Saturday, May 12, 2018

স্মরণ : শিক্ষাবিদ ছগীর মোহাম্মদ

স্মরণ : শিক্ষাবিদ ছগীর মোহাম্মদ
আলী ফোরকান
জন্ম : ২২ মে ১৯৫৭ সালে 
 মৃত্যু : ১০ মার্চ ২০১৮ 
ছগীর মোহাম্মদ বহুমাত্রিক প্রতিভার বাতিঘর। শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা, সাহিত্য, সংস্কৃতি–সমাজসংগঠক। জীবনব্যাপী অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানমনস্ক মানুষটি শিক্ষা আন্দোলনের পাশাপাশি সকল প্রগতিশীল আন্দোলন–সংগ্রামে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। সাদামাটা, নিরঅহংকার আত্মপ্রত্যয়ী । গত ১০ মার্চ ২০১৮ তিনি পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে।
পটিয়া উপজেলার নাইখাইন গ্রামের এক নি¤œবিত্ত পরিবারের পিতা ছিদ্দিক আহাম্মদ ও মাতা মোমেনা খাতুনের ঘরে ২২ মে ১৯৫৭ সালে তার জন্ম। শৈশব থেকেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যে তার বেড়ে ওঠা ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আহবানে ছাত্রাবস্থাতেই মুক্তিযোদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। বিএ শ্রেণিতে অধ্যয়ন কালে সংসারের হাল ধরতে হয় তাকে। ১৯৭৫ সালে গৈড়লা কেপি উচ্চ বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী কাম শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু। ১৯৭৮ সালে ইউনিয়ন কৃষি উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক ও ১৯৮৫ সালে এয়াকুবদ–ী উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এ.এস. রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন ১৯৮৬ সালের ১৬ জুন। একই স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন ২০১৪ সালে ২২ নভেম্বর।
২০১৭ সালের ২১ মে তিনি স্কুল থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি অল্প কিছুদিন চন্দনাইশ বীর মুক্তিযোদ্ধা মনছফ আলী– জাহানারা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) দায়িত্ব পালন করেন।
সাহিত্য–সংস্কৃতি : পটিয়ার বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকা–ের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। সম্মিলিত বর্ষবরণ উদ্যাপনে তাঁর ভূমিকা প্রশংসনীয়। বর্ষবরণ কমিটিতে তিনি বাংলা ১৪১৯ সালে সদস্য সচিব এবং ১৪১৭ সালে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। সাহিত্য–সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি তিনি বহু যাত্রা ও মঞ্চ নাটকেও অভিনয় করেছেন। তিনি পটিয়া ক্লাবের আজীবন সদস্য।
সাংবাদিকতা : দৈনিক মুক্তকণ্ঠ, সাপ্তাহিক চট্টলা, আজকের চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন পত্রিকায় পটিয়া প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পটিয়া প্রেসক্লাবের কার্যকরী কমিটির সহ–সভাপতি ছিলেন।
শিক্ষা ও শিক্ষক আন্দোলন : শিক্ষার মানোন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষকদের পেশা ও মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে তাঁর অনবদ্য ভূমিকা ছিল। বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বাশিস) চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ খলিলুর রহমান মহিলা ডিগ্রী কলেজ গভর্নিং বডির সদস্য ছিলেন।
দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন : টিআইবির অনুপ্রেরণার গঠিত সচেতন নাগরিক কমিটি পটিয়ার প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি পটিয়া শাখার সদস্য ছিলেন।
আজ তিনি নেই, রয়ে গেছে তাকে ঘিরে অংসখ্য স্মৃতি। সহজ– - সরল আত্মভোলা, সাদা মনের মানুষটিকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।

Friday, May 11, 2018

স্মরণ : কবি মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ

 স্মরণ : কবি মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ
আলী ফোরকান
জন্ম  :  ১৮৯৮-এর ২রা র্মাচ
মৃত্যু : ২ নভেম্বর, ১৯৭৪
বাংলা সাহিত্যে সৃজনশীল গদ্যকার হিসেবে মোহাম্মদ বরকতুল্লার পরিচিতি একক এবং অনন্য সাধারণ। কারণ তিনি এমন সব বিষয়কে প্রবন্ধের বিষয় করেছেন যা তার আগে অথবা পরেও তেমনভাবে লিখিত বা আলোচিত হয়নি। দার্শনিক ধ্যান-ধারণা, জড়বাদ, চৈতন্য, বস্তুরূপ ও জীবন প্রবাহ ইত্যাদি অত্যন্ত দুরূহ তত্ত্ব সম্বন্ধে প্রবন্ধ লিখে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। লিখেছেন সুফি দর্শন, সুফি মত ও বেদান্ত দর্শন যা বরকতুল্লার অবিস্মরণীয় অবদান। 
আজকের নিবন্ধে আলোচ্য বিষয় মোহাম্মদ বরকতুল্লার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘অনন্ত তৃষা’। এ প্রবন্ধে তিনি যুক্তিতর্কের মাধ্যমে দেখিয়েছেন বস্তু জগতের সাধারণ ধর্ম মূলত কোনটি এবং কেনইবা বস্তু জগৎ তার সহজাত ধর্মকে আঁকড়ে রাখতে চায়। এর জবাবে বরকতুল্লাহ লিখেছেনÑ ‘বস্তুজগতের সাধারণ ধর্ম আত্মপ্রতিষ্ঠা। সামান্য লোষ্ট্র খ- যে স্থানে বসিয়া আছে, সেখানে তুমি বসিতে পারিবে না। যতই কেন ক্ষুদ্র হোক না, সে যেখানে আপন অধিকার সাব্যস্ত করিয়া লইয়াছে সেখান হইতে সে সহজে নড়িবে না। তাহাকে সরাইতে চেষ্টা কর সে প্রতিরোধ করিবে। তুমি তাকে পদাঘাত কর, সেও প্রতিঘাত করিবে, তোমার পায়ে বেদনা দিবে। ... তাকে খ-ে খ-ে বিভক্ত করিতে চেষ্টা কর, সে তোমার শক্তিকে সাধ্যমতো ব্যাহত করিবে। তাহার অনুকণাগুলি একে অন্যকে আঁকড়াইয়া থাকিবে; যেন তারা সব পরস্পর ভাই। প্রবলতর শক্তি যখন তাহার অঙ্গে ক্রমাগত আঘাত করিতে থাকে তখন তাহার আহত শরীরে বেদনার চিহ্ন ফুটিয়া উঠে। এরা এক একটি শক্তি কেন্দ্র। 
... কোনও এক অলক্ষ্য শক্তি যেন তাহাদের ভিতরে থাকিয়া তোমার বিরুদ্ধে তাহাদের মরণ পণ বিদ্রোহ জাগায়।... বাঁচিয়া থাকিবার জন্য বস্তুর ভিতর এই যে অজ্ঞাত প্রয়াস, একি শুধু তার অনুতে বিচ্ছুরিত কোনও যৌগিক শক্তির প্রভাব মাত্র, না পদার্থের ভিতর এক অবচেতন অবলুপ্ত আত্মার গোপন অবস্থিতির সক্রিয় প্রকাশ? চুম্বকের ভিতর কিসের অনুভূতি জাগে লৌহের সান্নিধ্যে, সে সচেতন প্রাণীর মতো লৌহকে চাপিয়া ধরে। দিগদর্শন যন্ত্রের কাঁটা কোনও দূরাগত আকর্ষণ অনুভব করে? সে পতিব্রতা নারীর মতো সদা সুমেরুর দিকে মুখ করিয়া থাকে; চেষ্টা করিলেও তার মুখ অন্যদিকে ফিরান যায় না। সাগর-বাড়ি কোন অনুভূতির ফলে দূর আকাশে পূর্ণ চন্দ্রের আগমনী বুঝিতে পারে?... আকাশের সূর্যে কি ইচ্ছাশক্তি নিহিত আছে যাহা দুরন্ত বালকের ন্যায় ঐ বিশাল গ্রহগুলিকে বাঁধিয়া নির্ধারিত চক্র-পথে অবিরাম ঘুরাইতেছে?’
জড়সূত্র বিশ্লেষণের পর লেখক আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন উদ্ভিদ জগতের আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। আমরা জানি স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু প্রমাণ করেছেন গাছের প্রাণ আছে আর মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ প্রমাণ করতে চেয়েছেন প্রাণময় সেই বৃক্ষরাজির কি বিচিত্র প্রচেষ্টা উৎসব প্রতিনিয়ত চলছে তাদের টিকে থাকা বা আত্মপ্রতিষ্ঠায়। তিনি লিখেছেনÑ ‘সামান্য লতাটিও প্রকৃতির সহিত অহর্নিশ বুঝিয়া আপনার অধিকার দৃঢ় করিতেছে। শিকড়ের সূক্ষ্ম অঙ্গুলি দিয়া সে মৃত্তিকার বুক চিরিয়া রস পান করে; পাতার বেষ্টনী গড়িয়া আলো ও বাতাস হইতে চৌথ সংগ্রহ করে। .... যেদিকে কিছু লম্বমান থাকে সেই দিকে তার কোমল তন্ত্রীগুলি ডানা মেলিয়া তিলে তিলে অগ্রসর হয় ও পরিশেষে উহাকে জড়াইয়া ধরে। কিসে ঐ আশ্রয়হীন লতার অন্ধ তন্ত্রগুলির ভিতর উহার অজানা লক্ষ্যের দিকে অনুভূতি জাগায়? কোন্্ প্রচ্ছন্ন বুদ্ধির প্রবাহ সেগুলিকে অলক্ষ্যে চালিত করিয়া কোনও আসন্ন তরু-শাখায় বা শুষ্ক দ-ে সুকৌশলে ঘিরিয়া ঘিরিয়া জড়াইয়া দেয়? আত্মপ্রতিষ্ঠার কি বিচিত্র উৎসব ঐ লতার জীবনে পরিস্ফুট। তৃণের নবজাত অঙ্কুরের অভ্যন্তরীণ কোন্ অনুভূতি উহাকে অন্ধকার মাটির গহ্বর হইতে আলোকের জগতে পথ দেখাইয়া আনে? উহার কচি দেহ কোন্্ শক্তির বলে নিজের অপেক্ষা সহ¯্র গুণ ভারী মাটির বোঝা ঠেলিয়া অবলীলাক্রমে বাহির হইয়া আসে?’
আত্মপ্রতিষ্ঠার এমন কঠিন সংগ্রামের লীলাক্রমে লেখক বরকতুল্লাহ কত চমৎকার উপমায় ফুটিয়ে তুলেছেন, যা সাধারণ পাঠকেরও হৃদয়ঙ্গম করতে অসুবিধা হয় না। এখানেই কীর্তিমান লেখকের কৃতিত্ব। বরকতুল্লাহ গভীর উপলব্ধিতে প্রত্যক্ষ করেছেন, ‘জীব জগতের এই আত্মপ্রতিষ্ঠার ধর্ম অধিকার বিস্তৃত দেখিতে পাওয়া যায়। (চৎবংবৎাধঃরড়হ ড়ভ ঃযব ংবষভ বীঃবহফবফ ঃড় ঢ়বৎঢ়বঃঁধঃরড়হ ড়ভ ঃযব ংবষভ.) জীব শুধু বাঁচিয়া থাকিয়াই সন্তুষ্ট নহে, সে যুগ-যুগান্তরের ভিতর দিয়া আপনাকে প্রসার করিতে চাহে। অর্থাৎ সে সন্তান-সন্ততির ভিতর দিয়া নিজে চিরকালই বাঁচিয়া থাকিতে ব্যাগ্র। সেই জন্যেই জীব জগতে সন্তান বাৎসল্যের এরূপ প্রবল অভিব্যক্তি। ক্ষুদ্র পিপীলিকা হইতে পাখি, চতুস্পদ জন্তু এবং মনুষ্য। সকলের মধ্যেই এই সন্তান-বাৎসল্য পরিস্ফুট হইয়াছে। .... মানুষও এই নিয়মের অধীন। মানুষ যুগ-যুগান্তরের ভিতর দিয়া নিজেকে অন্ততকালের জন্য প্রতিষ্ঠিত রাখিবার জন্য জীবনব্যাপী চেষ্টা করিতেছে। ... সে নিজেই সন্তান-সন্তুতির ভিতর দিয়া যুগ যুগ ধরিয়া আপনার ভোগ লিপ্সা চরিতার্থ করিবে। সন্তান যে তাহারই নিজেরই নব সংস্করণ।’ 
আত্মপ্রতিষ্ঠার চিরন্তন আবেগে প্রকৃতিতে যে চরম সত্য নিত্য বহমান তার সঙ্গে মানুষের সামান্য হলেও পার্থক্য আছে। কি সেই পার্থক্য? এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ বরকতুল্লার মন্তব্যÑ ‘মানুষ শুধু জৈব শক্তির অভিব্যক্তি নয়, মানুষের আরও একটি নতুন শক্তির বিকাশ আছে। উহার নাম আত্মা।
আত্মাও চিরকাল বাঁচিয়া থাকিতে উৎসুক। মরণ মানুষের দৈহিক জীবনে সমাপ্তি আনিয়া দেয়, কিন্তু আত্মা তার পরও বাঁচিয়া থাকিতে চায়। তাই মৃত্যুর পরপার সম্বন্ধে মানুষের এত জল্পনা-কল্পনা। সংসারের এই মায়া বন্ধন, এই আশা-ভরসা, এই উদ্যম-সাধনা, সকলই মরণের সঙ্গে সঙ্গে দারুণ ব্যর্থতায় মিশিয়া যাইবে, এ চিন্তা মানুষ সহ্য করিতে পারে না।... পুণ্য কি মিথ্যা, পরলোক মিথ্যা, ন্যায়ের দ-ধারী বিধাতা মিথ্যা? এ জগৎ কি শুধু বিরাট মোহের অবাস্তব লীলাভিনয়! না, মানুষ ইহা বিশ্বাস করিতে পারে না। সে যে বাঁচিয়া থাকিতে চাহে, বাঁচাই যে তার ধর্ম। সে মরণকেও মরণ বলিয়া জানিতে পারে না। ... জীবন যেমন অনন্ত মহাযাত্রায় ছুটিয়া চলিয়াছে, যুগ-যুগান্তরের ভিতর দিয়া আপনার পথ কাটিয়া চলিয়াছে। (ইরড়ষড়মরপধষ বাড়ষঁঃরড়হ) আত্মাও তেমনি অনন্তকাল ধরিয়া কোনও এক বিশ্বে (পরলোকে) বাঁচিয়া থাকিবে; লীলাভিনয় করিবে, আপনার কর্ম ফল ভোগ করিবেন। মৃত্যু সেও ঘাঁটি (ঝঃধঃরড়হ) মাত্র; এইখানে আসিয়া আত্মজীবনের নিকট বিদায় গ্রহণ করিয়া আপনার দেশে চলিয়া যায়, আর দেহ যাত্রীহীন মাকটের ন্যায় ধুলায় লুটিয়া থাকে।’
রবীন্দ্রনাথও বলেন, ‘মরণরে! তুঁনু মম শ্যাম সমান’ কারণ অন্য কেউ নয়,Ñ একমাত্র মরণ-ই মহাজীবনের প্রবেশদ্বারে পৌঁছে দিতে পারে। সেই দ্বার দিয়ে ভারমুক্ত আত্মা অসীমের পথে যাত্রা শুরু করে আর পঞ্চভূতে বিলীন হতে ধরা ধুলায় পড়ে থাকে ভারবাহী দেহ।
বরকতুল্লাহ মনে করেনÑ ‘মানবের বিশ্বাস জীবন ও আত্মা এক নহে; জীবন বা জৈবশক্তি প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন, আত্মা নিত্য। মানুষ ও অমৃতের দেশে (পরলোকে) বাঁচিয়া থাকিতে চায়, কিন্তু সেখানে তার বাসস্থান কোথায়? সে চিন্তাও মানুষের মনে স্থান পাইয়াছে। মানুষ স্বর্গের দেশে বিরাট অভ্রভেদী প্রাসাদ গড়িয়াছে। প্রাসাদের ধারে উদ্যান; অদূরে ¯িœগ্ধ ধারা প্রবাহিনী সাহচার্যের জন্য লক্ষ লক্ষ হুরও গেলমান। .... তারই সে নাম রাখিয়াছে স্বর্গ বা বেহেশত।’
অবশ্য সুফী ভাবাপন্ন লেখক শেখ ফজলল করিম মনে করেন, মানুষের অন্তরেই স্বর্গ-নরক। তাই তোতার প্রশ্ন এবং উত্তরÑ 
‘কোথায় স্বর্গ? কোথায় নরক? কে বলে তা বহুদূর? 
মানুষের মাঝে স্বর্গ নরক মানুষেতে সুরাসুর। 
প্রীতি ও প্রেমের পুণ্য বাঁধনে মিলি যবে পরস্পরেÑ 
স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদের কুঁড়েঘরে।’
মানব মনের এই অনুভবকে বরকতুল্লাহ ব্যক্ত করেন এভাবেÑ ‘সেই কল্পনার লীলা নিকেতন, হতাশার আশা, পরলোক তোমার নিকট অলীক অনিত্য প্রহেলিকা বলিয়া মনে বইতে পারে, কিন্তু উহা বিশ্বাস করিতে বা সত্য বলিয়া গ্রহণ করিতে মানবের যে ব্যাকুল আগ্রহ তার মূলে এক বিরাট সনাতন সত্য নিহিত রহিয়াছে। যে সত্যকে অগ্রাহ্য করিলে চলিবে না। মানুষের জ্ঞান যতই সীমাবদ্ধ হোক, মানুষ চিরকালই বাস্তবকে ছাড়াইয়া অবাস্তব আদর্শের সন্ধানে ছুটিয়াছে। .... সুদূর সৌরলোক পর্যন্ত সে তাহার প্রিয় কল্পনার সূত্র প্রসারিত করে। কিন্তু সময় সময় সাধনার বলে মানুষ আপন অন্তরকে দেখিতে পারে এবং আপন হৃদয়ের ভিতর দিয়া সকল সুরভির সার বিস্ময়ের বিকাশ বুঝিতে পারে। প্রকৃত সাধক মনোসংযোগ দ্বারা অন্তর দৃষ্টি করিতে পারেন, তাই তিনি গন্ধমুগ্ধ হরিণের ন্যায় বাহিরে কস্তুরীর সন্ধানে ফেরেন না। তাহার নিজের অন্তরই যে সকল অভিব্যক্তির আধার তাহা তিনি বুঝিতে পারেন। আর তপস্যা বা আরাধনার পথে আবহমান কাল মানুষ নিজের অন্তরের সেই অন্তরতম মহাশক্তির স্বরূপ উপলদ্ধি করিতে প্রয়াসী, তাই মানুষের নিকট নির্জন আরাধনা ধর্ম প্রকাশ্য উপসনাও ধর্ম।’
সমস্ত নিবন্ধ জুড়ে এত উদ্ধৃতির কারণ পাঠককে ‘অনন্ত তৃষার’ বক্তব্য উপলব্ধির সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। সৃজনশীল ক্লাসিক গদ্যে বরকতুল্লাহ কত বড় কঠিন সত্যকে পাঠকের সামনে তুলে ধরে তার হৃদয়তন্ত্রীতে গেঁথে দিলেন তার ব্যাখ্যা দেবার চেয়ে উদ্ধৃতি সংযোজন করাই শ্রেয় বলে মনে হয়েছে। 
বাংলা ভাষায় দার্শনিক ও চিন্তামূলক প্রবন্ধ রচনা মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। তিনি উচ্চ মানের প্রবন্ধ রচনার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬০ খ্রি. ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ লাভ করেন।
উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি সমাজ এবং দেশের কল্যাণ করা সত্ত্বেও মানুষের স্মৃতিপটে অক্ষয় পদচিহ্ন রেখেছেন সাহিত্য সাধনার মাধ্যমে। সাহিত্য সাধনায় তিনি কতটা নাড়ির টান অনুভব করতেন তা উপলব্ধি করা যায় তার রচনা শৈলী, বিষয় নির্বাচন এবং ভাষা প্রয়োগের সুদক্ষ কৌশল যা তার সমসাময়িক লেখকগণ থেকে তাকে স্বাতন্ত্র্য মর্যাদায় আসীন করেছিল। বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত মেধাবী লেখক বরকতুল্লাহ যেন ‘শাহজাদপুরের শাহজাদা, সিরাজগঞ্জের বসরাফুল’Ñ যিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৮-এর ২রা মার্চ ঘোড়শালাগ্রামে, মৃত্যুবরণ করেন ঢাকায় ২ নভেম্বর, ১৯৭৪-এ।

স্মরণ : কবি য়োসানো আকিকোর

স্মরণ : কবি য়োসানো আকিকোর
আলী ফোরকান
জন্ম  : ১৮৭৮,
 মৃত্যু : ১৯৪২
পৃথিবীর সর্বত্রই রয়েছে আহাজারি, এক বিষণ ক্রন্দনের সুর। সে সুর অন্য কোথাও নিয়ে যায় আমাদের। আমরা অন্যভাবে নিজেদের ভাবতে পারি। সে সুর মনের গহীনে বাজে মৃদুলয়ে, কখনো উচ্চকিত, কখনো ক্ষোভ, ঘৃণা, ভালোবাসা, সংগ্রামের সাথে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নারীবাদী শক্তিশালী কণ্ঠস্বরের মতো জাপান, ভারত ও চীনেও রয়েছে নারীবাদী শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। তাদের চেতনা অন্যদের চেয়ে ভিন্ন নয়। পৃথিবীর যে কোন জায়গার অনুভূতিই এক, প্রকাশ ভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে।
য়োসানো আকিকোর জন্ম ১৮৭৮, মৃত্যু ১৯৪২। স্বশিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে আকিকো জাপানি কবিতায় নতুন ধারার প্রবর্তন করেন। বিংশ শতাব্দীতে তার বিপুল প্রভাব পড়ে জাপানি কবিদের ওপর। ১৯০৪-১৯০৯ সময়পর্বকে বলা হতো জাপানি কবিতায় আকিকো পর্ব। নারী শিক্ষার একজন প্রধান প্রবক্তা, আকিকোর রচনাবলির সংখ্যা চৌদ্দ খ-। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ট্যাংলেড হেয়ার আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। এতে তিনি ট্যাংকা নামক এক ধরনের জাপানি কবিতা রচনায় উৎকর্ষের পরাকাষ্ঠা দেখান।
প্রসব বেদনা অতি কষ্টের আবার অনেক মধুর। এ শান্তি অথবা যন্ত্রণা শুধু নারীই পেতে পারে। কুমারী মেয়েরা বা পুরুষেরা কিছু সান্ত্বনার বাণী দিতে পারে; কিন্তু বাস্তব অতি সত্য, সেখানে ভালো বা মন্দ নেই। যার যন্ত্রণা সেই যত বোঝে; আর কেউ তেমন বোঝে না। য়োসানো আকিকো ‘প্রসব যন্ত্রণা’ কবিতায় তেমনটি বলেছেন।
আমি একা, সম্পূর্ণ একা
ঠোঁট কামড়ে, শরীর শক্ত করে
এক নিদারুণ অভিজ্ঞতার জন্য অপেক্ষমান
সত্য তো একটাই, আমি এক শিশুর জন্ম দেবি
এই সত্য আমার ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসবে
এর কোনো ভালো-মন্দ নেই, এ এক নিরেট বাস্তব
গর্ভযন্ত্রণার প্রথম ধাক্কাতেই
সূর্য ফ্যাকাসে হয়ে গেলে
সারা পৃথিবী স্তব্ধতায় ভরা
আর আমি একা, অসম্ভব একা
পাঞ্জাবি ভাষার প্রধান কবিদের একজন অমৃতা প্রীতমের জন্ম ১৯১৯ সালে। সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পাওয়া প্রথম ভারতীয় নারী কবি। কবিতা ছাড়াও গল্প, উপন্যাস লিখে থাকেন। নাগমণি নামে একটি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক। অসংখ্য গ্রন্থের রচয়িতা।
হাজার বছর ধরে পুরুষেরা নারীদের পুতুল বানিয়ে রেখেছে। স্ত্রী সেও পুতুল একখানা। পুরুষের ইচ্ছা হলেই তার চাহিদা মেটাতে হয়। কিন্তু নারীর ইচ্ছা থাকে একান্ত গোপন। পুরুষ হাজার অপরাধ করলেও নারী কিছুই বলতে পারে না। কারণ তার দেয়া ভাত তাকে স্তব্ধ করে দেয়, তার কণ্ঠ রোধ করে দেয়। স্বামী-স্ত্রী এক ছাদের নিচে থাকে, তবু তারা থাকে একে অপরের থেকে বহুদূরে। এমন নিরেট সত্য অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন অমৃতা প্রীতম তার ‘ভাতার’ কবিতাতে।
ভাতার আমার
আমি তো তোমার খেলার জন্য তৈরি
মাংসের পুতুল একখানা
আমি তোমার পানের জন্য
এক পেয়ালা তরুণ রক্ত
তোমার সামনে দাঁড়ানো আমি
আমাকে তোমার দু’হাতে বাঁধো
তোমার শরীরের আগুনে ছুড়ে ফেলো 
চুম্বন, মর্দন
যা খুশি করো
ভাতার আমার শুধু
ভালোবাসা চেয়ো না
চীনের নতুন কবিদের মধ্যে অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর ঝ্যাং ঝেন। সাংহাই-এর মেয়ে ঝ্যাং সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করার জন্য সুউডেন, জার্মানি এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেছেন। দেশের  সঙ্গেও যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। মাঝে বেশ ক’বছর চীনে একটি আধুনিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনও করেছেন। তার কবিতায় বিশ্বজনীনতা, নগরমনস্কতা ও নারীর নিঃসঙ্গতার অনুষঙ্গ লক্ষ করা যায়।
এমন অনেক সময় থাকে, যখন নারীদের ইচ্ছে করে না পুরুষের কাছে যেতে। কিন্তু পুরুষের ইচ্ছে হলেই নারীকে উপস্থিত হতে হয় তার কাছে। এ যেন নির্মম ভাগ্য দেবতার পরিহাস। অনিচ্ছায় মিলন, পীড়নের সামিল। পুরুষ পাখি তা বুঝেও বোঝে না। ঝ্যাং ঝেন ‘একটি আকাক্সক্ষা’ কবিতায় এমন সত্যের অবত্রণা করেছেন।
কিন্তু তার এই রঙের বাহার আমার জন্য
কেবলই পীড়নের কথা বলে
ঘাড়ে চুমু দিয়ে শুরু করে সে
তারপর সারা শরীরে ঢেলে দেয় জ্বলন্ত মদের ধারা
তার  চুল মধ্যাহ্নের সূর্যালোকের মতো খাড়া
আমি মিনতি করি, সে তবু পাহাড় বেয়ে
উঠতে থাকে যেখানে আমার আত্মার বসবাস
তারপর ভেসে চলে যায় দূরে
শুধু শীর্ণ শরবনে পড়ে থাকে
আমাদের ব্যবহৃত দু’খানা দাঁড়
জাপান, ভারত ও চীনের নারীবাদী কবিরা শক্তিশালী কণ্ঠে গেয়েছেন মানবতার জয়গান। নারীদের প্রতি ধর্ষণ, অত্যাচার, বৈষম্য প্রভৃতির বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার। নারীদের জেগে ওঠার আহ্বান রয়েছে তাদের কবিতায়। যে সব পুরুষদের জন্য নারীরা অবহেলিত, তাদের বিরুদ্ধে এ সকল কবিদের রয়েছে দারুণ ঘৃণা-ক্ষোভ। নারীরা নিষ্পেষিত, নির্যাতিত। এ অবস্থা থেকে তাদের উত্তরণ দরকার। শুধু বসে বসে অশ্রু ফেলা নয়। অশ্রুই যেন হয়ে ওঠে শক্তিশালী বারুদ আর অন্যায়কে প্রতিরোধ করতে পারে যথাযথভাবে। এটাই জাপান, ভারত ও চীনের নারীবাদী কবিতাগুলোর মূল সুর। মূল ধ্বনি, মূল সুর একাকার হয়ে মিশেছে মনের সত্য সাগরে।
তথ্যসূত্র :
*নির্জন নিঃশ্বাস-অনুবাদ ও গ্রন্থনা-আলম খোরশেদ
*অন্য দেশের কবিতা- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় 
*কিউবিজম ও অনুষঙ্গ- ম. রফিকুল আলম 
*সমকালীন শিল্প ও শিল্পী- নজরুল ইসলাম 
*প্রকৃত শিল্পের স্বরূপ সন্ধান -ড. আব্দুস সাত্তার 
*হোরেস-এর কাব্যতত্ত্বÑসুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়
*হোরেস-এর আর্স পোয়েটিকা (কাব্যকলাতত্ত্ব)-
  সাধন কুমার ভট্টাচার্য
*সমালোচনার কথাÑশ্রী অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
*সাহিত্য-সুরেশ চন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত
*সাহিত্য সন্দর্শনÑশ্রীশ চন্দ্র দাশ

স্মরণ কবি আবুল হাসান

স্মরণ  কবি আবুল হাসান
আলী ফোরকান
জন্ম : ১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট 
মৃত্যু :Ñ২৬নভেম্বর ১৯৭৫
আবুল হাসানের কবিতায় আমাদের জীবনের কথা এমনভাবে ফুটে উঠেছে যে, জীবন-দর্শন-রুটি-রুজি-প্রেম-ভালোবাসার কথা আসলেই নীরবে বয়ে চলে। বাংলাদেশে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞ গড়ে উঠতে উঠতে তিলোত্তমা মন নিয়ে এগিয়ে যায় আদর আয়েশ। বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে খ্রিস্টীয় গত শতকের সেভেনটিইসে যাঁরা কবিতা লিখছেন, অ্যাজ অ্যা টেনডেন্সি তাদের কবিতা সমাজ-রাজনীতির নিচে চাপা পড়ে গেছে বলে অভিযোগ আছে। আর সেই অভিযোগের হাত থেকে মুক্তির জন্য নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে বিনয়ের সাথে তার কবিতা পাঠ করতে করতে কবি আবুল হাসানকে কাব্যজ কথা ভাবতে থাকি। ভাবনায় চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ, জন্ম-মৃত্যু জীবনযাপন, উচ্চারণগুলো শোকের, অসভ্য দর্শন, মিসট্রেসঃ ফ্রি স্কুল স্ট্রীট, উদিত দুঃখের দেশ, নিঃসঙ্গতা, গোলাপের নিচে নিহত হে কবি কিশোর, যুগলসন্ধি, বিচ্ছেদ, ঝিনুক নীরবে সহো, এপিটাফ, তোমার মৃত্যুর জন্য  জ্যোস্নায় তুমি কথা বলছো না কেন, অপরিচিতি’র মতো অনন্য কবিতার চিত্রকল্প ভেসে ওঠে। কবি আবুল হাসান লিখেছেন : ‘সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র/ মায়াবী করুণ/ এটা সেই পাথরের নাম নাকি? এটা তাই?/ এটা কি পাথর নাকি কোনো নদী? উপগ্রহ? কোনো রাজা?/ পৃথিবীর তিনভাগ জলের সমান কারো কান্না ভেজা চোখ?/ মহাকাশে ছড়ানো ছয়টি তারা? তীব্র তীক্ষ্ম তমোহর/ কী অর্থ বহন করে এইসব মিলিত অক্ষর?/ আমি বহুদিন একা একা প্রশ্ন করে দেখেছি নিজেকে,/ যারা খুব হৃদয়ের কাছাকাছি থাকে, যারা এঘরে ওঘরে যায়/ সময়ের সাহসী সন্তান যারা সভ্যতার সুন্দর প্রহরী/ তারা কেউ কেউ বলেছে আমাকে/ এটা তোর জন্মদাতা জনকের জীবনের রুগ্ন রূপান্তর,/ একটি নামের মধ্যে নিজেরি বিস্তার ধরে রাখা,/ তুই যার অনিচ্ছুক দাস!/ হয়তো যুদ্ধের নাম, জ্যোৎস্নায় দুরন্ত চাঁদে ছুঁয়ে যাওয়া,/ নীল দীর্ঘশ্বাস কোনো মানুষের!/ সত্যিই কি মানুষের?/ তবে কি সে মানুষের সাথে সম্পর্কিত চিল, কোনোদিন/ ভালোবেসেছিল সেও যুবতীর বামহাতে পাঁচটি আঙ্গুল?/ ভালোবেসেছিল ফুল, মোমবাতি, শিরস্ত্রাণ, আলোর ইশকুল?’
কবি মানে নির্মল আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি শিক্ষার আলো জ্বালানোর প্রত্যয়ে অগ্রসর সবসময়। আর তাই চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ শীর্ষক কবিতায় তিনি লিখেছেন : ‘আসলে আমার বাবা ছিলেন নিম্নমানের মানুষ/ নইলে সরকারি লোক, পুলিশ বিভাগে চাকরি কোরেও/ পুলিশি মেজাজ কেন ছিল না ওনার বলুন চলায় ও বলায়?/ চেয়ার থেকে ঘরোয়া ধূলো, হারিকেনের চিমনীগুলো মুছে ফেলার মতোন তিনি/ আস্তে কেন চাকর-বাকর এই আমাদের প্রভু নফর সম্পর্কটা সরিয়ে দিতেন?/ থানার যত পেশাধারী, পুলিশ সেপাই অধীনস্থ কনেস্টবল/ সবার তিনি এক বয়সী এমনভাবে তাস দাবাতেন সারা বিকাল।/ মায়ের সঙ্গে ব্যবহারটা ছিল যেমন ব্যর্থ প্রেমিক/ কৃপা ভিক্ষা নিতে এসেছে নারীর কাছে!/ আসলে আমার বাবা ছিলেন নিম্নমানের মানুষ নইলে দেশে যখন তাঁর ভাইয়েরা জমিজমার হিশেব কষছে লাভ অলাভের/ ব্যক্তিগত স্বার্থ সবার আদায় কোরে নিচ্ছে সবাই
বাবা তখন উপার্জিত সবুজ ছিপের সুতো পেঁচিয় মাকে বোলছেন এ্যাই দ্যাখোতো/ জলের রং-এর সাথে এবার সুতোটা খাপ খাবে না?/ কোথায় কাদের ঐতিহাসিক পুকুর বাড়ি, পুরনো সিঁড়ি/ অনেক মাইল হেঁটে যেতেন মাছ ধরতে!/ আমি যখন মায়ের মুখে লজ্জাব্রীড়া, ঘুমের ক্রীড়া/ ইত্যাদি মিশেছিলুম, বাবা তখন কাব্যি কোরতে কম করেননি মাকে নিয়ে/ শুনেছি শাদা চামেলী নাকি চাপা এনে পরিয়ে দিতেন রাত্রিবেলায় মায়ের খোপায়!/ মা বোলতেন বাবাকে তুমি এই সমস্ত লোক দ্যাখোনা?/ ঘুষ খাচ্ছে, জমি কিনছে, শনৈঃ শনৈঃ উপরে উঠছে,/ কতরকম ফন্দি আটছে কত রকম সুখে থাকছে,/ তুমি এসব লোক দ্যাখোনা?/ বাবা তখন হাতের বোনা চাঁদর গায়ে বেরিয়ে কোথায়/ কবি গানের আসরে যেতেন মাঝরাত্তিরে/ লোকের ভিড়ে সামান্য লোক, শিশিরগুলো চোখে মাখতেন!’
এমন সব সম্ভাবনার রাতহীন আলোকিত দিনের গল্প প্রতিনিয়ত বলা কেবলমাত্র কবিদের পক্ষেই বলা সম্ভব। সত্য-সুন্দর ও সাহসের সাথে তৈরি হওয়া আমাদের প্রতিটি পর্ব বয়ে চলবে বিদগ্ধ ভালোবাসার সাথে। ষাটের দশকে কবিতার রাজত্ব তখন কতটা সম্মৃদ্ধ ছিলো, তা নিয়ে একটু আধটু পড়াশোনা করলেই জানা যাবে। যেমন কবি আবুল হাসানের রক্তভাবনার কাব্যজ উচ্চারণ- ‘এখন তিনি পরাজিত, কেউ দ্যাখেনা একলা মানুষ/ চিলেকোঠার মতোন তিনি আকাশ দ্যাখেন, বাতাস দ্যাখেন/ জীর্ণ ব্যর্থ চিবুক বিষন্ন লাল রক্তে ভাবুক রোদন আসে,/ হঠাৎ বাবা কিসের ত্রাসে দুচোখ ভাসান তিনিই জানেন!/ একটি ছেলে ঘুরে বেড়ায় কবির মতো কুখ্যাত সব পাড়ায় পাড়ায়/ আর ছেলেরা সবাই যে যার স্বার্থ নিয়ে সরে দাঁড়ায়/ বাবা একলা শিরঃদাঁড়ায় দাঁড়িয়ে থাকেন, কী যে ভাবেন,/ 
প্রায়ই তিনি রাত্রি জাগেন, বসে থাকেন চেয়ার নিয়ে/ চামেলী হাতে ব্যর্থ মানুষ, নিম্নমানের মানুষ!
মানুষ যে নি¤œমানেরও হতে পারে; তা আজ থেকে কয়েক যুগ আগে লিখে গেছেন কবি আবুল হাসান। ‘জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন’ শীর্ষক কবিতায় তিনি লিখেছেন : ‘মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবে না,/ আমি তাই নিরপেক্ষ মানুষের কাছে, কবিদের সুধী সমাবেশে/ আমার মৃত্যুর আগে বোলে যেতে চাই,/ সুধীবৃন্দ ক্ষান্ত হোন, গোলাপ ফুলের মতো শান্ত হোন/ কী লাভ যুদ্ধ কোরে? শত্রুতায় কী লাভ বলুন?/ আধিপত্যে এত লোভ? পত্রিকা তো কেবলি আপনাদের/ ক্ষয়ক্ষতি, ধ্বংস আর বিনাশের সংবাদে ভরপুর.../’ 
এখন যেমন মানুষ ভালো নেই, দুর্নীতি-ধান্দাবাজি-সন্ত্রাসী কর্মকা-ে নিজেদেরকে জড়িত করেছে। তখনও মানুষ ভালো ছিলো না; ভালো ছিলো না বলেই কবি আবুল হাসান নিজের চোখের সামনে নির্মম ঘটনাগুলোকে দেখতে দেখতে লিখেছেন বিভিন্ন কাব্যজ কথা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে যারা ত্যাগের রাজত্ব নির্মাণ করেছেন, একইভাবে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আর স্বাধীনতা-স্বাধীকারের প্রতিটি মুহূর্তে যারা জীবনপণ লড়েছেন, সেই লড়াকুদের জীবন নিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে ইতিহাস সবসময়-ই প্রমাণ দিয়েছে যে, যখন-ই অন্যায়ের উত্থান হয়েছে, সাথে সাথে পতনও নির্মিতক হয়েছে ছন্দিত-নন্দিত তানে। উচ্চারণগুলো শোকের : ‘এই অনবদ্যতায় আমাদেরকে তিনি দিয়ে গেছেন, লক্ষ্মী বউটিকে/ আমি আজ আর  কোথাও দেখিনা,/ হাঁটি হাঁটি শিশুটিকে/ কোথাও দেখিনা;/ কতগুলো রাজহাঁস দেখি,/ নরম শরীর ভরা রাজহাঁস দেখি,/ কতগুলো মুখস্থ মানুষ দেখি, বউটিকে কোথাও দেখিনা/ শিশুটিকে কোথাও দেখিনা!/ তবে কি বউটি রাজহাঁস?/’ 
সবুজের সামিয়ানা টাঙানো নতুন সম্ভাবনার দেশে সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে বিন¤্র ভালোবাসায়-শ্রদ্ধায়। আর এই ভালোবাসা ছিলো বলেই কবি আবুল হাসানের প্রতি-তার কবিতার প্রতি অমোঘ প্রীতি আজো বয়ে চলছে নদীর মতো। ভালোবাসা-প্রেম আর রাষ্ট্রÑ দেশ-মানুষ নিয়ে অবিরত তার লেখনিগুলো সৃষ্টি হয়েছে শব্দজ ঘর নির্মাণের মধ্য দিয়ে। তার প্রকাশিত কবিতার বই : রাজা যায় রাজা আসে (১৯৭২), যে তুমি হরণ করো (১৯৭৪), পৃথক পালঙ্ক (১৯৭৫) এবং রচনা সসমগ্র (১৯৯৪)। বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৫) এবং একুশে পদক (১৯৮২) পেয়েছেন নতুন প্রজন্মের উদাহরণ কবি আবুল হাসান। সাংবাদিকতার পেশায় দৈনিক ইত্তেফাক, গণবাংলা এবং দৈনিক জনপদে কাজ করছেন। ঢাকার তৎকালীন সুন্দরী ও বিদুষী সুরাইয়া খানম-এর প্রেমিক হিসাবে ব্যাপক পরিচিত কবি আবুল হাসানকে নিয়ে অনেকেই অনেক লেখা লিখেছেন, নিজের মতো করে মূল্যায়ন করেছেন; কবি-প্রাবন্ধিক শাহ মতিন টিপু লিখেছেন : “ ‘মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবেনা,/ আমি তাই নিরপেক্ষ মানুষের কাছে, কবিদের সুধী সমাবেশে/ আমার মৃত্যুর আগে বোলে যেতে চাই,/ সুধীবৃন্দ ক্ষান্ত হোন, গোলাপ ফুলের মতো শান্ত হোন/ কী লাভ যুদ্ধ কোরে? শত্রুতায় কী লাভ বলুন? (জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন) Ñএই লাইন কটিই আবুল হাসানকে চিনিয়ে দেয় আমাদের। বলে দেয় তার কবিতার শক্তিমত্তার কথা।” কবির আবুল হাসানের জন্ম ১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট টুঙ্গীপাড়ার বর্নি গ্রামে নানার বাড়িতে। আবুল হাসানের প্রকৃত নাম আবুল হোসেন মিয়া, পরবর্তীতে আবুল হাসান নামে কবি খ্যাতি অর্জন করেন। ডাকনাম ছিল ‘টুকু’। বাবার চাকরির সুবাদে ফরিদপুর থেকে ঢাকা আসেন। আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন। আরমানিটোলা স্কুলে পড়ালেখার সময় থেকেই আবুল হাসান নিয়মিত কবিতা লিখতে শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে আবুল হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার্জন সম্পন্ন করেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই হাসান সাহিত্যচর্চায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। এ সময় তিনি ঢাকার তরুণ কবিদের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে আসেন। তিনি নির্মাণ করেছেন নিরন্তর কাব্যজ ভুবন ঠিক এভাবে : ‘উদিত দুঃখের দেশ, হে কবিতা হে দুধভাত তুমি ফিরে এসো!/ মানুষের লোকালয়ে ললিতলোভনকান্তি কবিদের মতো/ তুমি বেঁচে থাকো
তুমি ফের ঘুরে ঘুরে ডাকো সুসময়!/ রমণীর বুকের স্তনে আজ শিশুদের দুধ নেই প্রেমিক পুরুষ তাই/ দুধ আনতে গেছে দূর বনে!’
কবিরা বরাবরই হয়ে থাকেন নিবেদিত আলো। এই আলো ছড়িয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মনের গভীরে স্থান করে নিয়েছেন। এছাড়াও কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লা যখন নির্মমতার রাজনীতি দেখতে দেখতে লিখেছেন. ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’র মতো অনবদ্য কবিতা। তারও অনেক আগে ক্ষয়ে যাওয়া আমাদের তৎকালীন  নিয়ে কবি আবুল হাসান লিখেছেন : ‘পিতৃপুরুষের কাছে আমাদের ঋণ আমরা শোধ করে যেতে চাই!/ এইভাবে নতজানু হতে চাই ফল ভরা নত বৃক্ষে শস্যের শোভার দিনভর/ তোমার ভিতর ফের বালকের মতো ঢের অতীতের হাওয়া/ খেয়ে বাড়ি ফিরে যেতে চাই!’
ইচ্ছের ডানায় ভর করে রাজনীতিকরা না চললেও কবিরা চলেন নির্লোভ হয়ে। যে কারণে সবুজ দিঘীর ঘন শিহরণ? হলুদ শটির বন? রমণীর রোদে দেয়া শাড়ি দেখতে ও দেখাতে বড্ড পরিপক্ব হয়ে এগিয়ে গেছেন সমসাময়িক কবিদেরকে পেছনে ফেলে বহু বহু দূর।  
কর্মজীবনের কথা আসলে জানা যায়, কবি আবুল হাসান ১৯৬৯ সালে তিনি দৈনিক ‘ইত্তেফাক’-এ সাংবাদিকতা শুরু করেন। ১৯৭২ সালে ‘গণবাংলা’ পত্রিকায় যোগ দেন। ‘গণবাংলা’-য় সাহিত্য বিভাগে শহীদ কাদরীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৩ সালে যোগ দেন আবদুল গাফফার চৌধুরী সম্পাদিত দৈনিক ‘জনপদ’ পত্রিকায়। এ পত্রিকায় আবুল হাসান সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ‘জনপদ’ পত্রিকায় তিনি ১৯৭৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত সাহিত্য সম্পাদনা করেন। এই দেড় বছরে ‘জনপদ’ পত্রিকায় আবুল হাসানের অনেক রচনা প্রকাশিত হয়েছে-এর মধ্যে আছে কবিতা, প্রবন্ধ এবং উপ-সম্পাদকীয় নিবন্ধ। এই পত্রিকায় তিনি ‘আপন ছায়া’ এবং ‘খোলাশব্দে কেনাকাটা’ শীর্ষক দুটি উপ-সম্পাদকীয় কলাম লিখতেন। ‘খোলাশব্দে কেনাকাটা’ শীর্ষক কলামটির প্রথম চার সংখ্যা তিনি ‘ভ্রামণিক’ ছদ্মনামে লিখেছেন। ১৯৭৪ সালে সহ-সম্পাদক হিসেবে দৈনিক ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকায় যোগ দেন। ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকায় তিনি ‘আড়ালে অন্তরালে’ এবং ‘বৈরী বর্তমান’ শীর্ষক দুটি উপ-সম্পাদকীয় কলাম লিখতেন। ‘ফসলবিলাসী হাওয়ার জন্য কিছু ধান চাই’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ রচনা করে সেই সময় তিনি লেখক হিসেবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
১৯৭০ সালটি আবুল হাসানের জীবনে বিশেষ তাৎপর্যবহ। কারণ ‘শিকারী লোকটা’ শিরোনামে একটি কবিতার জন্য এ সময় তিনি সমগ্র এশিয়াভিত্তিক এক প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে বিশেষ পুরস্কার লাভ করেন। পরে ওই কবিতাটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত সমগ্র পৃথিবীর প্রতিনিধিত্বশীল কবিদের কবিতা-সঙ্কলনে অন্তর্ভুক্ত হয়। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (১৯৭০) শীর্ষক ওই গ্রন্থে তদানীন্তন পাকিস্তানের একমাত্র প্রতিনিধি আবুল হাসানের কবিতা স্থান পায়। কবি আবুল হাসানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’ প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। ‘রাজা যায় রাজা আসে’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আবুল হাসানের কবি খ্যাতি বিস্তার লাভ করে। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘যে তুমি হরণ করো’ প্রকাশ হয় ১৯৭৪ সালে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে আবুল হাসান তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথক পালঙ্ক’র পা-ুলিপি তৈরি থেকে শুরু করে প্রুফ দেখা সবটাই করেছেন। ‘পৃথক পালঙ্ক’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে। ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর মাত্র আটাশ বছর বয়সে আবুল হাসান মৃত্যুবরণ করলেও কাব্যজ জীবনের পরিধি এতটাই বিস্তৃত করেছিলেন যে, কাজের মাঝে জীবিত ছিলেন নিরন্তর। আর একারণেই মৃত্যুর পর তার কাব্যজ জনপ্রিয়তা বেড়ে যায় অনেকগুণ। তারই সুবাদে তিনি ১৯৭৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৮২ সালে একুশে পদক লাভ করেন। আর মৃত্যুরও দশ বছর পর ১৯৮৫ সালে নওরোজ সাহিত্য সংসদ প্রকাশ করে ‘আবুল হাসানের অগ্রন্থিত কবিতা’ গ্রন্থটি। কবি হলেও আবুল হাসান বেশকিছু সার্থক ছোটগল্প রচনা করেছেন। মৃত্যুর পনের বছর পর ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় তার নয়টি গল্পের সঙ্কলন ‘আবুল হাসান গল্পসংগ্রহ’। ‘ওরা কয়েকজন’ শীর্ষক একটি কাব্যনাটক তাঁর মৃত্যুর পর সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’-য় (১২.১২.১৯৭৫) প্রকাশিত হয়, যা স্বতন্ত্র গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হয় ১৯৮৮ সালে। জার্মানি থেকে ফিরে এসে আবুল হাসান ‘কুক্কুরধাম’ নামে একটি বৃহৎ কাব্য রচনার পরিকল্পনা করেন। এর বেশকিছু অংশ তিনি রচনাও করেছিলেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তিনি তা আর শেষ করতে না পারলেও সমৃদ্ধ করেছেন সম্ভাবনার প্রতি পর্বকে। স্বল্প-পরিসর জীবনে মাত্র দশ বছরের সাহিত্য-সাধনায় আবুল হাসান নির্মাণ করেছেন এক ঐশ্বর্যময় সৃষ্টিসম্ভার, যার ভিতর দিয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ ধরে। তিনি নির্মলেন্দু গুণকে উৎসর্গ করে ‘অসভ্য দর্শন’ শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন : ‘দালান উঠছে তাও রাজনীতি, দালান ভাঙছে তাও রাজনীতি,/ দেবদারু কেটে নিচ্ছে নরোম কুঠার তাও রাজনীতি,/’ 
কবি আবুল হাসানের এই যুক্তিসঙ্গত প্রশ্নের উত্তরও আজো দিতে পারেনি নির্মমতার রাজনীতি। যে কারণে নির্মমতার রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে পা রাখতে তৈরি হচ্ছে বর্তমানের রাজনীতিকদের একটি বড় অংশ। তাদের কাছে ছাত্র-যুব-জনতা-আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য নিবেদিত থেকে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে। শপথ করেছে দেশ বাঁচাতে-মানুষ বাঁচাতে তারা রাজনীতির নামে সকল অপরাজনীতির রাস্তা বন্ধ করতে জীবন দিয়ে হলেও এগিয়ে যাবে। কেননা, বায়ান্নকে প্রেরণা-একাত্তরকে চেতনা করে এগিয়ে যেতে যেতে তারা জাতির সকল শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জীবন-দর্শন নিয়ে গবেষণা করে এগিয়ে চলছে...

স্মরণ : কবি নজিবর রহমান

স্মরণ : কবি নজিবর রহমান
আলী ফোরকান
জন্ম :২২ জানুয়ারি ১৮৬০ 
মৃত্যু  : ১৮ অক্টোবর ১৯২৫
মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরতœ (জন্ম ২২ জানুয়ারি ১৮৬০, মৃত্যু ১৮ অক্টোবর ১৯২৫) প্রধানত কথাসাহিত্যিক হিসাবে সুপরিচিত। কিন্তু প্রথম জীবনে তিনি প্রবন্ধ রচনা শুরু করেন এবং দু’টি প্রবন্ধগ্রন্থও প্রকাশ করেন। তিনি একজন শক্তিশালী গদ্য লেখক এবং তার লেখায় ইতিহাস ও সমাজ-সচেতনতার পরিচয় ফুটে ওঠে। এছাড়া, যুক্তি-তত্ত্ব-তথ্য ও মননশীলতার দিক থেকেও তার প্রবন্ধ রচনা সুসমৃদ্ধ। কিন্তু তার প্রথম জীবনের গদ্য রচনাসমূহ দু®প্রাপ্য হওয়ায় সে সম্পর্কে অনেকেই অনবহিত এবং তার আলোচনাও বড় একটা দেখা যায় না। তবে নজিবর রহমান যে সমাজমনষ্ক ব্যক্তি ছিলেন, তা এসব রচনাবলী থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই এগুলো বাদ দিয়ে নজিবর রহমানের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। 
 ছাত্রজীবন থেকে বিশেষভাবে বলতে গেলে, ঢাকায় নর্মাল পড়ার সময় থেকে তিনি সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। ঢাকায় নর্মাল পড়াকালে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা করে তার  শিক্ষকদের ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন। এসময় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়ও তার লেখা ছাপা হয়। তবে সেগুলো পরবর্তীকালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে কিনা, তা জানা যায়নি। বিশিষ্ট গবেষক ডক্টর গোলাম সাকলায়েন প্রদত্ত তথ্যমতে ‘ইসলাম প্রচারক’ পত্রিকায় সর্বপ্রথম তার তিনটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধ তিনটির শিরোনাম : ‘পবিত্র নিদর্শন, মুসলমানের সপ্তরতœ’, ‘তীব্বতে মুসলমান এবং তীব্বতবাসীর আচার ব্যবহার’ ও ‘পূর্বস্মৃতি- কুতুবুদ্দিন আয়বেক’। শেষোক্ত রচনাটি ১৯০১ সালের জুলাই-আগস্ট (৪র্থ বর্ষ, ১ম-২য় সংখ্যা) ইসলাম প্রচারক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ যাবৎ প্রাপ্ত তার রচনার মধ্যে এটিই প্রথম। এটি একটি ইতিহাস বিষয়ক রচনা। এটি বা প্রথমোক্ত দুটি রচনার কোনটিই তার কোনো গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তিনি আজীবন শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। শিক্ষক হিসাবে ইতিহাসের একটি বিশেষ অধ্যায় বা চরিত্র সম্পর্কে তার মনে কৌতূহল বা আগ্রহ সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। এ কারণে তিনি তার শেষোক্ত রচনাটি লিখে পত্রিকায় প্রেরণ করেছিলেন বলে অনুমিত হয়। তবে এ ধরনের আরো প্রবন্ধ বা গ্রন্থ তিনি এর আগে বা পরে লিখেছিলেন কিনা সে সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অবশ্য তিনি যে ইতিহাস-সচেতন ব্যক্তি ছিলেন এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তার রচিত ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘চাঁদতারা’ বা ‘হাসন-গঙ্গা বাহমণি’। 
নজিবর রহমানের পূর্বে বঙ্কিমচন্দ্র বিভিন্ন ঐতিহাসিক কাহিনী নিয়ে উপন্যাস রচনা করেন। কিন্তু ইতিহাসের নামে তিনি মূলত ইতিহাসের বিকৃতি সাধন ও চরম সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্রয় দিয়েছেন। ঐ সময় মীর মশাররফ হোসেন ও মহাকবি কায়কোবাদও ঐতিহাসিক কাহিনী অবলম্বনে যথাক্রমে ‘বিষাদ সিন্ধু’ ও ‘মহাশশ্মান’ কাব্য রচনা করেন। বিষাদ সিন্ধুতে কিছুটা অতিরঞ্জন থাকলেও মহাশশ্মান কাব্যে কোন রকম বিকৃতি বা অতিশয়োক্তি নেই। প্রকৃতপক্ষে, নজিবর রহমান এক্ষেত্রে কায়কোবাদকেই আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করেন। 
ডক্টর সাকলায়েন উল্লেখ করেন, নজিবর রহমানের ‘বিলাতীবর্জ্জন রহস্য’, সাহিত্যিক, ১২শ বর্ষ, বসন্ত সংখ্যা, ১৩৮৪, পৃ-১৭৫ ছাপা হয়। যেহেতেু নজিবর রহমানের পূর্বকৃত কোনো রচনার সন্ধান পাওয়া যায়নি, অতএব উপরে বর্ণিত শেষোক্ত প্রবন্ধের প্রকাশকাল থেকে তার মৃত্যু অবধি কমপক্ষে চব্বিশ বছরকে তার সাহিত্যচর্চার কাল ধরা যায়। তেষট্টি বা পঁয়ষট্টি বছর আয়ুষ্কালে নজিবর রহমান মাত্র বাইশ/চব্বিশ বছর সাহিত্যচর্চা করেছেন। এ সময়কালকে আবার দু’ভাগে ভাগ করা যায়। ১৯০১-০৫ প্রথম ভাগ। তারপর ১৯১৪ সালে ‘আনোয়ারা’ উপন্যাস প্রকাশিত হবার সময় থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দ্বিতীয় ভাগ। এ সময় তিনি অত্যন্ত সৃষ্টিমুখর ছিলেন এবং এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তার রচিত ছোট-বড় মোট তেরটি গ্রন্থের এগারটি অর্থাৎ গড়ে বছরে একটি গ্রন্থ তিনি রচনা করেন। 
উপরোক্ত দু’ভাগে বিভক্ত সময়ে রচিত তার সাহিত্যের বৈশিষ্ট্যও এক নয়। প্রথমভাগে রচিত তার সব সাহিত্যই প্রবন্ধ-নিবন্ধ জাতীয় রচনা। এ সময় তিনি কোনো গল্প-উপন্যাস রচনা করেননি। দ্বিতীয় ভাগে তিনি কোনো প্রবন্ধ রচনা করেননি। এ সময়কার সব রচনাই উপন্যাস ও গল্প। সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে তার রচিত সব উপন্যাস ও গল্পের আঙ্গিক প্রায় একই রকম। এখানে বৈচিত্র্য বা ক্রম-উৎকর্ষ তেমন একটা চোখে পড়ে না। তাই তার প্রথম রচিত উপন্যাসই তার শ্রেষ্ঠ রচনা হিসাবে গণ্য হয়ে থাকে। পরবর্তী রচনাসমূহ মূলত প্রথম রচনারই অনুবর্তন বা অনুসরণ বলা যায়। এছাড়া, তার প্রথম ভাগের রচনায় রাজনীতি ও সমাজ-উন্নয়নের বিষয় সরাসরি স্থান লাভ করেছে কিন্তু দ্বিতীয় ভাগের রচনায় রাজনীতির প্রসঙ্গ অনুপস্থিত। 
প্রথম ভাগের রচনায় উপর্যুক্ত তিনটি প্রবন্ধ ছাড়া উল্লেখযোগ্য দুটি প্রবন্ধ-গ্রন্থ হলো : ‘সাহিত্য-প্রসঙ্গ’ (প্রকাশকাল  বাংলা ১৩১১, ঈসায়ী ১৯০৪) ও ‘বিলাতী বর্জ্জন রহস্য’ (প্রকাশকাল : বাংলা ১৩১১, ঈসায়ী ১৯০৫)। দু’টি গ্রন্থ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ইংরাজ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়। গবেষক বুলবুল ইসলাম তার ‘বাংলা সাহিত্যে নজিবর রহমান সাহিত্যরতেœর অবদান’ শীর্ষক নিবন্ধে সাহিত্য-প্রসঙ্গ সম্পর্কে বলেন : “বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জাতিসত্তার আলোকে সাহিত্য সৃষ্টি, সাহিত্য-শিল্পের প্রতি সমকালের শিক্ষিত মুসলমানদের অনীহা এবং তার পরিণাম, স্বাধীনতা এবং মানুষের সার্বিক মুক্তির জন্য সাহিত্যিকদের কর্তব্যবোধ, সর্বোপরি ভৌগোলিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ইসলামী উম্মার ঐক্য ও সংহতি সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব এবং যৌক্তিকতা নিরূপণই ‘সাহিত্য-প্রসঙ্গ’ গ্রন্থভুক্ত প্রবন্ধমালার মৌল বিষয়।” (বুলবুল ইসলাম, বাংলা সাহিত্য নজিবর রহমান সাহিত্যরতেœর অবদান)।
‘সাহিত্য-প্রসঙ্গ’ বইটিতে শিক্ষার মাধ্যমে মুসলিম সমাজের উন্নতির বিষয় আলোচিত হয়েছে। মুসলমানদের অবনতির মূল কারণ অশিক্ষা, পরাধীনতা ও মুসলমানদের প্রতি ইংরাজ ও হিন্দুদের চরম বিদ্বেষ ও ঈর্ষাপরায়ণতার উল্লেখ থাকায় বইটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাজেয়াপ্ত হয়। 
নজিবর রহমানের দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘বিলাতী বর্জ্জন রহস্য’ স্বদেশী আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হয়ে ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম এলাকা নিয়ে এক নতুন প্রদেশ গঠিত হয়। নতুন প্রদেশের জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ জন মুসলিম। ঢাকায় রাজধানী স্থাপিত হওয়ায় পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার রাস্তাঘাট ও অন্যান্য ক্ষেত্রে উন্নয়নের জোয়ার সৃষ্টি হয়। নতুন প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম হওয়ায় এখানে সর্বদা মুসলিমদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রবল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। হিন্দু প্রতিপক্ষ এটা মেনে নিতে পারে নি। তাছাড়া, হিন্দু জমিদারদের জমিদারী এ এলাকায় হলেও তাদের অধিকাংশের বসবাস ছিল কলকাতায়। নতুন প্রদেশ গঠিত হওয়ায় কলকাতার হিন্দু জমিদার-মহাজন ও বাবুশ্রেণির আধিপত্য যে বহুলাংশে খর্বিত হবে, এ আশংকায় তারা শুরু থেকেই বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে। বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য তারা অসহযোগ আন্দোলন, বিলাতি দ্রব্য বর্জ্জন ইত্যাদি নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে। মূলত ভারতের স্বাধীনতার দাবি হিসাবে তারা অসহযোগ আন্দোলন, বিলাতি বর্জ্জন ইত্যাদির কথা বললেও তাদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বঙ্গভঙ্গ রদ। নজিবর রহমান এটা উপলব্ধি করেই ‘বিলাতী বর্জ্জন রহস্য’ গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। মুসলমানরা যাতে বিভ্রান্ত না হয়, সেজন্য তিনি বিলাতি দ্রব্য বর্জ্জনের আসল রহস্য জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেন। বত্রিশ পৃষ্ঠার অনতিদীর্ঘ গ্রন্থের মুখবন্ধে লেখক বলেন : 
“বিলাতী বর্জ্জন রহস্য প্রকাশিত ও প্রচারিত হইল। ইহাতে গবেষণা যুক্তি প্রমাণ কিছুই নাই। নিত্য প্রত্যক্ষ সত্য দৃষ্টান্তই ইহার মূল ভিত্তি। দ্রুততা ও সময়ের অভাববশতঃ ভাষা ও বর্ণশুদ্ধির প্রতি লক্ষ্য রাখিতে পারা যায় নাই। সর্ব্ব সাধারণ যাহাতে বুঝিতে পারে তৎপ্রতি লক্ষ্য ছিল। অতএব প্রার্থনা-মহাদয়বিদ্বান পাঠক তজ্জন্য কপাল কুঞ্চিত করিবেন না। এই সামান্য পুস্তকে সমাজের সামান্যটুকু উপহার হইলেও শ্রম সার্থক বিবেচনা করিব।” (ডক্টর গোলাম সাকলায়েন : মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরতেœর ‘বিলাতী বর্জ্জন রহস্য’, সাহিত্যিকা, ১২শ বর্ষ, বসন্ত সংখ্যা, ১৩৮৪, পৃ. ১৫৭)।
লেখক বইটি উৎসর্গ করেন সিরাজগঞ্জ জেলার সাতটিকারী নিবাসী মুন্সী মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেনকে। উৎসর্গ পত্রটি এরূপ : “মাননীয় সুহৃদ, সমাজের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে দেখা যায়, প্রায় সকল লোকই নিরন্তর স্ব স্ব স্বার্থ সাধনে ব্যস্ত আছে, ক্বচিৎ বিরাম বিশ্রামের সময়টাও তাহারা বাহুল্য পচালে, হাসি-তামাশায় ও তাস পাশায় ক্ষেপণ করে। কিন্তু আপনাকে সেরূপ দেখিনা। আপনি, কিসে পতিত মুসলমান জাতির পুনরুন্নতি হইবেÑ কিসে সমাজের প্রকৃত মঙ্গল সাধিত হইবে, কিসে নিরক্ষর সরলপ্রাণ কৃষককুল পেট ভরিয়া একমুঠা পাইবে ইত্যাদি মনুষ্যোচিত চিন্তায় ও কার্যে অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করিয়া থাকেন। তাই আজ আমি আমার সাধের এই ‘বিলাতী বর্জ্জন রহস্য’ স্বদেশী তরঙ্গের যুগে আপনার স্বদেশ ও সমাজ হিতৈষিতার কর্মঠ উদার হস্তে অর্পণ করিলাম। সাধের সামগ্রী সামান্য হইলেও সুহৃদের নিকট উপেক্ষণীয় নহে, ইহাই ভরসা। ইতি।” (প্রাগুক্ত পৃ. ১৫৭)।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর পূর্ববঙ্গ ও আসাম নিয়ে বৃটিশ সরকার প্রশাসনিক সুবিধার্থে ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্বাঞ্চলে একটি প্রদেশ গঠন করে। দীর্ঘ অবহেলার কারণে সর্বদিক দিয়ে এ অঞ্চলের জনগণ অত্যন্ত দরিদ্র-বঞ্চিত ও দুর্দশার সম্মুখীন হয়। বঙ্গভঙ্গের ফলে এ অঞ্চলের উন্নতি ত্বরান্বিত হয় এবং নতুন রাস্তাঘাট নির্মাণের ফলে এ পশ্চাদপদ এলাকা দ্রুত উন্নতি লাভ করতে থাকে। এ অঞ্চলের অধিকাংশ লোক যেহেতু মুসলিম, সেহেতু এ অঞ্চলের উন্নতির অর্থ মুসলমানদের উন্নতি। উপরন্ত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা হওয়ায় এ অঞ্চলে প্রশাসনিক ক্ষমতা মুসলমানদের হাতেই থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এছাড়া, এ অঞ্চলের হিন্দু জমিদারদের অধিকাংশই তখন কলকাতায় বসবাস করতো। বঙ্গভঙ্গের ফলে তাদের স্বার্থে আঘাত লাগে। একারণে হিন্দু সম্প্রদায় শুরু থেকেই বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে। এমনকি, ইংরাজ সরকারকে বঙ্গভঙ্গ রদে বাধ্য করার জন্য মহন চাঁদ করম চাঁদ গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসাবে ভারতীয় কংগ্রেস বিলাতী দ্রব্য বর্জ্জনের আহ্বান জানায়। অসহযোগ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ইংরাজ সরকারকে বঙ্গভঙ্গ রদে বাধ্য করা। হিন্দুদের এ আন্দোলনের মূল রহস্য উদ্ঘাটন করে নজিবর রহমান মুসলিম স্বার্থ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে তার ‘বিলাতী বর্জ্জন রহস্য’ গ্রন্থ রচনা করেন। 
‘বিলাতী বর্জ্জন রহস্য’ সম্পর্কে নজিবর রহমানের জীবনী-লেখক তার স্নেহধন্য ছাত্র ও পরবর্তীতে জামাতা খন্দকার বশিরউদ্দিন বলেন : “তৎকালে বিলেতী কাপড়, বিলেতী লবণ এবং আরও অন্যান্য বিলেতী পণ্যদ্রব্য ব্যবহার না করার জন্যে হিন্দু কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ যে আন্দোলন চালাচ্ছিলেন তার ফলাফল নিয়েই তিনি ‘বিলাতী বর্জ্জন রহস্য’ নামক পুস্তিকাটি লিখেন। এ গ্রন্থের ভাষা ও বিষয়বস্তু এতই সত্য ও তীক্ষè যে, মুসলিম-বিদ্বেষী হিন্দুদের প্রাণে এর ফলে তীক্ষè শরের মত আঘাত করেছিল। সেই জন্যেই তারা এর বিরুদ্ধে প্রোপাগা-া চালিয়ে ইংরেজ সরকারের নিকট আবেদন করে এবং তৎকালীন ইংরেজ শাসনকর্তা কর্তৃক এটা বাজেয়াপ্ত হয়। এই পুস্তিকায় নজিবর রহমান ইংরেজ ও মুসলিম-বিদ্বেষী হিন্দুদের সম্বন্ধে অপ্রিয় অথচ উচিত ও সত্য কথা লিখেছেন। অপরদিকে মুসলিম সমাজে জাগরণ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এদেশের মুসলিম সমাজকেও ধিক্কার প্রদান করেছিলেন। এ পুস্তিকার এক স্থানে তিনি মুসলিম সমাজকে লক্ষ্য করে বলেছিলেনÑ যে নক্ষত্র ভূমিতলে হয় নিপতিত/তাহা হতে নিম্নে তুমি পড়েছ নিশ্চিত।” (খন্দকার মো. বশিরউদ্দিন : মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরতœ, এপ্রিল ১৯৮৭, পৃ. ৩৩-৩৪)।
সাহিত্য-প্রসঙ্গ এবং বিলাতী বর্জ্জন রহস্য বই দুটি প্রকাশের পরই তৎকালীন সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়, একথা আগে উল্লেখ করেছি। এর ফলে ঐ সময়কার রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের দ্বারা মুসলমানদের নিগ্রহ ভোগের পরিচয় ফুটে ওঠে। বই দু’টি বাজেয়াপ্ত হবার পর ‘উত্তরবঙ্গে মুসলমান সাহিত্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে হামেদ আলী লেখেন : “১. বিলাতী বর্জ্জন রহস্য, ২. সাহিত্য-প্রসঙ্গ। সলঙ্গা মাইনর স্কুলের হেড প-িত মুন্সী নজিবর রহমান প্রণীত। ভাষা সাধু বাঙ্গলা। বাঙ্গলা ভাষার প্রতি ইহার বেশ অনুরাগ আছে, ইনি আরও পুস্তক লিখিতেছেন।” 
নজিবর রহমান যখন উপরোক্ত গ্রন্থদু’টি রচনা করেন, ঐ সময় তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। সলঙ্গায় ‘আঞ্জুমানে ইসলাম’ সমিতি গঠন, অত্যাচারী হিন্দু জমিদার কর্তৃক মুসলিম প্রজা-পীড়ন রোধ, গো-কোরবানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার জন্য প্রতিবাদ সভার আয়োজন, ১৯০৬ সালে শাহবাগে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে যোগদান এবং সেখানে মুসলমানদের গরু কোরবানির ওপর অত্যাচারী হিন্দু জমিদারের নিষেধাজ্ঞা ও মুসলিম প্রজাপীড়নের বিষয় তুলে ধরা, বড় লাটের কাছে এ ব্যাপারে দরখাস্ত প্রেরণ এবং সরকার কর্তৃক গো-কোরবানি পুনঃপ্রবর্তন ইত্যাদি কাজে তখন তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। প্রজাপীড়ক অত্যাচারী হিন্দু জমিদারদের দ্বারা জীবননাশের ভয়ে এসময় তার আত্মগোপনে থাকা ইত্যাদি নানা ঘটনা ও আন্দোলন-সংগ্রামের দ্বারা বোঝা যায়, এ সময়টি তার জীবনের সর্বাধিক সংগ্রামমুখর এক কঠিন দুঃসময়। তার জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার বিষয় ও মুসলিম সমাজের দুরবস্থা ও তার প্রতিকার সম্পর্কে তিনি যে ঐ সময় গভীরভাবে চিন্তা করেছেন, তার প্রতিফলন ঘটেছে উপরোক্ত দু’টি প্রবন্ধ গ্রন্থে। তাই সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপস্থাপনা ও স্বসমাজের উন্নয়নে তার আন্তরিক প্রচেষ্টার বিষয় এ দু’টি গ্রন্থে ফুটে উঠেছে। এ কারণে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

স্মরণ হাসান হাফিজুর রহমান

স্মরণ হাসান হাফিজুর রহমান
আলী ফোরকান
জন্ম : ১৯৩২ সালের ১৪ জুন 
মৃত্যু : ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল  
বাংলা কবিতায় বাঁক পরিবর্তনে ও দেশাত্মবোধে যে কবি অনন্য ভ‚মিকা পালন করেছেন তার নাম হাসান হাফিজুর রহমান। সাহিত্যের সবদিকেই তার পদচারণা রয়েছে। তিনি একাধারে কবি, প্রবন্ধকার, সাংবাদিক ও কথাশিল্পী। তাঁর কবিতা যেমন সাধারণ মানুষের নিরাভরণ জীবনচেতনা সমস্ত প্রতিরোধের ক্লান্তির অবরোধ অন্ধকার অপসারিত করে তেমনি তার ছোটগল্প জীবনের মাধুর্য, বেদনাবোধ, মমত্বহীন দ্বিখÐিত সমাজের মুখোশ উন্মোচন করে। তাঁর সকল প্রকার লেখনি মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে উপস্থাপিত। বাক্য-বিন্যাস ও শব্দনৈপুণ্যতা অসম্ভব ক্ষমতাও তাঁর রচনার অনন্য বৈশিষ্ট্য।
হাসান হাফিজুর রহমান ১৯৩২ সালের ১৪ জুন জামালপুর শহরে (মাতুলালয়ে) জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস জামালপুর জেলার ইসলামপুর থানার কুলকান্দি গ্রামে। বাবার নাম আবদুর রহমান এবং মার নাম হাফিজা খাতুন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক। ১৯৫৮ সালের ১৭ এপ্রিল অবিভক্ত বাংলার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মফিজ উদ্দিন ফকিরের কন্যা সাঈদা হাসানের সঙ্গে হাসান হাফিজুর রহমান বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলের নাম হাসান সাঈদ দিশা, মেয়ের নাম এশা হাসান মুন্নী।
১৯৩৮ সালে ঢাকার নবকুমার স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে সরাসরি তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৩৯ সালে তার বাবা বরিশালে বদলি হয়ে গেলে তিন বছর জামালপুরের সিংজানী হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন তিনি। ১৯৪২ সালে তাঁর বাবা পুনরায় ঢাকায় বদলি হয়ে এলে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন এবং মাধ্যমিক পরীক্ষা পর্যন্ত এই স্কুলেই পড়াশোনা করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে দ্বিতীয় বিভাগে মাধ্যমিক পাস করেন এবং ১৯৪৮ সালে হাসান হাফিজুর রহমান ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এ বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বি.এ. অনার্স শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু অনার্স ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করে ১৯৫১ সালে তিনি পাস কোর্সে বিএ পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হন। ১৯৫৫ সালে তিনি বাংলায় এমএ পাস করেন। তিনি মেডিকেল কলেজেও ভর্তি হয়েছিলেন কিন্তু ডাক্তারি পড়া অসমাপ্ত রেখেই তিনি শিক্ষা বিভাগে চাকরি নেন। চাকরি জীবনের প্রায় পুরো সময় তিনি ঢাকা শহরেই অতিবাহিত করেন। এর মধ্যে তিনি ১৯৩৯-১৯৪২ সাল পর্যন্ত বরিশালে কর্মরত ছিলেন। 
১৯৪৬ সালে তিনি যখন সবেমাত্র মাধ্যমিক পাস করেছেন তখন তার ছোটগল্প ‘অশ্রæভেজা পথ চলাতে’ প্রকাশিত হয় ‘সওগাত’ পত্রিকায়। এর দুই বছর পর সোনার বাংলায় তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অবদান রাখেন। একুশের চেতনার ওপর ভিত্তি করে তার কবিতা অমর একুশে প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সালেই। এটিসহ আরো কিছু লেখা একত্র করে ১৯৫৩ সালে তিনি ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংকলন গ্রন্থ ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ প্রকাশ করেন। হাসান হাফিজুর রহমানের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকায়, ১৯৪৯ সালে। ১৯৫০ সালে ‘পূর্বাশা’য় তার কবিতা ‘যে কোনো সর্বহারার প্রার্থনা’ ছাপা হলে একজন তরুণকবি হিসেবে রাতারাতি আলোচিত হয়ে ওঠেন সাহিত্যাঙ্গনে। 
১৯৫৩ সালের জানুয়ারি মাসের শেষদিকে একুশে ফেব্রæয়ারি সংকলন প্রকাশিত হয় এবং তা বাজেয়াপ্ত হয়ে যায় ২০ ফেব্রæয়ারি সন্ধ্যায়। বাবার জমি বিক্রয়ের টাকা এনে একুশে ফেব্রæয়ারির প্রথম স্মরণিকা প্রকাশ করেছিলেন কবি হাসান হাফিজুর রহমান। প্রথম একুশে ফেব্রæয়ারি সংকলন সম্পাদনার ক্ষেত্রে হাসান হাফিজুর রহমানের ভ‚মিকা কতটা অগ্রণী ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় সংকলনের প্রকাশক ভাষা আন্দোলনের অন্যতম কর্মীপুরুষ মোহাম্মদ সুলতানের ভাষ্য থেকে :
তেপ্পান্ন সালের প্রথম দিকে হাসান প্রস্তাব দিল ৫২-ও উত্তাল ভাষা আন্দোলনের সময়ে আমাদের দেশের সুধী লেখক সমাজ কলমের আঁচড়ে যা লিপিবদ্ধ করেছেন, পুস্তকাকারে তা প্রকাশ করা যায় কিনা। আজকের দিনে অনেকেই ভাবতে পারেন, কাজটি কত সহজ। মুসলিম লীগের শাসন, চতুর্দিকে সা¤প্রদায়িকতার বিষবাষ্প, বামপন্থী মাত্রই রাষ্ট্রদ্রোহী, পূর্ব-পাকিস্তানি তরুণদের আর্থিক অসচ্ছলতা, সরকারের গণবিরোধী শাসনের স্টিমরোলার সব কিছুকে অস্বীকার করেই এমন একটি দুঃসাহসিক কাজ করতে হবে। আমরা যারা রাজনীতি করতাম, ৮ পয়সা থেকে ১২ পয়সা পেলে রাজভোগ খাওয়া হতো মনে করতাম। সেই সময়ে একুশে ফেব্রæয়ারি বইটা বের করতে সেই মুহূর্তেই ৫০০.০০ টাকার প্রয়োজন। আমার আর হাসানের হাতে ৫০ টাকাও নেই। সমাধান করে দিল হাসান। বাড়িতে গিয়ে জমি বেচে সে টাকা নিয়ে আসবে। যা ইচ্ছা, যা চিন্তা, হাসান তাই করল (রহমান ১৯৮৩ : ৬২-৬৩)
১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে নূরুল আমিনের রক্তচক্ষু, মুসলিম লীগের দুঃশাসন, সা¤প্রদায়িকতা; বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিরুদ্ধে কাতারবন্দি কায়েমী স্বার্থের সন্ত্রাস যখন চলমান, ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনীতির ক্ষেত্রে যে সচেতনতা সৃষ্টি হয় এই সচেতনতা ধরে রাখার প্রবল ইচ্ছার সৃষ্টি ‘একুশের সংকলন’ যা আজ এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল।
বাবার জমি নয় মায়ের সোনার গহনা বিক্রি করে নাকি একুশের সংকলন হয়েছে-এ রকম তথ্য আরো একজন লেখকের লেখায় পাওয়া যায়। মনি হায়দার লিখেছেন, ‘...সব লেখা প্রেসে। কম্পোজ চলছে। কিন্তু টাকা কোথায়? টাকা না হলে সংকলন প্রকাশ করবেন কীভাবে? তিনি ছুটলেন বাড়ি, জামালপুরে। মাকে বললেন তাঁর সমস্যা। মা পুত্রের হাতে তুলে দিলেন নিজের পঁয়ত্রিশ ভরি সোনার গহনা। পুত্র চলে এলেন ঢাকায়। বিক্রি করলেন মায়ের গহনা। দায় মিটল প্রেসের, কাগজ কেনা হলো। ছাপা হলো অমর একুশের অমর সংকলন “একুশে ফেব্রæয়ারি”। বাঙালি পা রাখল চেতনার নতুন এক মহীসোপানে। সেই সোপানের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা হাসান হাফিজুর রহমান। (সূত্র : একুশের চেতনার মশালবাহী হাসান হাফিজুর রহমান-প্রথম সোপান ‘একুশে ফেব্রæয়ারি’ ও লিটল ম্যাগাজিন, মনি হায়দার, দৈনিক ইত্তেফাক ২১ ফেব্রæয়ারি ২০১৪)
হাসান হাফিজুর রহমান সম্পর্কে বাংলাদেশের প্রখ্যাত গবেষক ড. আনিসুজ্জামান লিখেছেন, ‘একুশে ফেব্রæয়ারি’ হাসানের মহত্তম অবদানে বের হলো, প্রশংসিত হলো, বাজেয়াপ্ত হলো। আমরা উত্তেজিত হলাম। কিন্তু প্রেসের বাকি শোধ হলো না। এ নিয়ে হাসান খুব বিপদগ্রস্ত হলেন। অপমানিত হয়ে একদিন বাড়ি চলে গেলেন। হয় জমি নয় গুড় বিক্রি করে টাকা নিয়ে ফিরে এসে দায় থেকে উদ্ধার পেলেন।’
হাসান হাফিজুর রহমানের প্রতিভার যথাযথ মূল্যায়ন করেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট শাহ আহমদ রেজা তার ‘স্মৃতিতে অ¤øান : হাসান হাফিজুর রহমান’ লেখাতে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাকে (হাসান হাফিজুর রহমান) সম্মানের সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পের পরিচালক পদে নিযুক্তি দিয়েছিলেন। 
হাসান হাফিজুর রহমানের পেশাজীবন খুব বৈচিত্র্যময় ছিল। সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকায় ১৯৫২ সালে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর তিনি একাধারে সওগাত (১৯৫৩), ইত্তেহাদ (১৯৫৫-৫৪) ও দৈনিক পাকিস্তান (১৯৬৫) এ সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং স্বাধীনতার পর দৈনিক বাংলায় সম্পাদক মÐলীর সভাপতি নিযুক্ত হন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি ১৯৫৭-১৯৬৪ সাল পর্যন্ত জগন্নাথ কলেজে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। এছাড়াও তিনি ১৯৭৩ সালে মস্কোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেস কাউন্সিলর পদে দায়িত্ব পালন করেন।
হাসান হাফিজুর রহমানের রচনার মধ্যে বিমুখ প্রান্তর (১৯৬৩), আর্তশব্দাবলী (১৯৬৮), আধুনিক কবি ও কবিতা (১৯৬৫), মূল্যবোধের জন্যে (১৯৭০), অন্তিম শরের মতো (১৯৬৮), যখন উদ্যত সঙ্গীন (১৯৭২), শোকার্ত তরবারী (১৯৮২), প্রতিবিম্ব (১৯৭৬), আরো দুটি মৃত্যু (১৯৭০) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বাংলা ভাষায় হোমারের ওডিসি অনুবাদও করেছেন তিনি। হাসান হাফিজুর রহমান বেশি পরিচিত তার বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ১৬ খÐের দলিলপত্রের (১৯৮২-৮৩)। 
হাসান হাফিজুর রহমানের পাকিস্তান লেখক সংঘ পুরস্কার (১৯৬৭), আদমজী পুরস্কার (১৯৬৭), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭১), সুফি মোতাহার হোসেন স্মারক পুরস্কার (১৯৭৬), অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), সওগাত সাহিত্য পুরস্কার ও নাসিরুদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৮২), মরোণোত্তর একুশে পদক (১৯৮৪) ইত্যাদি সম্মাননা পেয়েছেন।
বাংলা কবিতায় বাঁক পরিবর্তনে হাসান হাফিজুর রহমানের অবদান অনস্বীকার্য। একুশের প্রথম সংকলন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থের সম্পাদনা তার অমর সৃষ্টি। দেশ ও জাতির কল্যাণে তার কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ সুস্পষ্ট নিদর্শন। অসাধারণ পাÐিত্য, সহজ সরল উদার মন তাকে প্রিয় করে তুলেছিল সবার কাছে। পঞ্চাশ দশকের দিগভ্রান্ত তরুণদেরকে একত্র করে, সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথের দিশাও দিয়েছিলেন তিনি। আমাদের কবিতার অন্তরের প্রতিবাদের আগুন আবিষ্কারের কাজটিও তারই। তার ‘আধুনিক কবি ও কবিতা’ (১৯৬৫) আমাদের কবিতার প্রথম মানচিত্র। তাই সাহিত্যাঙ্গনে তার অবদান অসামান্য। এই মহান কবি ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল মস্কো সেন্ট্রাল হসপিটালে মৃত্যুবরণ করেন।

Thursday, May 10, 2018

স্মরণ : আবুল মনসুর আহমদ

স্মরণ : আবুল মনসুর আহমদ
আলী ফোরকান
 জম্ম : ৩ সেপ্টেম্বর ১৮৯৮
মৃত্যু : ১৮ মার্চ ১৯৭৯
আবুল মনসুর আহমদ [৩ সেপ্টেম্বর ১৮৯৮ -১৮ মার্চ ১৯৭৯] বাংলা ব্যঙ্গ সাহিত্যের পথিকৃৎ। যদিও বাংলা ব্যঙ্গ সাহিত্য বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তেমনভাবে বেড়ে ওঠার পথ পায়নি। তবু বলা যায় আবুল মনসুর আহমদ, সৈয়দ মুজতবা আলী, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ প্রমুখ ব্যক্তিত্বের হাত ধরে বাংলা ব্যঙ্গ সাহিত্য বেশ কিছু দূর এগিয়েছে।
বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলাম আবুল মনসুর আহমদের ব্যঙ্গ সাহিত্যে আকণ্ঠ মুগ্ধ হয়েছেন। মুগ্ধ হয়ে তিনি সুচিন্তিতিত মন্তব্যও দিয়েছেন। বয়সে এঁরা ছিলেন একেবারেই সমসাময়িক। বন্ধুতাও ছিল গভীর। প্রিয় বন্ধুর লেখায় মুগ্ধ হয়ে কাজী নজরুল ইসলাম সুচিন্তিত মন্তব্য করতে কার্পণ্য করেন নি। তাঁর মতে, বাংলা ভাষার ব্যঙ্গ সাহিত্য খুব উন্নত হয় নি। তার কারণ, ব্যঙ্গ সাহিত্য সৃষ্টিতে অসাধারণ মেধার প্রয়োজন। এ যেন সেতারের কান মলে সুর বের করা। সুরও বেরুবে, তারও ছিঁড়বে না। আমি একবার এক ওস্তাদকে লাঠি দিয়ে স্বরোদ বাজাতে দেখেছিলুম। সেবার সেই ওস্তাদের হাত সাফাই দেখে আশ্চর্য হয়েছিলুম। আর আজ বন্ধু মনসুরের হাত সাফাই দেখে বিস্মিত হলুম। ভাষার কান-মলে রস সৃষ্টির ক্ষমতা মনসুরের অসাধারণ। এ যেন পাকা ওস্তাদী হাত।
আবুল মনসুরের ব্যঙ্গের একটি বৈশিষ্ট্য এইযে, সে ব্যঙ্গ যখন হাসায় তখন সে হয় ব্যঙ্গ কিন্তু কামড়ায় যখন তখন সে হয় সাপ। আর সে কামড় গিয়ে যার গায়ে বাজে তার ভাব হয় সাপের মুখের ব্যঙ্গেও মতই করুণ। 
আবুল মনসুর আহমদ প্রধানত গদ্যলেখক। কিছু ব্যঙ্গ কবিতা ছাড়া তাঁর সব গ্রন্থ গদ্যে রচিত। তাঁর এ-গদ্য যেমন সাবলিল তেমনি স্বাতন্ত্রমÐিত। সরস বিদ্রƒপাত্মক বাক্য ব্যবহারে তাঁর পারঙ্গমতার জুড়ি নেই। বিশেষত আরবি-ফারসি-ইংরেজি শব্দের সঙ্গে চাতুর্যপূর্ণ শব্দ ব্যবহারে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। ভাষার ঐশ্বর্যে যেমন তেমনি বিষয় কথকতার ঐশ্বর্যে তাঁর প্রায় প্রতিটি গ্রন্থই স্বাতন্ত্রমÐিত ও বিপুলাকায়। 
আবুল মনসুরের লেখায় নিজস্বতা রয়েছে। তাঁর অধিকাংশ লেখাই মৌলিক। এই লেখক সম্পর্কে ড. আনিসুজ্জামানের মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, আবুল মনসুর আহমদের এসব রচনায় বিশেষ করে হুজুরকেবলার মত গল্পে পরশুরামের প্রভাব লক্ষ করা যায়। কিন্তু পরশুরামে যতটা রহস্য আছে ততটা বিষাদ নেই। আবুল মনসুর আহমদের সব গল্পেই আমাদের সংকীর্ণতা, শঠতা, অজ্ঞতা, অন্ধতা নিয়ে ব্যঙ্গের সঙ্গে দুঃখবোধ জড়িত। পরশুরাম ছবি এঁকেছেন, সমাজের সংস্কার তার লক্ষ ছিল না। আবুল মনসুর আহমদ সমাজের সংস্কার চেয়েছেন। সংস্কারের ক্ষেত্রগুলো দেখিয়ে দিয়েছেন তার গল্পে। এই উদ্দেশ্যমূলকতা যে শিল্পকে ছাড়িয়ে যায়নি, এটা তার একটা বড় গুণ। অধিকাংশ গল্পে তিনি বাঙালি মুসলমান সমাজের একেবারে ভেতরের কথা তুলে ধরেছেন। সেখানে আরবি-ফারসি শব্দবহুল ভাষা ব্যবহার করেছেন। রঙ্গ-ব্যঙ্গ রচনার জন্য আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার নতুন নয়। এখানেও তার একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তিনি ক্ষেত্রবিশেষে এমন সব আরবি- ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন কিংবা সে গুলোর এমন জোট বেঁধেছেন যে, অনেক সময় ওসব ভাষায় অজ্ঞ পাঠকের কাছে তার অর্থ অন্ধকারেই থেকে যায়। ধারণা করা যায়, এ সব ক্ষেত্রে অর্থ বোঝানোর উদ্দেশ্য তার ছিল না। যাদের উদ্দেশে ও সব শব্দ তার চরিত্রেরা প্রয়োগ করেছে গল্পে তারা অর্থ বুঝছে না কিন্তু তাদের পরম শ্রদ্ধেয় এ সব ভাষার শব্দ ও বাকভঙ্গি ক্রমাগত তাদেও শ্রদ্ধার উদ্রেক করছে। তারা যত কম বুঝছে, ততই সম্মোহিত হচ্ছে। এই সম্মোহন যে একটা সামাজিক ব্যাধি, লেখক সেটাই বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন।
সাহিত্য বিশ্লেষক শ্রীশচন্দ্র দাশ বলেন, বাস্তবপন্থী সাহিত্যিক অধিকাংশ সময় স্থানীয় পটভূমি বা যুগমানসের নিখুঁত চিত্রাঙ্কণের সাহায্যে সমসাময়িক ঘটনা বা কাহিনির অবতারনায়, অতি সাধারণ নরনারীর পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপায়ণে, বৈজ্ঞানিক বা বাণিজ্যিক সভ্যতায় পরিপুষ্ট শব্দসম্ভার গ্রহণেও সাধারণ, এমনকি প্রাকৃত- জনসুলভ ভাষা অনুকরণে তারা সাহিত্যকম্যের বিচিত্র রূপ সৃষ্টি করেন। বলাবাহুল্য সাহিত্যিক হিসেবে আবুল মনসুর আহমদও সারা জীবন এই প্রচেষ্টায় রত ছিলেন।
আবুল মনসুর আহমদের অন্যতম একটি বিখ্যাত গল্পগ্রন্থ ‘আয়না’। এই গ্রন্থের সাতটি গ্রন্থই ব্যঙ্গ-রসাত্মক। গল্পগুলো হুযুর কেবলা, গো- দেওতা কা দেশ, নায়েবে নবি, লীডারে কওম, মুজাহেদীন, বিদ্রোহী সংঘ ও ধর্মরাজ্য। আয়নার হুযুর কেবলায় রয়েছে একজন ভÐ পীরের কাহিনি। স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থের জন্য জঘন্য ভÐামীর আশ্রয় নেয় সে। গ্রামের মূর্খ সহজ-সরল মানুষগুলোকে বোকা বানিয়ে সে তার লক্ষে পৌঁছে। এই ভÐ পীর এক মুরিদের যুবতী স্ত্রীর রূপে আকৃষ্ট হয়, ক্রমেই আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। অবশেষে সে ছলনার আশ্রয় নিয়ে চক্রান্তপূর্বক ¯বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভেঙে এই যুবতী নারীকে বিয়ে করে। অথচ ইতোপূর্বে তার তিন-তিনটি স্ত্রী ছিল। কিšত ু তার এ ভÐামী ধরা পড়ে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত যুবক এমদাদের কাছে। উত্তেজনায় সে পীরকে শারীরিক আত্রমণ করে বসে। কিন্তু সুস্থ বুদ্ধির এমদাদকে পীর পাগল বলে আখ্যা দেয়। এভাবে লেখক হুযুর কেবলার চারিত্রিক কলুষতা আয়নার মত করেই পাঠকের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।
গো-দেও-তা কাদেশ গল্পে লেখক হিন্দু ধর্মের অন্ধকার দিকগুলো পরিচ্ছন্ন ফুটিয়ে তুলেছেন। গো হত্যার কুফল বলতে যে প্রথা প্রচলিত রয়েছে; তাতে তিনি প্রবল ধাক্কা দিয়েছেন। হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষ ছড়াতে ইংরেজরা যে কৌশল অবলম্বন করেছিল তারও যৎকিঞ্চিত পরিচয় পাওয়া যায় এ গল্পে। হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা এ গল্পের প্রধান উপজীব্য বিষয়।
ধর্মরাজ্য গল্পের বিষয়বস্তুও একই। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার ভয়াবহ চিত্র আর ইংরেজদের কূটকৌশলের চিত্র তুলে ধরেছেন এ গল্পে। 
এভাবে আবুল মনসুর আহমদ সমাজের বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্ণিত করে গল্পের মাধ্যমে, ব্যঙ্গ-বিদ্রæপের ছলে সমাজের মানুষগুলোকে জাগাতে চেয়েছেন। মানুষের সুকুমার বৃত্তিগুলোর চরম অবদমন দেখে তিনি নিশ্চুপ বসে থাকতে পারেননি। মশি শক্তির সাহায্যে তিনি এদেরকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন, সচেতন করতে চেয়েছেন। এ জন্যেই এই লেখক বাংলা সাহিত্যে বেঁচে থাকবেন চিরদিন।

স্মরণ : ওবায়দুল হক সরকার নাট্যকার

স্মরণ : ওবায়দুল হক সরকার নাট্যকার, অভিনেতা ও সংস্কৃতি সংগঠক
আলী ফোরকান
জন্ম : ২১শে অক্টোবর, ১৯৩০
মৃত্যু : ২০০৫ সালের ৬ই নভেম্বর 
জন্ম ২১শে অক্টোবর, ১৯৩০। পিতার নাম আলি হুসেন সরকার। পিতা ছিলেন পুলিশ অফিসার। কর্মসূত্রে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া, হুগলি, বাঁকুড়া, বিরভূম, নদিয়া প্রভৃতি জেলার বিভিন্ন স্থানে চাকরি করতে হয়েছে। স্বভাতই ওবায়দুল হক সরকারকেও বাল্যজীবন ও কিশোর জীবনেও বিচরণ করতে হয়েছে এখানে সেখানে। তখন থেকেই তিনি বিভিন্ন স্থানের, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের, বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের অধিবাসীদের বিচিত্র জীবন সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন।
ওবায়দুল হক সরকার বাংলাদেশের থিয়েটার ও ফিল্মস্টারদের মধ্যে অন্যতম। ছাত্রজীবন থেকেই অভিনয় নেশায় জড়িয়ে পড়েন।
পরবর্তীতে সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংস্কৃতিক অঙ্গনে ছিলো অবাধ বিচরণ। বিশুদ্ধ ও মূলধারার সংস্কৃতি চর্চায় ছিলেন নিবেদিত। মঞ্চ, রেডিও, টিভি এবং ফিল্মে সর্বত্রই তিনি কাজ করেছেন। নিষ্কলুষ চরিত্র, কাজের প্রতি অনুরাগ, প্রবল দায়িত্বানুভূতি, মৌলিক চিন্তা চেতনায় ঋদ্ধ, দেশিয় ইতিহাস ঐতিহ্যের অনুরাগী, মানুষ ও মাবতার প্রতি একনিষ্ঠ ভালোবাসা ছিলো এই গর্বিত মানুষটির চিন্তা ও কর্মজগতের বৈশিষ্ট্য। 
ঔপনিবেশিক আমলে বাংলাদেশের মূলধারার সংস্কৃতি ছিলো গৃহকোণে বন্দি। ফিরিঙিদের অমানুষিকতায় ভূমিজপুত্ররা হয়ে পড়ে ছন্নছাড়া। আমাদের পূর্বপুরুষদের ওপর শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতিসহ সকল ক্ষেত্রে ইংরেজ ও বর্ণহিন্দু স¤প্রদায় মিলেমিশে আঘাত হানে। দুশ বছরের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে মুসলমানরাই ছিলো সামনের সারিতে। এদেশের প্রতি ইঞ্চি মাটির সাথে মিশে আছে ইমানদারদের রক্ত ও শ্রম। আর নেটিভ স¤প্রদায় ছিলো ইংরেজ সরকারের সহায়ক শক্তি। দুই স¤প্রদায় মিলে মুসলমানদের কৃষ্টি কালচার তাহযিব তামাদ্দুনকে ধূলিস্যাত করে দেয়। 
বিশ শতকের গোড়ার দিকে নবাব সলিমুল্লাহ, নওয়াব আলি এবং শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের আবির্ভাব এবং মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় দুর্বিষহ পরিস্থিতির কিছুটা অবসান ঘটে। একই সাথে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও স্ফূরণ ঘটে। সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজি, কাজী নজরুল ইসলাম, কবি গোলাম মোস্তফার কলম এবং আব্বাস উদ্দিনের কণ্ঠধ্বনিতে মূলধারার সংস্কৃতি ঝলমলিয়ে ওঠে। মাওলানা আকরম খাঁ, মুজিবুর রহমান খাঁ, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, কে মল্লিক, খাজা নসরুল্লাহ, কাজি জালাল উদ্দিন, খাজা আজমল, নাজির আহমদ, ওবায়েদ-উল-হক, ইসমাইল মোহাম্মদ, আবুল হাশিম, আবুল মনসুর আহমদ, এয়াকুব আলি চৌধুরী, বন্দে আলি মিয়া ছিলো এ পথেরই সহযাত্রী। পরবর্তীতে ফররুখ আহমদ, ড. এম আকবর আলি, ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইন, খান আতাউর রহমান, ফতেহ লোহানি, মোহাম্মদ মোদাব্বের, বেনজির আহমদ এ ধারাটি সমৃদ্ধ করেন। আরও পরে আসেন ড. আসকার ইবনে শাইখ, অধ্যাপক শাহেদ আলী, অধ্যক্ষ দেওয়ান আলী আজরফ, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ আলী আশরাফ, ওবায়দুল হক সরকার, আরিফুল হক, রফিকুজ্জামান চৌধুরী, আল মাহমুদ, কবি মতিউর রহমান মল্লিক, সৈয়দ আশরাফ আলী, অধ্যাপক ড. এস. এম. লুৎফর রহমান, শফীউদ্দিন সরদার প্রমুখ।
সৃজনশীল, সুস্থ, পরিচ্ছন্ন সংস্কৃতি সৃষ্টিতে মুখর এ নাট্যকারের নাট্যজীবন। শেকড়ের পিছনে ছুটছেন অবিরত। শেকড় অনুসন্ধানে গিয়ে উপমহাদেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আখ্যান-উপখ্যান, আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক উত্থানপতন, নেটিভদের বিশ্বাসঘাতকতা, কৃতিত্ব হরণের চালচিত্র তাঁকে ব্যথিত করে তোলে। ওবায়দুল হক সরকারের সাংস্কৃতিক চেতনা সম্পর্কে অবহিত হওয়া যাবে তাঁর ‘জাতীয় সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম’ গ্রন্থের ভূমিকায় প্রদত্ত বক্তব্য থেকে। তিনি লিখেছেন, ‘প্রবাদ আছে- ‘‘একটা জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তার সংস্কৃতিকে আগে ধ্বংস কর’’। সাংস্কৃতিক বশ্যতা রাজনৈতিক বশ্যতার সূচনা করে।
জীবন প্রবাহের কোনো একসময় তিনি নাস্তিকতা, কমিউনিজম, সোসালিজম দ্বারা আচ্ছন্ন হয়েছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে চিন্তাজগতে সৃজিত হয় আলোর বিচ্ছুরণ। এ সম্পর্কে নিজেই লিখেছেন: ‘মক্কা ছেড়ে আমিও কোনকালে মস্কো ধরেছিলাম। তথাকথিত প্রগতির মোহে দুর্গতির শিকার হয়েছিলাম। সময়মত ইসলামি মূল্যবোধের দুর্গে আশ্রয় নেওয়ায় আর দুর্গতি আমাকে নি:শেষ করতে পারেনি।’ তিনি আরও বলেছেন, আল্লাহ মানুষকে চোখ দিয়েছেন সুন্দর জিনিস বা বস্তু দেখার জন্য, কান দিয়েছেন ভালো কিছু শোনার জন্য আর মুখ দিয়েছেন ভালোকথা বলার জন্য।’ তাঁর জীবন সঙ্গীনি রোকেয়া সরকার জীবনের অন্তিম দিনগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে: ‘সরকার সাহেব যেমন নাটক আর চলচ্চিত্র করতে ভালোবাসতেন তেমনি তাঁর প্রিয় আর একটি বিষয় ছিলো লেখা। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার লেখনি বৃদ্ধি পেতে থাকল। পাগলের মত টেবিলে বসে লিখতেন। তাঁর সেসব লেখা আজ আমাকে হতবাক করে দেয়। যখন লিখত তখন ভুল করেও ভাবিনি কত মূল্যবান ও তথ্যবহুল ছিলো সেসব লেখা যা আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে রইবে। ----- বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কর্মকাÐে তাঁর অবদান কতটুকু সেই বিচারের ভার আপনাদের উপর রইল। কিন্তু একটা কথা সত্যি- এ অভিযোগ বিহীন মানুষটি কারোর ওপর কোনো অভিযোগ রেখে যাননি। শুধু নিজেদের শেকড়টাকে শক্ত করে ধরে রাখার অনুরোধ করে গেছেন।’(সাহিত্য ত্রৈমাসিক প্রেক্ষণ, অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০০৫, খন্দকার আবদুল মোমেন সম্পাদিত, মোহাম্মাদপুর ঢাকা)
গণমাধ্যমের স্ববিরোধীতা, জাতিকে শেকড়শূূণ্য করার প্রচেষ্টা, জাতিসত্তা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বিরোধী অবস্থান ও প্রচারণার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এ বরেণ্য নাট্যকার। সূ²ভাবে, স্থূলভাবে, কুটকৌশলে ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস ও চিন্তা চেতনায় আঘাত হানে। নাটক,, চলচ্চিত্র, মঞ্চ ও প্রচার মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের মতাদর্শ আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। মরহুম সরকার একা কলম হাতে এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। যিনি শুধু একজন ব্যক্তি ছিলেন না, ছিলেন একটি ইনস্টিটিউশন। বাংলাদেশে নাট্য আন্দোলনে ইতিহাস, বাংলাদেশকে ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র এবং জাতীয় সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম গ্রন্থসমূহ স্টাডি করলে যে কোনো নাগরিক শিহরিত হতে বাধ্য। সংস্কৃতির জগতের অতীত বর্তমান অবস্থান, আমাদের শত্রুমিত্র, আমাদের করণীয় ঠিক করতে অবশ্যই মরহুম ওবায়দুল হক সরকারের চিন্তাচেতনার সাথে একাত্ম হতে হবে।
ওবায়দুল হক সরকার বাঁকুড়া জিলা স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। ম্যাট্টিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন বিরভূম জিলা স্কুল থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন। ১৯৪৭ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন কিন্তু আইএ পাশ করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে ভর্তি হন। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। ১৯৫৪ সালে সম্মান এবং ১৯৫৫ সালে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। 
১৯৫৫ সালে এমএ পাশ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হোমিও ইকনমিক সার্ভে বোর্ডে কয়েক মাস চাকরি করেন। অত:পর পাকিস্তান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি নিয়ে ১৯৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে করাচি চলে যান। ১৯৬১ সালে জানুয়ারি মাসে চন্দ্রঘোনা কর্ণফুলি পেপার মিলে লেবার অফিসার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬২ সালের জুন মাসে ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান সড়ক পরিবহন সংস্থার পাবলিক রিলেশন অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৫ সালের মার্চ মাসে লাহোর পিটাকে যোগ দেন। কেন্দ্রীয় পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সুপারিশক্রমে তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের ঢাকা অফিসে গবেষণা অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮৯ সালের ০২রা ডিসেম্বর উপ-প্রধান তথ্য অফিসার হিসেবে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
মঞ্চ, বেতার, টেলিভিশন এ তিন মাধ্যমেই ছিলো তাঁর সরব উপস্থিতি। চলচ্চিত্র ও নাটকের সাথে ছিলেন জীবনের দীর্ঘ সময়। ১৯৪৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া শহরে প্রথম অভিনয়ের শুরু করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীনের পূর্ব পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে নাটক করেন। ১৯৪৭ সালে কুমিল্লার ‘দি গ্রেট জার্নাল’ এ যোগ দেন। ১৯৪৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়ও নাটক করেন।
১৯৫০ সালে ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনিই বাংলাদেশে প্রথম নারীপুরুষের যৌথ নাট্যাভিনয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৫৬ সাল থেকে নাটক পরিচালনায় হাত দেন। কয়েকশত নাটক পরিচালনা করেন। করাচিতেও বহু নাটক পরিচালনা করেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকায় বঙ্গরূপ নাট্য একাডেমির অধ্যক্ষ হন। শতাধিক সংগঠনের নাটক পরিচালনা করেন। সহস্রাধিক নাটকের শিষ্য তার আছে। ১৯৫০ সাল থেকে ঢাকা বেতারে নাট্যশিল্পী তালিকাভুক্ত হন। ১৯৬৪ সালে প্রযোজক হলেন। কয়েকশত নাটক বেতারে করেছেন।
১৯৬৬ সাল থেকে টেলিভিশনে অভিনয় শুরু করেন। জীবনে বহু সাপ্তাহিক ও ধারাবাহিক নাটক করেছেন। শুকতারা, আনোয়ারা, সুবর্ণ সময় ইত্যাদি ধারাবাহিক উল্লেখযোগ্য। এছাড়া প্রায় ৮৯ টি মুক্তিপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবিতে অভিনয় করেছেন। জাতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের উন্নয়ন এবং সুষ্ঠ বিনোদন চর্চায় তিনি যথেষ্ট অবদান রেখেছেন। স্ত্রী এবং তিন কন্যা রেখে ২০০৫ সালের ৬ই নভেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

স্মরণ : কবি ও নেতা মাও সেতুং

স্মরণ : কবি ও নেতা মাও সেতুং 
আলী ফোরকান
জন্ম : ১৮৯৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর 
মৃত্যু : ১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর 
কিছু কিছু জন্ম এমনভাবে সার্থক হয়ে ওঠে যা তার মৃত্যুকে ছাপিয়ে তার ব্যাপ্তিকে পৌঁছে দেয় এক অনন্য উচ্চতার শিখরে। ঠিক তেমনই একজন নেতা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা এবং গণ চীনের বিপ্লবী পুরুষ, মার্কসবাদী তাত্তি¡ক ও রাজনৈতিক নেতা কমরেড মাও সেতুং। জন্ম ১৮৯৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর। চীনের হুনান প্রদেশের শাওশান গ্রামের এক সচ্ছল কৃষক পরিবারে জন্ম নিয়ে আলোকিত করেছিল পরিবারটিকে। বাবা ছিলেন কনফুসিয়াসপন্থি এবং মা ছিলেন বৌদ্ধ পরিবারের। সে কারনে ছেলেবেলায় দুটি ভিন্ন মতে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন মাও সেতুং। ১৯১১ সালের হুনান প্রদেশের রাজধানীর চাঙশায় টির্চাস কলেজে ভর্তি হন মাও সেতুং। এখানেই তাঁর প্রথম পরিচয় হয় পাশ্চাত্য দর্শনের সাথে। তখন গোটা চীন জুড়ে চলছিল কিঙ রাজতন্ত্রের দুঃশাসন। মানুষ ফুসে উঠেছিল জাতীয়তাবাদীদের তীব্র গনআন্দোলনে। তখন জাতীয়তাবাদীদের আদর্শিক নেতা ছিলেন সান ইয়াত সেন । তিনি রাজতন্ত্র ভেঙ্গে গঠন করতে চান প্রজাতন্ত্র। মায়ের অনুপ্রেরণায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে মাও সেতুং যোগ দিলেন প্রজাতন্ত্রের সৈন্যবিভাগে। রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনে জয়ী হলেন সান ইয়াত সেন এবং তাঁর আদর্শিক দল। গঠন হলো কউমিঙটাঙ নামক জাতীয়তাবাদী দল এবং দলের প্রধান হলেন সান ইয়াত সেন।
১৯১৮ সালে হুনান টির্চাস কলেজে থেকে পাস করে মাও সেতুং পাড়ি জমান বেজিংয়ে। অনেক চেষ্টায় কাজ জুটল বেজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে। কাজের অবসরে তিনি পাঠ করতে লাগলেন সভ্যতার বিস্ময়কর এক তত্ত¡: মাকর্সবাদ। বুঝতে পারলেন মায়ের বুদ্ধমতবাদ আর বাবার কনফুসিয়বাদ চীনের সামাজিক সমস্যা সমাধানে অক্ষম। এসব বালখিল্য দর্শন চীনকে পিছিয়ে রেখেছে আজন্ম। চীনের প্রয়োজন পাশ্চাত্যের আদলে প্রবল আধুনিকায়ন। খাতা কলম নিয়ে নড়েচড়ে বসলেন মাও সেতুং। একটার পর একটা ঐতিহ্যবিরোধী লেখা লিখে আলোচীত হয়ে উঠলেন চীনের আপামর মানুষের কাছে। বিভিন্ন বিষয়ে কবিতা লিখেছেন।
১৯২০ সালে মাও সেতুং চাঙশায় ফিরে এসে হুনান প্রদেশে গনতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য উদ্যোগী হলেন এবং পরে তা র্ব্যথ হয়। এর পর ১৯২১ সালে সাঙহাই এসে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির গোপন বৈঠকে যোগ দেন তিনি। তারপর হুনানে এসে কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক শাখা খুললেন। কিভাবে ধর্মঘট করতে হয়, কিভাবে নিজেদের অধিকার আদায় করতে হয় চীনের শ্রমিকদের শেখালেন মাও সেতুং। 
১৯২৫ সালে নিজগ্রাম শাওশানে কৃষক সংগঠন গড়ে তোলেন এবং ১৯২৭ সালে কৃষক আন্দোলন নিয়ে লিখলেন বিপ্লবি বইপত্র। তিনি বলতে চাইলেন, কৃষকরাই হচ্ছে দেশের প্রধান চালিকাশক্তি শ্রমিকরা নয়। এ ছিল চরম মার্কসবাদবিরোধী বক্তব্য। তার সে লেখায় নিজের দলে হইচই পড়ে গেল। চীনের প্রদেশে প্রদেশে চাউর হতে লাগল তাঁর নতুন আদর্শনীতি। দলে দলে লোক এই আর্দশ গ্রহণ করতে লাগল। চীনে হঠাৎই একটা মোড় পরির্বতন চলে আসল। শত বছরের ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হলেন বিপ্লবি কমরেড মাও সেতুং। তিনি হুনান প্রদেশের কৃষকদের নিয়ে সৈন্যবাহিনী গঠন করলেন। এই বাহিনী নিয়ে তিনি সশস্ত্র আন্দোলনের পথে ঝাপিয়ে পড়লেন এবং আরেকবার ঘুরিয়ে দিতে চাইলেন চীনের ইতিহাসের চাকা। কিন্তু সে আন্দোলন আলোর মুখ দেখেনি, চরমভাবে পরাজিত হলেন মাও সেতুং।
মাও সবচে বেশী নজর দিতে লাগলেন কৃষকের দিকে। কারন মোট কৃষকের তুলনায় চাষের জমি খুবই কম ,যার কারনে চীনে দুর্ভিক্ষ লেগেই থাকত। কৃষকদের বোঝানো হল জাতীয়তাবাদী দল বা গুওমিংতান দের হটালে আমরা সুখী এক দেশ গড়তে পারব। বিপ্লবী অনুশারীদের নিয়ে ঠাংসা থেকে শুরু করলেন লং মার্চ। গানসু গিয়ে যাত্রাবিরোতি দিয়ে ফিরে গেলেন বেইজিং। হতদরিদ্রদের সাহায্যে তার লং মার্চ সফল হল। মাও তার সমাজতান্ত্রিক বিষয় জনগণকে মেনে চলার পরামর্শ দিলেন কিন্তু জনগণ থেকে তেমন সাড়া পেলেন না। তখন তৃতীয় স্ত্রী জিয়াং ছিং হাতে ক্ষমতা তুলে নিয়ে সমাজতান্ত্রিক সফলতা আনতে তার চার সঙ্গিকে নিয়ে বুড়ো মাওকে বোঝাতে পারলেন যে শিক্ষিত আর পয়সাকড়িওলারাই হচ্ছে সমাজের প্রধান শত্রæ।
বর্ণাঢ্য জীবনের শেষ ভাগে এসে মাও সে তুং বেশ দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পডলেন। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা এবং গণ চীনের এই অবিসংবাদিত মহান নেতা ১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরন করেন। মাওয়ের ইচ্ছা ছিল তিনিসহ তার দলের সব কেন্দ্রীয় নেতার মৃত্যুর পর তাদের দেহ যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়। পরবর্তীতে তার সমাধিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ‘মাও সেতুং স্মৃতিসৌধ’। চীন বিপ্লবের মার্কস্বাদী তাত্তি¡ক ও রাজনৈতিক নেতা এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং গণ চীনের অবিসংবাদিত মহান নেতা কবি মাও সেতুং অমর হয়ে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে।

স্মরণ : ভাষা সংগ্রামী অজিত কুমার গুহ

স্মরণ : ভাষা সংগ্রামী অজিত কুমার গুহ
আলী ফোরকান
জন্ম  : ১৯১৪ সালের ১৫ এপ্রিল (১ বৈশাখ, ১৩২১ বাংলা) 
মৃত্যু : ১৯৬৯ সালের ১২ নভেম্বর
অজিত কুমার গুহ ১৯১৪ সালের ১৫ এপ্রিল (১ বৈশাখ, ১৩২১ বাংলা) সুপারী বাগানে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা নৃপেন্দ্র মোহন গুহ ও পিতামহ মনীন্দ্র মোহন গুহ। ১৯৪৯ সালে সরকারের রোসানলে পতিত হয়ে প্রথম বারের মত কারাবরণ করেন তিনি । ভাষা আন্দোলনের একজন বলিষ্ঠ সংগঠক অজিত কুমার গুহ ১৯৫২ সালে আবার গ্রেফতার হন। প্রগতিশীল ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর তিনি ছিলেন প্রেরণা দাতা। 
একজন লেখক হিসেবে তিনি সর্ব মহলে সমধিক পরিচিত। পত্র-পত্রিকায় তিনি নিয়মিত নিবন্ধ লিখতেন। সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত।
ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে বিশেষ অবদানের জন্য অধ্যাপক অজিত কুমার গুহকে ভাষা আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ‘ভাষা সৈনিক সম্মাননা পদক’ ও ভাষা আন্দোলনের স্থপতি সংগঠন তমুদ্দন মজলিস ‘মাতৃভাষা পদক-২০০৪’ প্রদান করে। ১৯৬৯ সালের ১২ নভেম্বর তিনি মৃত্যু বরণ করেন।