তাঁত শিল্পের বিপন্ন দশা
ড. ফোরকান আলী
এ দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। দেশের অন্যান্য শিল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যায়ক্রমে এই শিল্পটির দিকে নজর দিলে এবং পরিকল্পনা মাফিক অর্থায়নের ব্যবস্থা করলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে কোন সরকারই এদিকে তেমন একটা নজর দেয়নি।
ফলে তাঁত শিল্পের দীনতা অদ্যাবধি কাটেনি। তবুও চরম দুরাবস্থার মধ্যদিয়েও তাঁতীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং নিরলস শ্রমের কারণে শিল্পটি এখানো পুরনো ঐতিহ্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড এবং আমদানী উৎপাদক ও রফতানীকারক সমিতি সূত্রে জানা যায়, প্রতিযোগিতামূলক বর্তমান বিশ্ব বাজারের ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে এবং অনাকাংখিত দীনতার বোঝা মাথায় নিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের ২ লাখ ১২ হাজার ৪শ ১২টি তাঁতী পরিবারের ১৫ লাখ শ্রমিক এই শিল্পে নিয়োজিত আছে। মোট তাঁতের সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ ১ হাজার ৮শ ৩৪টি। উৎপাদনের রকমফের ও কারুকাজের ওপর নির্ভর করে এই তাঁত গুলো পীট লুম, ফ্রেমলুম, জাপানিলুম, চিত্তরঞ্জনলুম, বেনারসীলুম, জামদানীলুম, এই ৬ ভাগে বিভক্ত।
অধিকাংশ তাঁতেই পারিবারিক উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত। নারী, পুরুষ, কিশোর, কিশোরীসহ বিভিন্ন শ্রেণীর লোক শ্রমিক হিসেবে এখানে কাজ করে থাকে। সরকারী উদ্যোগে এবং অর্থায়নের অভাবে এটি এখনও সুসংঘবদ্ধ শিল্পখাতে রূপান্তরিত হতে পারেনি। ফলে বংশানুক্রমিক ধারায় এলাকাভিত্তিক এই শিল্পের প্রসার সীমিত পর্যায়ে রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ তাঁতবোর্ড কর্তৃক সমাপ্ত সর্বশেষ জরিপে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে ১৬০ কোটি মিটার তাঁত বস্ত্র (শাড়ী) এর অভ্যন্তরীণ চাহিদা রয়েছে। অথচ তৈরি হচ্ছে ১৩৩ কোটি মিটার। ২৭ কোটি মিটার এর ঘাটতি বরাবর থেকে যাচ্ছে। এই ঘাটতির সুযোগ নিয়েই এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী চোরাপথে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে শাড়ী এনে বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছে বলে তাঁতী শিল্পীদের বরাত দিয়ে জানা গেছে।
অপরদিকে তাঁতে তৈরি চেক কাপড়ের অভ্যন্তরীণ চাহিদা রয়েছে ১২ কোটি মিটার। কিন্তু আমাদের দেশের তাঁতীরা তৈরি করতে পারছে মাত্র ২ কোটি মিটার এর সামান্য বেশি। এক্ষেত্রে প্রায় ১০ কোটি মিটারের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
এছাড়াও রফতানি যোগ্য পোশাক শিল্পে ব্যবহারের জন্য আরো ২২০ কোটি মিটার চেক কাপড়ের চাহিদা রয়েছে। এই ব্যাপক পরিমাণ চাহিদা মেটানোর জন্য বাধ্য হয়ে সরকারকে বিদেশ থেকে কাপড় আমদানী করতে হচ্ছে। এর ফলে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার কষ্টার্জিত বেদেশিক মুদ্রা বিদেশী শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যাচ্ছে।
তুলা উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বস্ত্র শিল্পের সম্পূর্ণ চাহিদা মেটাতে গেলে বছরে ৭ লাখ ৫০ হাজার বেল সুতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে দেশে তৈরি করতে গিয়ে উৎপাদনের খরচ অনেক বেশি হয় বলে তুলা উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অপরদিকে বাংলাদেশে উৎপাদিত তুলা এবং সুতার গুনগতমান বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে কোন অংশে কম নয় বলে তারা মন্তব্য করেছেন। পরিকল্পিত উপায়ে ব্যাপক তুলা চাষের ব্যবস্থা করলে দেশের চাহিদা মেটানো অসম্ভব কিছু নয় বলে তাদের ধারণা।
অপরদিকে এদেশের তাঁত বস্ত্র এবং তাঁতীদের গৌরব ও সুনাম সেই সুদূর মোগল আমল থেকেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে রয়েছে। এদেশের তাঁতীদের তৈরি মসলিন কাপড় এক সময় ভারতবর্ষ, বৃটেন, পারস্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাজা-বাদশা এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিদের মহা মূল্যবান পোশাক পরিচ্ছদে ব্যবহৃত হত। পশ্চিমবঙ্গের ভিক্টরিয়া মেমোরিয়াল মিউজিয়ামে রক্ষিত মহারানী ভিক্টরিয়ার ব্যবহৃত মসলিন কাপড়ের ওপর কারুকার্য খচিত পোশাক কালের সাক্ষীরুপে এখনও বিদ্যমান। ইউরোপীয় শিল্প বিল্পবের ধারাকে ত্বরান্বিত করার প্রয়াসে বৃটিশ বেনিয়ারা এ দেশের তাঁতীদের ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল কেটে দিয়ে মসলিন তৈরির পথকে চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করলেও অদম্য সাহসী এবং আত্মনিবেদিত তাঁত শিল্পীদেরকে তারা নিরুৎসাহিত করতে পারেনি। বংশানুক্রমিক ধারায় সেই গৌরব এবং ঐতিহ্যকে তারা এখনও ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। কৃত্রিম তস্তর সমন্বয়ে তৈরী চোখ ঝলসানো বাহারী বস্ত্র সম্ভার এদেশের তাঁত বস্ত্রের গুনগতমান এবং শিল্পকর্মকে এতটুকুও ম্লান করতে পারেনি। যার কারণে এদেশের তাঁতীদের তৈরী জামদানী, বেনারসী, গরদ, টাঙ্গাইল শাড়ী, খদ্দর, লুঙ্গী, গামছা, গেঞ্জি, টুপি, সালোয়ার কামিজ, হ্যান্ডলুম এর বিশ্বব্যাপী কদর এবং সুনাম রয়েছে। চাহিদাও ব্যাপক। গেল বছর স্বল্প পরিসরে জামদানী রপ্তানী করে ৬৮ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে এদেশের উৎপাদক ও রফতানীকারকরা। গ্রামীণ চেকের সীমাহীন চাহিদা মেটাতে গিয়ে গ্রামীণ ব্যাংক বিশেষ প্রকল্প চালু করলেও কুলকিনারা পাচ্ছে না। বাংলাদেশ গরীব। অর্তনীতি দোদুল্যমান। বেকারের সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। কাজেই অন্যান্য শিল্পখাতের মত তাঁত শিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নে সরকার যদি উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং সুষ্ট পরিকল্পনা নেন তাহলে বেকার সমস্যার সমাধান হতে পারে। তদুপরি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানী করে এ খাত থেকে বছরে ১ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা তেমন একটা কষ্টসাধ্য নয় বলে বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত। এ জন্য প্রয়োজন শুধু পরিকল্পিত তুলা উৎপাদন, তাঁতীদেরকে সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ঢালাও ব্যবস্থা গুণগত মান উন্নয়নে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ব্যাপক ভিত্তিক বিশ্ববাজার সৃষ্টির প্রয়াস চালান। সুষ্ট নীতিমালার আলোকে রফতানির ক্ষেত্রে বিরাজমান সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং পোশাক শিল্পের মত রফতানির ক্ষেত্রে ভর্তুকি ব্যবস্থা চালু রাখা। একটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রেখে সরকার যদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে তাহলে অচিরেই তাঁত শিল্প বিশ্বের মধ্যে একটি উন্নত শিল্পখাতে পরিণত হবে। সরকারের মনে রাখতে হবে তাঁত বাংলাদেশের সনাতন ও ঐতিহ্যবাহী শিল্প। এ শিল্পের সংগে এদেশের মাটি ও মানুষের রক্তের সম্পর্ক আদিকাল থেকেই জড়িয়ে আছে। তাই নানারকম চড়াই-উৎরাই পার হয়ে যান্ত্রিক সভ্যতার ঘাত-প্রতিঘাত উপেক্ষা করে এদেশের তাঁতী সমাজ বংশ পরস্পরায় এর গুনগতমান এবং ঐতিহ্য রক্ষার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। জীবন-জীবিকার নির্ভরশীল পেশা হিসেবে আকড়ে ধরে রেখেছে। যার ফলে পাট, যান্ত্রিক বস্ত্র, চামড়া ও চায়ের মত কৃষি ভিত্তিক অন্যান্য শিল্পের পাশাপাশি হস্তচালিত তাঁত শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তাই এ শিল্পের উন্নতি সাধন অপরিহার্য।
†jLK: W.†dviKvb Avjx
M‡elK I mv‡eK Aa¨¶
36 MMbevey †ivo,Lyjbv
01711579267
Email- dr.fourkanali@gmail.com
0 comments:
Post a Comment