহজ অর্থনীতি বলে, জমির পূর্ণ ব্যবহার হয়ে গেলে এবং জমি যদি সরবরাহের দিক দিয়ে কমতে থাকে এবং খাদ্যের চাহিদা বাড়তে থাকে, তাহলে এমন অবস্থায় জনগণকে চাহিদামতো খাদ্য সরবরাহ দেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। অবস্থাটা এখনো আমাদের দ্বারে পূর্ণাঙ্গ কড়া নাড়ছে না, তবে অদূর ভবিষ্যতে শুধু কড়াই নাড়বে না, কশাঘাত করে আমাদের দরজাগুলো ভেঙে দেবে। সেদিন আমরা হয়তো দুনিয়াতে বেঁচে থাকব না, কিন্তু কল্পনার চোখে দেখছি, শুধু খাদ্যের অভাবেই এই সমাজ ভেঙে পড়বে। আমাদের কৃষিজমি এক শতাংশ করে কমছে। এই কমাটা হবে দুই শতাংশ আরো কয়েক বছর পর।
আজকে যদি প্রতিবছর আমাদের কয়েক হাজার একর কৃষিভূমি কৃষিকাজ থেকে অন্য ব্যবহারে চলে যায় শুধু লোকসংখ্যা বৃদ্ধির দরুন, সেই কয়েক হাজার আরো কয়েক গুণ বেড়ে কৃষিকাজ থেকে হারিয়ে যেতে পারে। বিগত তিন দশকে উচ্চফলনশীল বীজ-চারা আমাদের কৃষিতে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে আমরা খাদ্য উৎপাদন এক কোটি মেট্রিক টন থেকে তিন কোটি মেট্রিক টনে উন্নীত করতে সম হয়েছি। কিন্তু সামনে ওই সম্ভাবনা ব্যবহার করে এগোনোর দিন শেষ হয়ে গেছে। শুধু বাংলাদেশই নয়, এশিয়ার অন্যসব দেশও উচ্চফলনশীল বীজ-চারা এবং সেইসঙ্গে সেচ ও সার ব্যবহার করে সবুজ বিপ্লব তথা উৎপাদনে এক ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছে। কিন্তু সেই প্রযুক্তিগত বিপ্লবের ইতি ঘটেছে এখন থেকে দুই যুগ আগে। এখন আর কেউ নতুন ওজজও’র কথা শুনছে না, যেখানে ধান-গম-ভুট্টা এসবের একরপ্রতি ফলন দ্বিগুণ করার কলাকৌশল নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। বাংলাদেশ তার বর্ধিত জনসংখ্যাকে এত দিন প্রান্তিকভাবে হলেও খাইয়ে আসছিল সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত বর্ধিত ধান উৎপাদনের মাধ্যমে। সবুজ বিপ্লবের ফল একতরফা ছিল না, বেশি করে ধান উৎপাদন করতে গিয়ে আমরা অন্য ফসলের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছি।
আমরা যে এখন আগের তুলনায় অর্ধেক পাট উৎপাদন করছি, সেটারও মুখ্য কারণ হলো, ধান উৎপাদন করতে গিয়ে বেশি থেকে বেশি জমিকে আমরা পাট থেকে ধানের দিকে নিয়ে এসেছি। একই অবস্থা হয় ইুসহ অন্য ফসলের েেত্রও। এখন চাইলেও আমরা পাটের জন্য বেশি জমি দিতে পারব না। কারণ উচ্চ ফলনশীল ধান চাষ করতে গিয়ে আমরা যেসব রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেছি তাতে জমি অন্য ফসল করার জন্য অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। এখন তো বিশ্ববাজারে পাটের মূল্য বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা শুধু বেশি ধান উৎপাদন করতে গিয়ে পাটের জমিকে খুইয়ে বসেছি। আমরা বেশি বেশি ধান উৎপাদন করতে গিয়ে মাছ সম্পদও হারিয়েছি।
এত দিন যে মাছ বড় হতো আমাদের খালে-বিলে-জমিতে, আজকে সেই মাছ সার ও কীটনাশকের বিষাক্ত বিষক্রিয়া সহ্য করতে না পেরে অনেক আগেই ওদের বিচরণ ত্রেগুলো থেকে হারিয়ে গেছে। কত শ কোটি টাকার মৎস্য সম্পদ হারিয়েছিÑ সেই গবেষণা কেউ কোনোদিন করেনি। আজকে যেদিকেই তাকান, বড় পুকুর-দীঘি আর দেখবেন না, সবই ভরাট হয়ে গেছে ধান উৎপাদন ও বাড়িঘর বানানোর কাজে। আজকে বড় বড় পাথার বা শত শত একরের শূন্য মাঠ দেখা যায় না, কারণ চারদিকে রাস্তা-বাড়ি তৈরি হতে হতে এগুলোর আয়তন ছোট হয়ে গেছে। সবুজ বিপ্লব আমাদের একটা পর্যায় পর্যন্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করেছে বটে, তবে সামনের দিনগুলোতে আমাদের উৎপাদিত খাদ্য আমাদের খাওয়াতে পারবে বলে বিশ্বাস হয় না। এটা বিশ্বাসের ব্যাপার নয়, এটা হলো হিসাবের ব্যাপার; যে হিসাব আমরা সবাই একটু চিন্তা করে অনায়াসে করে নিতে পারি। আমাদের লোকসংখ্যা ছিল স্বাধীনতা লগ্নে ৭০ মিলিয়ন, আজকে ১৫০ মিলিয়ন। ভাবুন, ৯.৫ শতাংশ করেও যদি লোকসংখ্যা বাড়ে তাহলে আগামী ২০ বছরে যে বর্ধিত লোকসংখ্যা বর্তমানের ১৫০ মিলিয়নের সঙ্গে যোগ হবে, সেই সংখ্যাকে এই জমি ধারণ করতে পারবে কি না।
ম্যালথাস ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর নৈতিক দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের শিক। তিনি তখনই বলে গেছেন, লোকসংখ্যা বৃদ্ধি যদি খাদ্যবৃদ্ধির আগে যেতে থাকে তাহলে ওই সমাজের ধ্বংস অনিবার্য শুধু দুর্ভি থেকে। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন অনেক আগে খাদ্য সংকট নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখিয়েছিলেন, খাদ্যের সংকট ছিল না, সংকট ছিল ক্রয়মতার এবং জায়গামতো পৌঁছানোর। তিনি এও বলেছিলেন, আপৎকালে বড় আড়তদাররা বড় মজুদ তৈরি করে খাদ্য সংকট আরো প্রকট করে তুলেছিল। এটা ঠিক, বিগত তিন দশকে বিশ্বে বড় রকমের দুর্ভি হয়নি। তবে সামনের দিনগুলো ওই রকম যাবেÑ এটা কেউ মনে করছেন না। খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ নিয়ে সর্বত্রই একটা আশঙ্কা বিরাজ করছে। ২০০৭ ও ২০০৮-এ বিশ্বে উৎপাদনের দিক দিয়ে খাদ্য উৎপাদনের কমতি ছিল না। কিন্তু সেই দুই বছর খাদ্যের মূল্য দ্বিগুণ বাড়ল কেন? সেখানেও আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট কাজ করেছিল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে খাদ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেওয়ার েেত্র।
সামনে সেই একই সিন্ডিকেটগুলো আবার সক্রিয় হবে এবং সক্রিয় হবে যখন বাংলাদেশের মতো দেশ খাদ্যঘাটতির মুখে পড়বে। তাহলে আমাদের অবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কী? সমাধান একটাই, সেটা হলো আমাদের জনসংখ্যা কমিয়ে রাখা। জনসংখ্যাকে বর্তমানের হারে বাড়তে দিলে কোনো জাদুমন্ত্রই কাজ দেবে না আমাদেরকে খাদ্য নিরাপত্তার চাদর দিয়ে সব সময়ের জন্য ঢেকে রাখতে।
দুই-চার বছরে আমাদের খাদ্য সংকট নাও হতে পারে। তবে আমি ভাবি, দশ বছর পরের কথা কিংবা তারও পরের কথা। আমাদের সংকট দেখলে পশ্চিমের অনেক বীজ কম্পানি এগিয়ে আসবে তাদের থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ঐুৃ কেনার জন্য। আর অভাবে পড়ে আমরা যদি সেই দিকে যাই তাহলে অবস্থা হবে ভয়াবহ। এই জাতি আপাতত বাঁচবে, দীর্ঘমেয়াদে মরবে।
†jLK: W.†dviKvb Avjx
M‡elK I mv‡eK Aa¨¶
36 MMbevey †ivo,Lyjbv
01711579267
Email- dr.fourkanali@gmail.com
0 comments:
Post a Comment