স্মৃতির আঁধারে কয়েকজন শহীদ সাংবাদিক
আলী ফোরকান
শেখ বেলাল উদ্দিন- সাংবাদিকতা পেশাকে বেছে নিয়েছিলেন প্রায় দেড় যুগ আগে। মানব কল্যাণের সংগ্রামে নিবেদিত তার ক্লান্তিহীন জনমুখী চর্চা ছিল তার মূল প্রেরণা। খুলনার সাংবাদিক জগতের উদীয়মান নক্ষত্র, সততা এবং কর্তব্যে নিষ্ঠাবান এক কলম সৈনিক। সদালাপী মিষ্টভাষী, সকলের সাথেই ছিল তার হৃদতা সম্পর্ক। সেই বহুল উচ্চারিত সংলাপের যেন, তারই জন্য লেখাÑ‘তিনি এলেন, জয় করলেন’ এবং Ñচলে গেলেন’। ২০০৫ সালের ১১ ফেব্রয়ারী তিনি শাহাদত বরণ করেন । আজ ১১ ফেব্র“য়ারী তাঁর দ্বিতীয় শাহাদত বার্ষিকী। ১৯৫৭ সালের ৩ ডিসেম্বর খুলনার রায়ের মহলে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম । পিতার নাম শেখ মোদাচ্ছের ও মাতা মন্নুজান নেসা । শেখ বেলাল উদ্দীন ৪ভাই ৫ বোনের মধ্যে সবার বড়। তিনি ১৯৭২ সালে খুলনা জিলা স্কুল থেকে এসএসসি ও পরে বিএলবিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স পাশ করেন। দৈনিক সংগ্রামের খুলনা প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৮৮ সালে সাংবাদিকতা পেশার সাথে জড়িত হন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি তুখোড় ছাত্র নেতা এবং সু-বক্তা। ক্রীড়া ক্ষেত্রে ও ছিল বেশ পারদর্শী। তিনি কয়েকবারই খুলনা প্রেসক্লাবের নির্বাহী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া দু’দুবার মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন খুলনার সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি নির্বাচিত হন। শহীদ বরণের আগপর্যন্ত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরু দায়িত্বে অধিষ্ট ছিলেন। শেখ বেলাল উদ্দিন বারবার একটি শিক্ষাই দিতে চেয়েছেন তাহলো সাংবাদিকতা মানুষের অন্তরকে বিশোধিত করে। মানুষকে সত্য এবং সুন্দরের পথে নিয়ে যাওয়ার এটি বিশ্বস্ত মাধ্যম। তিনি নিজে শহীদ হওয়ার আগ পর্যন্ত সত্য এবং সুন্দরের সাধনা করেছেন একারণেই যে, সাংবাদিকতা করতে হলে বিশ্বাসের সঙ্গে জীনাচরণের গভীর যোগসূত্র থাকা চাই। শেখ বেলাল উদ্দিন সেই মানুষ যিনি শাহাদতবরণ পর্যন্ত বিশ্বাসে অবিচল থেকেছেন, নীতির ক্ষেত্রে থেকেছেন অবিচ্যুত। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বঞ্চিত নিপীড়িত মানুষের জন্য অকাতরে কাজ করে গেছেন। ফলশ্র“তিতে তিনি কর্মজীবনের স্বল্প সময়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হন। শেখ বেলাল উদ্দিন ছিলেন সংগঠক ও আপসহীন এক অকুতোভয় কলমযোদ্ধা। তার চিন্তা-চেতনায়,ধ্যানজ্ঞানে বঞ্চিত, র্নিযাতিত, নিপীড়িত গণমানুষ। গণমানুষের কথাই ফুটে ওঠেছে তার বিভিন্ন কর্মে ও লেখনীতে। ২০০৫ সালের ৫ ফেব্র“য়ারী খুলনা প্রেসক্লাবে বিস্ফোরিত বোমায় মারাত্মক জখম হয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১১ ফেব্র“য়ারী শাহাদতবরণ করেন। গত এক দশকে সম্পাদক, সাংবাদিকসহ ১৬ জন নিষ্ঠুর-র্নিমমভাবে খুন হন। প্রত্যেক মামলা থেকে খুনীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। স¤প্রতি ৪ টি সাংবাদিক হত্যা মামলার রায়ে এ অঞ্চলের সাংবাদিকরা কিংকর্তব্য বিমূঢ়। ২০০৬ সালের ৭ ফেব্র“য়ারী খুলনার দৈনিক পূর্বাঞ্চলের সাংবাদিক হারুন-অর-রশিদ খোকন হত্যা মামলায় সকল আসামী বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। একই বছর ১৬ ফেব্র“য়ারী ঝিনাইদহের ‘বীর দর্পন’ সম্পাদক মীর ইলিয়াছসহ জোড়া হত্যা মামলায় সকল আসামী বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। এর আগে ২০০৫ সালের ২৪ জুলাই খুলনার দৈনিক অর্নিবাণের সাংবাদিক শুকুর হত্যা মামলায় ও সকল আসামী বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর খুলনার দৈনিক অর্নিবাণের অপর সাংবাদিক নহর আলী হত্যা মামলায় ও সব আসামী বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। প্রতিটি হত্যা মামলার রায়ে বিজ্ঞ বিচারকগণ তাদের রায়ে উল্লেখ করেন যে, “চাঞ্চল্যকর এসব হত্যা মামলাগুলোয় পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে সুনিদিষ্টভাবে কাউকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়নি”। ‘ফলে সকল আসামীকে বেকসুর খালাস প্রদান করা হলো’। দক্ষিণাঞ্চলের সাংবাদিক হত্যাকান্ড গুলো চাঞ্চল্যকর হিসেবে চিহ্নিত হলেও সাংবাদিকহত্যা মামলার সুষ্ঠ্য বিচার হয়েছে এমন নজির সৃষ্টি হচ্ছেনা। প্রতিটি সাংবাদিক হত্যা ও হত্যা প্র”েষ্টার পিছনে সমাজবিরোধী প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠীর ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও সাংবাদিক হত্যা মামলাগুলোর তদন্তের গতিকে সেদিকে ধাবিত হতে দেখা যাচ্ছেনা। উল্লেখ্য যে, আমাদের দেশে হত্যা বা যেকোনো অপরাধ বিষয়ক মামলার অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো সাক্ষ্য প্রমাণ হাজির করতে না পারা। সাক্ষীর অভাবে অনেক অপরাধী অপরাধ করেও মাননীয় আদালত থেকে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা অভাববোধের কারণে অনেক প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলায় সাক্ষী দিতে আগ্রহী হয়না। সাক্ষী না দেয়ার কারণে অনেক দূধর্ষ অপরাধী ও আইনের হাত পেরিয়ে পার পেয়ে যায়। একজন সাক্ষীকে মাননীয় আদালতে হাজির হয়ে প্রকাশ্য সাক্ষী দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষী দিয়ে বের হয়ে আসার সময় আসামী পক্ষদ্বারা নিযার্তিত হয় অথবা প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। ইদানীং মাননীয় আদালত থেকে আসামী জামিন দেয়া না দেয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। দেশের খোদ সাবেক প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা ও এব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। এ ইস্যুতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও হয়েছিল। তিনি আদালত অবমাননা করেছেন কি করেননি তা আলোচনার মূখ্য নয়। মূখ্য আমাদের দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বহু উচ্চারিত বাক্যটি “আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে”। প্রসঙ্গক্রমে এটাই চির সত্য
“আইন সব সময় তার নিজস্ব গতিতে চলে”। কোনো সস্তা আবেগ আইনের কাছে গ্রহণ যোগ্য নয়। ‘বিচারক’-‘তিনি একজন ঐতিহাসিকের মতও’। একজন ঐতিহাসিক যেমন লোভ-লালসা, আবেগ, রাগ বা বিরাগের উর্ধ্বে ওঠে- সত্যের অনুসন্ধান করে থাকেন, বিচারক ও ঠিক তেমনি সত্যানুসন্ধানে ব্যাপৃত থাকেন। “বিচারকের সিন্ধান্ত গ্রহণের মূল উপজীব্য বা ভিত্তি হচ্ছে সাক্ষ্য প্রমাণ। আর এ সাক্ষ্য প্রমাণ আদালতে উপস্থিত করার প্রাথমিক দায়িত্ব হচ্ছে বাদী পক্ষের। আইন সব সময় এটা নিশ্চিত করতে চায় যে, কোনো অবস্থাতেই যেন নিরাপরাধ কেউ শাস্তি না পায়। এজন্য সাক্ষী প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীর অপরাধ সুনিশ্চিত ভাবে নির্ণয় করার চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে প্রত্যক্ষদর্শীরাও সহজে কোনো মামলায় সাক্ষী দিতে রাজী হয়না। আসামী যদি দুধর্ষ প্রকৃতির কেউ হয় তাহলে তো কথাই নেই। আইন যেহেতু প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য প্রমাণ ছাড়া কাউকে শাস্তি দিতে পারে না। ফলশ্র“তিতে সাক্ষীর অভাবে অনেক অপরাধী জামিন পেয়ে যায়। অনেক সময় অপরাধীদের আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রনকারী কতৃপক্ষ দুর্বল ধারায় কোর্টে চালান দেয়। ফলে জামিন পাওয়া বা মামলা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হয়ে যায়। যারা দুধর্ষ অপরাধী তারা মামলায় জামিন পাওয়ার পর প্রথম যে কাজটি করে তা হলো বাদী পক্ষকে মামলা তুলে নেয়ার হুমকি দেয়া। বাদীকে যদি মামলা তুলে নিতে বাধ্য করা না যায়, তাহলে সাক্ষীদের ম্যানেজ করার উদ্যোগ নেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের জীবননাশের হুমকি ও দেয়া হয়। এসব কারণে ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও অনেকেই সাক্ষী দিতে সাহস পায়না। অথচ অপরাধীকে শাস্তি দিতে ও সুষ্ঠ্য বিচার নিশ্চিত করতে সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ফলে অপরাধীদের জামিন পাওয়া ও মামলা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হয়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রথম সাংবাদিক নিহত হয় যশোরে। ১৯৯৪ সালে সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হন যশোর থেকে প্রকাশিত ‘স্ফুলিঙ্গের’ সাংবাদিক আব্দুল গফফার চৌধুরী। ১৯৯৬ সালে ১৯ জুন নিহত হন সাতক্ষীরার ‘দৈনিক পত্রদূত’ পত্রিকার সম্পাদক স.ম. আলাউদ্দিন। ১৯৯৮ সালের ১২ জুন নিহত হন চুয়াডাঙ্গার ‘দিনবদল’র সাংবাদিক বজলুর রহমান। একই বছর ১৬ জুলাই ঝিনাইদহ’র ‘সদ্যখবর’র সাংবাদিক রেজাউল করিম নিহত হন। একই বছর ৩০ আগষ্ট নিহত হন ‘দৈনিক রানার’ সম্পাদক সাইফুল আলম মুকুল । ২০০০ সালের ১৬ সালে ১৬ জুলাই নিহত হন ‘দৈনিক জনকন্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি সামসুর রহমান কেবল। ঝিনাইদহ থেকে প্রকাশিত ‘বীরদর্পণ’ পত্রিকার সম্পাদক মীর ইলিয়াস হোসেন নিহত হন ২০০০ সালের ১৫ জানুয়ারী। খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক অনির্বাণ’র সাংবাদিক নহর আলী নিহত হন ২০০১ সালের ২২ এপ্রিল। ২০০২ সালের ২ মার্চ নিহত হন খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক পূর্বাঞ্চল’র সাংবাদিক হারুন-অর-রশিদ খোকন। ৫ জুলাই ২০০২ সালে খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক অনির্বাণ’র ডুমুরিয়া প্রতিনিধি সরদার শুকুর হোসেন সন্ত্রাসীদের দ্বারা অপহৃত হন। তারপর তাকে আর পাওয়া যায়নি। ২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারী নিহত হন ‘দৈনিক সংবাদ’র সাংবাদিক মানিক সাহা। একই বছর ২৭ জুন নিহত হন খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক জন্মভূমি’র সম্পাদক ও খুলনা প্রেসক্লাবের সভাপতি হুমায়ুন কাবর বালু নিজ অফিসও বাস ভবনের সামনে । ২০০৫ সালে নিহত হন ‘দৈনিক সমকাল’র গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি গৌতম দাস। এসময় নিহত হয় যশোরের ‘দৈনিক রানার’পত্রিকার সাংবাদিক ফারুক হোসেন। সর্বশেষ ২০০৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর নিহত হন সাতক্ষীরা কলারোয়ার ‘জনবাণীর’ প্রতিনিধি বেল্লাল দফাদার। সাংবাদিক হত্যা মামলাগুলো অধিক তদন্তের নামে চলে কালক্ষেপণ। এছাড়া চাঞ্চল্যকর সাংবাদিক হত্যা মামলাগুলির প্রমাণ মিলছেনা দোষীদের বিরুদ্ধে। শাস্তি দেয়া যাচ্ছেনা অভিযুক্তদের। সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে দক্ষিণ-পশ্চিশাঞ্চলের সাংবাদিক হত্যা মামলার আসামীরা বেকসুর খালাস পেয়ে যাচ্ছে। এতে নিহত সাংবাদিকদের পরিবারসহ সহকর্মীরা চরম হতাশায় ভুগছেন। আমরা আশাকরি সাংবাদিক হত্যা নয় শুধু সব হত্যা মামলাই ‘অধিক তদন্তের’ নাম‘র “কালক্ষেপণ এর হিমাগার” থেকে মুক্ত হয়ে ‘সুবিচার’ হবে।
0 comments:
Post a Comment