বিদ্যূৎ সমস্যার সমাধানে বায়ুশক্তি
আলী ফোরকান
বিদ্যুতের অপ্রতুলতা আজ আমাদের একটি বড় সমস্যা। কিন্তু শিল্পায়ন ও উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিদ্যুতের। আমাদের বিদ্যুৎ শক্তির একটি বিরাট অংশ (৮৬%) আসে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। কিন্তু আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদও সীমিত। বিশেষজ্ঞদের মতে আমরা যদি বর্তমান হারে গ্যাস খরচ করে চলি তাহলে আমাদের এ মজুদ গ্যাস শেষ হয়ে যাবে ২০১০ সাল নাগাদ। বিদ্যুৎ উৎপাদন ছাড়াই সার উৎপাদন এবং গৃহস্থালী কাজের মতো বেশ কিছু ক্ষেত্রে আমরা ব্যবহার করছি প্রাকৃতিক গ্যাস। আমাদের কয়লার মজুদও সামান্য এবং পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুবিধা সীমিত। তাহলে আমাদের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা কিভাবে মিটবে? বিদ্যুৎ ছাড়া শিল্পায়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও আত্মনির্ভরশীলতা কোন কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়। ফলে আমাদের একই সাথে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে হবে, আবার প্রাকৃতিক গ্যাসের খরচ কমাতে হবে।
আজ বিশ্ব শুধু বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি উৎসের স্বল্পতা নিয়েই চিন্তিত নয়, এসব প্রাকৃতিক জ্বালানি পরিবেশের ওপর যে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে তা নিয়েও অনেক বেশি চিন্তিত। জ্বালানি সম্পদের স্বল্পতা এবং অত্যাধিক জনগোষ্ঠীর চাপে ভারাক্রান্ত বাংলাদেশের জন্য সে চিন্তা আরও বেশি। তদুপরি জ্বালানি উৎসের জন্য আমরা বিদেশের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। এটা সত্যি যে, কোন নতুন শক্তির উৎস খোঁজার চেয়ে বিদেশ থেকে শক্তি আমদানির খরচ অনেক কম। কিন্তু ভবিষ্যতের দিকে তাকালে বোঝা যাবে এ চিন্তা আমাদের জন্য কতটা ভয়াবহ। বরং জ্বালানির জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা আজ আমাদের জন্য খুবই জরুরী। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের মজুদ যেহেতু সন্তোষজনক নয়, কাজেই আমাদেরকে হাত বাড়াতে হবে নতুন জ্বালানি উৎসের দিকে।
আজ শুধু পশ্চিমারাই নয়, এশিয়ার অনেক দেশও খোঁজ করছে দুষণমুক্ত জ্বালানি উৎসের। আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারত এবং থাইল্যান্ড অনেক এগিয়ে গেছে উপক‚লীয় বায়ু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। প্রতি বছরই তারা বাজেট বৃদ্ধি করছে এই ক্ষেত্রটিতে। ভারতীয় বিশেষজ্ঞগণ হিসেব করে দেখিয়েছেন যে, ৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি উইন্ড টারবাইন প্রতিবছর প্রায় ১,১০০ টন জীবাশ্মা জ্বালানির খরচ বাঁচাতে পারে। বায়ু প্রবাহ মাত্রার বিচারে পতেঙ্গা, কক্সবাজার,মহেশখালী, কুতুবদিয়ার, সন্দীপ, হাতিয়ার মতো উপক‚লীয় অঞ্চলে উইন্ড টারবাইনের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী। যা বর্তমানে খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলায় পরীক্ষামূলক ভাবে চলছে ও ভাল ফল পাওয়া যাচ্ছে।
বায়ু শক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা, এ শক্তি অফুরন্ত। এর কোন শেষ নেই। প্রকৃতি তার নিয়মে আমাদের বাতাস দিয়ে চলে। শুধু প্রয়োজন উইন্ড টারবাইনের সাহায্যে তা থেকে শক্তি আহরণ করা। ফলে অন্যান্য উৎসের তুলনায় বায়ুশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও অনেক কম।
বায়ুশক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে আমরা আমাদের উপক‚লীয় অঞ্চলের প্রভূত উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতিতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারি। চিংড়ি চাষ, লবন উৎপাদন এবং বরফ শিল্পের মতো খাতগুলো বায়ুশক্তি যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে তা নিঃসন্দেহেই বলা যায়। রেশম চাষ, কৃষি, পোল্ট্রি, ধানের খোসা ছড়ানো, গৃহ আলোকিত করার কাজেও এ বিদ্যুৎ ব্যবহার করা পেতে পারে।
তবে বায়ুশক্তির উপযোগিতার কথা চিন্তা করতে গেলে অনেক বড় হয়ে দেখা দিবে এর সামাজিক উপযোগিতা। পল্লী অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন অনেকখানি নির্ভর করে শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রযুক্তির উন্নয়নের ওপর। যার জন্য বিদ্যুতের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। এ ক্ষেত্রে অর্থাৎ শহর থেকে দূরবর্তী পল্লী এবং সমুদ্র উপক‚লবর্তী অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বায়ুশক্তি একটি উজ্জ্বল ভূমিকা রাখতে পারে। এর একটা পরিস্কার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। যা আমাদের পল্লী এলাকার শ্রমিকদের মধ্যে গতির সঞ্চার করতে পারে। এ ধরনের উন্নয়ন প্রক্রিয়া কাজের খোঁজে গ্রাম থেকে শহরে এবং দেশ বিদেশ যাওয়ার যে প্রবণতা মানুষের মধ্যে রয়েছে তা অনেকখানি কমিয়ে দেবে। উল্লেখ্য যে, ইউরোপীয় দেশগুলোর পল্লী এলাকায় এ ধরনের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সংগঠিত হয়েছে যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল উইন্ডমিলের। উইন্ডমিল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ শক্তির মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলে ছোট ছোট শিল্প কারখানা গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ অনেক বাড়বে এবং আত্মকর্ম সংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এ ছাড়া সূর্যের আলোর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় গ্রামের মানুষের কর্মঘন্টা অনেক কম। গ্রামের মানুষ সাধারনত সকাল ৮টার পর কাজ শুরু করে। গোধূলীর পর পরই কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। বায়ুশক্তি চালিত উইন্ডমিল বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষের দীর্ঘ রাত্রির এই কর্মহীন সময়কে কর্মমূখর সময়ে পরিণত করতে পারে। সর্বোপরি, বায়ুশক্তির ক্ষেত্রে সিস্টেম লসও হবে খুব কম।
অর্থাৎ সার্বিক দিক বিবেচনা করলে বায়ুশক্তি থেকে উৎপাদিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রে যে সব সুবিধা উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে সেগুলো হলো-
১। কোন পরিবেশ দূষণের সম্ভাবনা নেই।
২। মূল্যবান বিদেশী মুদ্রার বিনিময় আমদানিকৃত জ্বালানির সাশ্রয়।
৩। প্রাকৃতিক গ্যাসের খরচ রোধ।
৪। সহজ ও সুলভ রক্ষনাবেক্ষন।
৫। যে কোন অঞ্চলে বিদ্যুৎ প্রেরণের সুবিধা।
৬। প্লান্ট স্থাপনের জন্য অল্প জায়গার প্রয়োজনীয়তা।
শেখ কথা ঃ আমাদের দেশের সমুদ্র উপক‚লবর্তী অঞ্চল এবং দ্বীপগুলোতে বাস করছে অসংখ্য মানুষ। প্রাকৃতিক সম্পদ বা প্রাকৃতিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে এসব এলাকার উপযোগিতাও অনেক বেশি। চিংড়ি চাষ, মাছধরা ও মাছের চাষ, লবন উৎপাদন ও কৃষির জন্য এ অঞ্চলসমূহে রয়েছে অত্যন্ত সুবিধা এটাকে সঠিকভাবে কাজে লাগতে পারলে আত্মনির্ভরশীলতার পথ বেয়ে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের শিখড়ে পৌছানো হয়ত কঠিন কথা নয়। উন্নত প্রযুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে এসব সম্পদকে কাজে লাগিয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে জীবনে রক্তস্রোত হলো বিদ্যুৎ। বিদ্যুতের সাহায্যে চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ চাষের ক্ষেত্রে সেমি-ইনটেনসিভ পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে এর উৎপাদন ২৫-৩০ ভাগ বাড়ানো সম্ভব। হিমায়িত করার বরফের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে অনেক মাছ। ঐসব দূরবর্তী স্থানে বরফ ফ্যাক্টরি তৈরী ও বরফ সরবরাহের মাধ্যমে মাছ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গ্রামের মানুষকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। বিদ্যুৎ চালিত পাম্পের সাহায্যে সাগরে লবনাক্ত পানিকে উচ্চ ভূমিতে ঠেলে দিয়ে লবন উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতিবছর কমপক্ষে ৩০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচানো সম্ভব। যা আমরা লবন আমদানির জন্য ব্যয় করে থাকি। এসব এলাকায় জাতীয় গ্রিডের সাহায্যে বিদ্যুৎ নেয়া অনেক কষ্টসাধ্য। আবার জীবাশ্ম জ্বালানি বহনও প্রচুর ব্যয়বহুল। কিন্তু এসব উপক‚লবর্তী অঞ্চলে সেখানে থেকে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি । অর্থাৎ বায়ুশক্তি আমাদেরকে নিয়ে যেতে পারে দারিদ্র্য দূরীকরণ, আত্মনির্ভরশীলতা ও উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে। পারে স্বল্প জ্বালানি সম্পদ এবং অধিক জনসংখ্যা ও অজস্র সমস্যার ভারে ন্যুজ এ দেশকে বিশ্ব সভায় মাথা উচু করে দাঁড়ানোর সাহস যোগাতে।
0 comments:
Post a Comment