Friday, February 23, 2018

ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক

 ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক
আলী ফোরকান 
বাংলাদেশ- ভারত সম্পর্ক বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে দেশ দুটোর  সম্পের্কর ভিত্তি ঐতিহাসিক। বাংলাদেশ ভারত দুটি পৃথক রাষ্ট্র হলেও উভয় দেশের রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অপূর্ব মিল রয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের ভূমিকা দেশ দুটোকে আরো কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। এসময় ভারতের সাধারণ মানুষ বাংলাদেশের মানুষের জন্য যে অপরিসীম ভালোবাসা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেছিল তা স্বরণযোগ্য। কিন্তু বিগত ৩৭ বছরে বর্ডার এলাকায় বিএসএফের অসহিষ্ণু  কার্যকলাপ এবং ভারতের নীতিনির্ধারকদের দোদুল্যমান আচরণ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অনেক কিছুই ম্লান করে দিয়েছে। এছাড়া ভারসাম্যহীন বাণিজ্য সম্পর্ক, গঙ্গার পানি বন্টনে অসমনীতি, গ্যাস রপ্তানি বিতর্ক, ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট,পুশইন ও পুশব্যাক,দক্ষিণ তালপট্টির মালিকানা প্রশ্নে বিরোধ, ভারত কতৃক বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান,আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প ইত্যাদির কারণে বাংলাদেশইনডিয়ার  সম্পর্কে ফাটল ধরে। এর ফলে বন্ধুপ্রতিম দুইদেশের সামগ্রিক সম্পর্কের অবণতি হচ্ছে।
বর্ডার সমস্যা: গত ৩৬ বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন বর্ডার এলাকায় ভারতের সিকিউরিটি ফোর্সের হাতে নিহত হয়েছে দেশের অসংখ্য সাধারণ মানুষ এবং বিড়িআর সদস্য। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ৮ বছরেই শুধু ভারতের সিকিউরিটি র্ফোস ও সে দেশের সন্ত্রাসীদের হাতে বাংলাশেী  ৭২০ জন খুন, ৬৬৩ জন আহত, ৭৫০ জন কিডন্যাপ ও ৯১ জন নিখোঁজ হয়েছে (২০০১ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত) । ১৯৯৭ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ভারতের সিকিউরিটি ফোর্স বাংলাদেশ ভূখন্ডে ৩ শতাধিকের বেশি সশস্ত্র আক্রমণ করেছে । বাংলাদেশ- ভারত বর্ডারে যেসব বাংলাদেশী বসবাস করছে,তাদের নাগরিক অধিকারের সুযোগ-সুবিধাসহ মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বর্ডার এখন প্রায় সারা বছরই উত্তপ্ত থাকে। সেখানে ‘উত্তেজনা,বাংকার খনন,  রেড এলাট, ফ্লাগমিটিং, ফাঁকা গুলি,  এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ডারকেন্দ্রিক এসকল সমস্যা দু’রাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সর্ম্পককে দারুণভাবে প্রভাবিত করছে।
ভারত-বাংলাদেশ বর্ডার সমস্যার ঐতিহাসিক পটভূমি: বাংলাদেশ ভারত বর্ডার সমস্যা দীর্ঘদিনের, যার গোড়াপত্তন হয় ১৯৪৭ সালে। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্তির সময় ভারত ও পাকিস্তানের বর্ডার এলাকা চিহ্নিত করার জন্য ব্রিটিশ সরকার ‘র‌্যাডক্লিফ কমিশন’ গঠন করে। একমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী জলপাইগুড়ির কয়েকটি থানা পাকিস্তানকে এবং কয়েকটি ভারতকে দেয়া হয়। কিন্তু কমিশনের অনুল্লিখিত পঞ্চগড় জেলার বোদা থানাকে নিয়ে দু’দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়ন শুরু হয় । ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই এর মালিকানা দাবি করে। ফলে এ মালিকানার দাবি দুদেশের বৈরী সর্ম্পকে নতুন মাত্রা যোগ করে। শুরু হয় চাপা উত্তেজনা। অবশেষে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নূন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু যৌথ ঘোষণায় এ সমস্যার অবসান ঘটায়। ঘোষণায় কোন ক্ষতিপূরণ ছাড়াই বেরুবাড়ি ভারতকে এবং আঙ্গরপোতা-দহগ্রাম পাকিস্তানকে হস্তান্তরের কথা বলা হয়। কিন্তু এ চুক্তির বৈধতা নিয়ে ভারতের এক নাগরিকের সুপ্রিম কোর্টে মামলা ও  দু’দেশের সরকারের উদাসীনতার কারণে চুক্তিটি দীর্ঘদিনেও কার্যকর হয়নি। উপরন্তু ১৯৬৫ সালে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর থেকে প্রকৃতপক্ষে দু-দেশের বর্ডারগুলো সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে যায়। ফলে ছিটমহলবাসীরা এক অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে পড়ে । ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পরপরই সীমান্ত সমস্যা আবারো প্রকট হয়ে দেখা দেয়। দু-দেশের বর্ডারে বিরাজ করতে থাকে এক অস্থিতিশীল পরিবেশ। অবশেষে দুই রাষ্ট্রের সদিচ্ছায় ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধীর স্বাক্ষরিত ‘ইন্ধিরা-মুজিব’ চুক্তিতে ছিটমহল বিনিময় সংযোজিত হয়। আর্ন্তজাতিক চুক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে বাংলাদেশ সরকার তাৎক্ষণিকভাবে সংসদে তা পাশ করে নেয়। কিন্তু ভারত আজ পর্যন্ত এ চুক্তিটি ভারতের লোকসভায় অনুমোদন করেনি। আর বরাবরই ভারত সমস্যাটি  জিইয়ে রেখেছে। যার মাশুল দিতে হচ্ছে দু’দেশের সাধারণ মানুষের জীবনের বিনিময়ে। 
বাংলাদেশ- ভারত আর্ন্তজাতিক বর্ডার ও সীমান্ত অঞ্চল: বাংলাদেশের প্রায় চারপাশেই ভারত। বাংলাদেশের উত্তর পূর্বে আসাম, পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গ, পূর্বে আসাম ও ত্রিপুরা এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। ভৌগোলিকভাবে ইনডিয়ার সাথে বাংলাদেশের আর্ন্তজাতিক বর্ডারের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আর্ন্তজাতিক বর্ডারের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ১শ’ ৫৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে স্থল বর্ডার ৩ হাজার ৯শ’৭৬ কিলোমিটার এবং জল সীমানা ১শ’৮০ কিলোমিটার। মোট বর্ডারের মধ্যে ৪২ কিলোমিটার বর্ডার নিয়ে ভারতের সঙ্গে এখন পর্যন্ত সমস্যা বিদ্যমান। এই ৪২ কিলোমিটারের মধ্যে ৩৫.৫ কিলোমিটার এলাকায় উভয়পক্ষ যৌথভাবে বর্ডার চিহ্নিত করে বাঁশের খুঁটি বসিয়েছে।  এখনও ৬.৫ কিলোমিটার বর্ডার অচিহ্নিত রয়েগেছে। একারণে মূহুরীর চর, লাঠিটিলা ও দুইখাতা এলাকার অচিহ্নিত বর্ডারে বাংলাদেশ ভারতের বর্ডার সিকিউরিটির ফোর্স ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিরোধ লেগেই থাকে। এছাড়া পঞ্চগড়, রাজশাহী কুষ্টিয়া ও ফেনীসহ কয়েকটি এলাকায় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৩৫.৫ কিলোমিটার এলাকা চিহ্নিত হওয়ার পরও ভারতের বৈরী আচরণে স্থায়ীভাবে বর্ডারে পিলার বসানো যায়নি। এর বাইরেও বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে রয়েছে বেশকিছু অদখলীয় জমিও ছিটমহল,যা দু’দেশের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টির প্রধান অন্তরায়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, অতীতে বর্ডার বলতে দুটি রাষ্ট্রের মধ্যবর্তী এবং তাদের আওতাবহির্ভূত দুধর্ষ উপজাতি অধ্যুষিত ও শাষিত র্দূগম জনবিরল অঞ্চল র্নিদেশিত হতো। সময়ের আবর্তে শিল্প ও প্রযুক্তির বিপ্লবে সে ধারণা বর্তমানে অকার্যকরী হয়ে গেলেও বর্ডারের ব্যাপারে ভারতের মধ্যে সেই পুরনো ধারণার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। মূল ভূখন্ড থেকে ঐসব এলাকার সার্বিক অবস্থা এখনো অনেক খারাপ। শিক্ষা,স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি এবং অবকাঠামো সবদিক থেকেই এলাকা সমূহ পিছিয়ে।
বাংলাদেশ- ভারত বর্ডারে উত্তেজনাপূর্ণ এলাকা:  বাংলাদেশ- ভারত  আর্ন্তজাতিক বর্ডারের প্রায় পুরোটা জুড়েই সারা বছর উত্তেজনা বিরাজ করে। তবে এর মধ্যে কিছু কিছু বর্ডার এলাকা বেশি স্পর্শকাতর। এসব স্পর্শকাতর এলাকা দেশের উত্তরাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলেই বেশি। এগুলো হলো: পঞ্চগড় জেলা বর্ডার। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গি ও হরিপুর বর্ডার। জয়পুরহাটের উচনা বর্ডার। সাতক্ষীরার কলারোয়া, দেবহাটা,কালীগঞ্জ ও শ্যামনগর বর্ডার। চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা ও জীবননগর বর্ডার।  মেহেরপুরের গাংনী ও জীবননগর বর্ডার। লালমনিরহাটের পাটগ্রাম বর্ডার।  চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর  ও ভোলাহাট  বর্ডার।  রাজশাহী জেলার পবা,গোদাগাড়ি ওচারঘাট বর্ডার। কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী, ভূরুঙ্গামারী, রাজিবপুর ও নাগেশ্বরী বর্ডার। ফেনী জেলার ফুলগাজি বর্ডার। সিলেটের পাদুয়া, জকিগঞ্জ,বিয়ানীবাজার ও জৈন্তাপুর বর্ডার। যশোরের বেনাপোল, শার্শা, ঝিকরগাছা বর্ডার। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট বর্ডার। নেত্রকোণার বাদামবাড়ি বর্ডার। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও বুড়িচং বর্ডার।
সীমান্ত সমস্যার কারণ এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর প্রতিক্রিয়া: যে কোনো দেশের (স্থলভাগ, জলাভূমি,নদী, অরণ্য ও পাহাড়বেষ্টিত) বর্ডার সূচারুরূপে চিহ্নিত করা খুব জটিল এবং দুরূহ কাজ। এই জটিল কাজটি সম্পূর্ণরূপে সম্পন্ন না হওয়ায় বর্ডার সংক্রান্ত নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ- ভারতের বর্ডারের বেশ কয়েকটি সুর্নিদিষ্ট সমস্যা দু দেশের সম্পর্ককে নানা ভাবে প্রভাবিত করে। 
এগুলো হচ্ছে: ১. বর্ডারের জিরো লাইনের কাছাকাছি দেখামাত্র  ভারতের সিকিউরিটি ফোর্সের গুলি বর্ষণ। ২.  সিকিউরিটি ফোর্স সদস্যদের বাংলাদেশ ভূখন্ডে অনুপ্রবেশ ও অসহনশীলতা। ৩. বর্ডারের নিকটবর্তী বাংলাদেশী গ্রামে ভারতের  সন্ত্রাসীদের হানা,ডাকাতি,লুটপাট, হামলা, অপহরণ ও কৃষকদের,ক্ষেতের ফসল কেটে নিয়ে যাওয়া। ৪. ৬.৫ কিলোমিটার বর্ডার (দুই খাতা,মুহুরির চর,লাঠিটিলা এলাকা চিহ্নিত না হওয়া। ৫. তথাকথিত বাংলাভাষীদের বাংলাদেশ ভূখন্ডে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা। ৬. বাংলাদেশ এবং ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ১শ’৬২ টি ছিটমহলের সমাধান না হওয়া। ৭. স্থানীয় লোকজনের মধ্যে বিরোধ এবং ছিটমহলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। ৮.ই ভারত-বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ৬ হাজার একরেরও বেশি অপদখলীয় জমি হস্তান্তর না হওয়া। ৯. চোরাচালানি নিয়ে দুদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে বিরোধ। ১০. ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাংলাদেশে ঘাঁটি থাকার অভিযোগ। এ সকল সমস্যা সমাধানে ১৯৭৪ সালে মুজিব ইন্ধিরা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। বাংলাদেশ চুক্তি স্বাক্ষরের পর সংসদে তা অনুমোদন করে ও  ভারতকে  বেরুবাড়ি ছিটমহল হস্তান্তর করে। কিন্তু ভারত আজ পর্যন্ত সে চুক্তি বাস্তবায়ন করেনি। চুক্তির ১৪নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশ তাৎক্ষনিকভাবে ভারতকে কয়েকটি ছিটমহল ছেড়ে দিলেও ভারত বাংলাদেশের দহগ্রাম,আঙ্গরপোতা ছিটমহল ব্যবহারের জন্য পাটগ্রাম করিডোর (যা তিন বিঘা করিডোর নামে পরিচিত) সে সময় উম্মুক্ত করে দেয়নি। এ করিডোর নিয়ে ১৯৮২ সালে এরশাদ-ইন্ধিরা চুক্তি হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ভারত বাংলাদেশী মুদ্রায় ১ টাকা ‘কর’ গ্রহণে বাংলাদেশকে লীজ দিতে রাজি হয়। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ ভারতের  মধ্যে তিনবিঘা  করিডোর ব্যবহার বিধি নিয়ে আরো একটি চুক্তি হয় । চুক্তি অনুসারে  ১৯৯২ সালের ৬ জুন থেকে ভারত সরকার তিন বিঘা করিডোর ১ ঘন্টা পর পর চলাচলের জন্য সুযোগ দেয়। বলা যায় বাংলাদেশের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বৃহৎ এবং শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে ইনডিয়া বর্ডার সংক্রান্ত যে ভূমিকা নিয়েছে তা অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবেশী সূলভ নয়। এরই ক্রমবিস্তৃত রূপ পাদুয়া-বড়াইবাড়ির ঘটনা। মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত পাদুয়া গ্রাম ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পাদুয়া গ্রামটি পড়েছিল  তদানীন্তন   পূর্ব পাকিস্তানে । বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২৩০ একর জায়গা ভারতের সিকিউরিটি ফোর্সের দখলে থেকে যায় এবং সেখানে তারা খাসিয়া আদিবাসীদের বসত গড়ে তোলে। এর দক্ষিণে প্রবাহিত পিয়াং নদী থেকে বাংলাদেশী এবং ভারতের ব্যবসায়ীরা  পাথর উত্তোলন করতো। এখানে বিডিআর নিয়মিত টহল দিত। বাংলাদেশী পাথর উত্তোলনকারীদের প্রতি ভারতের সিকিউরিটি ফোর্সের অত্যাচারে বাংলাদেশ ইনডিয়াকে পাদুয়া ছেড়ে দিতে অনুরোধ জানায়। কিন্তুু ইনডিয়া ২০০১ সালের ২৮ মার্চ ১৯৭৫ সালের ‘ ভারত  বাংলাদেশ বর্ডার গাইডলাইন’ চুক্তি লঙ্ঘন করে আর্š—জাতিক বর্ডারের মাত্র ৩০ গজের মধ্যে সংযোগ সড়ক তৈরী করতে শুরু করে। বিডিআর এর প্রতিবাদ করলে ভারত কার্যক্রম বন্ধ রাখে। পাদুয়ায় বিডিআরের এ প্রতিবাদে অপমান বোধ করে ভারত  সরকার এবং তারা পাল্টা আক্রমনের নীলনকশা প্রণয়ন করে। ২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল তারা পাদুয়া থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার বড়াইবাড়ি গ্রামে হামলা চালায়। সিকিউরিটি ফোর্স সদস্যরা আর্ন্তজাতিক আইন লঙ্ঘনকরে বাংলাদেশের ২কিলোমিটার ভিতরে প্রবেশ করে। এসময় বিড়িআর ও সিকিউরিটি ফোর্সের গুলি বর্ষণে ১৬ জন সিকিউরিটি ফোর্স ঘটনা স্থলেই নিহত হয়। সিকিউরিটি ফোর্সের গুলিতে শাহাদত বরণ করে ২ জন বিড়িআর সদস্য ও কয়েকশ গ্রামবাসী আহত হয়। এই ঘটনায় বাংলাদেশ ভারতের কূটনৈতিক অঙ্গন গরম হয়ে উঠে এবং দুদেশের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করে। সংঘর্ষে সিকিউরিটি ফোর্স  পিছু হটে যাওয়ার পর ভারত সরকার এবং তাদের প্রচার মাধ্যম নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করে। ভারতের প্রচার মাধ্যম বিড়িআরের বিপক্ষে প্রচারণা চালায়, সে তুলনায় বাংলাদেশের পক্ষে প্রচার মাধ্যম ছিল নি¯প্রভ। বর্ডার সংঘাত জাতীয় নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া বা প্রচার লক্ষ্য করা যায়নি। অথচ ভারত আর্ন্তজাতিক আদালতে মামলা করবে বলে বাংলাদেশকে হুমকি দেয়। এছাড়া ভারত ঐ সময় বর্ডারে অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করে ও জয়পুর হাটের বর্ডারের উচনা, ফেনীর মুহুরীর চর,দিনাজপুরের পাঁচবিবি গ্রামের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং কয়েকজন বাংলাদেশী নাগরিককে ধরে নিয়ে যায়। সিকিউরিটি ফোর্স সদস্যরা বিড়িআর ক্যাম্পের ওপর গুলি ছোড়াসহ  নানা ধরণের উস্কানী মূলক কাজ একের পর এক করলেও এ বিষয়ে বাংলাদেশ সহনশীলতার পরিচয় দেয়। সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল পরস্পর দোষারোপ করলেও ভারতের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ জানায়নি। কিন্তু ভারত বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে স্পষ্ট একটি বিভেদ লাইন টেনে সেনাবাহিনী সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করে। ইনডিয়া এসবের পিছনে আইএসআইর হাত আছে বলেও মন্তব্য করে। এতসব কিছুর পর পরবর্তীতে বর্ডারে শান্তি ফিরে আসলেও কখনই তা স্থায়ী হয়নি। বর্ডার নিয়ে  দুদেশের মধ্যে বিরোধ লেগেই আছে। 
সীমানা সংক্রান্ত নির্ধারণ প্রক্রিয়া ও ছিটমহল সংক্রান্ত সমস্যা: ইনডিয়া বাংলাদেশ বর্ডার সমস্যার আরেকটি অন্যতম কারণ হলো অপদখলীয় ছিটমহল। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানামারসহ ভারতের ৪ হাজার ৫শ’১০ কিলোমিটার এলাকায় বর্ডার চিহ্নিত করার কাজ  শুরু হয় ১৯৫২ সালে । মৌজা ম্যাপ অনুযায়ী বর্ডার চিহ্নিত করতে তিন ধরনের পিলার বসানো শুরু হয়। দাগ নম্বর চিহ্নিত জমির সুবিধামতো স্থানে ৫ ফুট উঁচু কংক্রিটের তৈরি মেইন পিলার এবং দুই মেইন পিলারের মাঝে স্থাপন করা হয় আড়াই ফুট উঁচু অনেক সাব পিলার। মৌজার প্রতিটি জমির দাগ নম্বরের পাশে বসানো হয় ‘টি’ পিলার। প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ বর্ডারে মেইন পিলার ও সাব পিলারের সংখ্যা ১ লক্ষেরও অধিক। 
বিগত ৩২ বছর ধরে ভারতÑবাংলাদেশ জরিপ কর্মকর্তারা বর্ডার এলাকায় প্রতি ১ মাইল জায়গার স্ট্রিপম্যাপ তৈরির মাধ্যমে বর্ডার জরিপ করেছেন, যা এখনও শেষ হয়নি। সিট্রপম্যাপ অনুযায়ী বর্ডার জরিপ কাজ শেষ হলে দু’দেশের অনুমোদন সাপেক্ষে ক্ষতিগ্রস্থ বর্ডার পিলার সংষ্কার ও নতুন করে পিলার স্থাপন করার কথা। ১৯৭৪ সালে র‌্যাডক্লিফ রোয়েদার অনুযায়ী মুহুরী নদীর মধ্যস্রোত দু’দেশের বর্ডার বলে নির্ধারণ করা হয়। ’৭৪ এ ভারতÑবাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনে মধ্যস্রোতকেই দু’দেশের বর্ডার হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। নদী ভাঙ্গনের ফলে মধ্যস্রোত বর্ডার র্নিদেশক হওয়ায় ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রায় ১ কিলোমিটার ঢুকে যায়। এর বাইরে ও যেখানে-যেখানে নদী বর্ডার নির্দেশক তার প্রায় সব এলাকা বিরোধপূর্ণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পদ্মা নদী সংলগ্ন বৃহত্তর রাজশাহী, নওগাঁ বর্ডার সংলগ্ন আত্রাই নদী, নীলফামারীর ডিমলা সংলগ্ন তিস্তা নদী। এ সব নদী এবং নতুন চর জেগে ওঠা নিয়ে ভারত- বাংলাদেশের বর্ডার বিরোধ চলছে বহু কাল থেকে। সাতক্ষীরা এবং দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মধ্যে বর্ডার হিসেবে চিহ্নিত হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনায় প্রায় ৩০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে জেগে ওঠা দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপটির মালিকানা দাবি করে ইনডিয়া। এতেও অনাকাঙ্কিত সমস্যার সৃষ্টি হয়। অপরদিকে ১৯৮৪ সাল থেকে ভারতের বর্ডারে কাঁটা তারের বেড়া এবং বর্ডারে সড়ক র্নিমাণ করে আসছে। এছাড়া স্থাপন করে চলেছে বহু পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সার্চলাইট। বাংলাদেশ বর্ডারে বিড়িআরের প্রতিটি ইঙচ(ইড়ৎফবৎ ঙাংবৎাধঃরড়হ চড়ংঃ)’র বিপরীতে ভারতের ইঙচ আছে ৪/৫ টি এবং বাংলাদেশের ভিওপি’র বিড়িআরের যে সংখ্যা ইনডিয়ার ভিওপিতে তার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ।
ছিটমহলের খতিয়ান: ভূমি অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী ভারতের ভেতর বাংলাদেশের ছিটমহলের সংখ্যা মোট ৫১ টি । এর মধ্যে লালমনিরহাট জেলার ৩৩টি ও কুড়িগ্রাম জেলার ১৮ টি, যার মোট আয়তন ১১.৪৬৮০ বর্গমাইল (৭০৮৩.৫২ একর) । বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ছিটমহলের সংখ্যা ১১১ টি। এর মধ্যে লালমনিরহাট ৫৯টি ,পঞ্চগড়ে ৩৬টি,নীলফামারীতে ৪টি এবং কুড়িগ্রামে১২টি, যার আয়তন ২৬.৯৬৬ বর্গমাইল (১৭২৫৮.২৪ একর)। ভারতের হিসাব মতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তাদের মোট ছিটমহলের সংখ্যা ১৩০ টি। এর মধ্যে ১১৯টি হস্তান্তরযোগ্য এবং ১১টি হস্তান্তর যোগ্য নয়, আর ভারতের ভেতর বাংলাদেশের মোট ছিটমহল ৯১টি। এর মধ্যে ৬৮টি হস্তান্তর যোগ্য ও ২৩টি হস্তান্তর যোগ্য নয়। 
বর্ডার সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান: বর্ডার সমস্যা সমাধান দু’দেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কেননা এর ফলে উভয়ই দেশই বিভিন্ন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই অনাকাঙ্কিত সমস্যা সমাধানে এসব পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে। ১. ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত ইন্ধিরা মুজিব চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে। ২. অমীমাংসিত ৬.৫ কিলোমিটার বর্ডার দ্রুত চিহ্নিত করে এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ৩. ভারতের আধিপত্যবাদী মনোভাব পরিত্যাগ করে বন্ধুসুলভ মনোভাব নিয়ে এ সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। ৪. ছিটমহল অদিবাসীদের সকল নাগরিক সুবিধা প্রদান করে মূল ভূখন্ডে তাদের র্নিবিঘেœ যাতায়ত নিশ্চিত করতে হবে। ৫. দেশের মূল রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্রোতে ছিটমহলের অদিবাসীদের সম্পৃক্ত করতে হবে। ৬. দু’ দেশের সীমান্তরক্ষীদের এব্যাপারে পরম সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে হবে। ৭. চুক্তি বাস্তবায়নে দু’ দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে র্সবোচ্চ ভূমিকা পালন করতে হবে।
পানি বন্টন সমস্যা:স্বাধীনতা লাভের পরই প্রথম যে সমস্যার সম্মূখীন হয় তা হল পানি বন্টন সমস্যা। বাংলাদেশের সব নদীর প্রবাহই ভারতের ভেতর দিয়ে এসেছে বলে পানি প্রবাহের ক্ষেত্রে ভারতের ওপর এদেশ নির্ভরশীল। ভারত ইচ্ছা করলেই বিভিন্ন নদীর প্রবাহের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। বাংলাদেশের জন্য নদীর পানি কৃষিকাজ, শিল্প-কারখানা,নদীপথে যাতায়ত ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়। এই নদীর মূল উৎস নেপালে বলে পানি সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ শুধু ভারত  নয়, নেপালকে নিয়েও তিন দেশ সমম্বয়ে যৌথ নদী কমিশনের প্রস্তাব দিয়েছিল, যা বাস্তবায়ন হয়নি। ভারত  ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের ফলে পদ্মার পানি প্রবাহ স্থবির হয়ে পড়ে। এরপরেও ভারত তার অভ্যন্তরস্থ নদীর প্রবাহ খাল কেটে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ আরো বিপন্ন পরিবেশের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বাংলাদেশের এ সর্ম্পকিত প্রতিবাদ ইনডিয়ার মনস্পুত হয়নি। ভারত  আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য ভয়ানক আরেক র্দুসংবাদ। এ প্রকল্পের ফলে বাংলাদেশ খুব অল্প সময়ে মরুভূমিতে পরিণত হবে। 
আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প: ভারত  আগামী ৫০ বছরের পানির চাহিদা পুরণের নামে গঙ্গা, ব্রম্মপুত্র এর অববাহিকার সকল নদ-নদীর বাঁধ, জলধারা ও সংযোগ খালের মাধ্যমে প্রত্যাহার করে ভারতের  উত্তর ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে এবং দক্ষিণের কাবেরি নদী পর্যন্ত টেনে নিয়ে খরাপীড়িত অঞ্চলে পানি সরবরাহের কাজ শুরু করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় ৩৭টি ছোট বড় নদীকে ৩০টি খালের সংযোগ ঘটিয়ে ৭৪টি জলাধারে পানি সংরক্ষন করে পানির প্রবাহ ঘুরিয়ে ভারতের  উত্তর, উত্তর-পশ্চিশ ও দক্ষিণাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকায় কৃষিকাজে ব্যবহার করবে। ব্রম্মপুত্র অববাহিকার পানি পশ্চিমবঙ্গ,উড়িষ্যা হয়ে দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ ও কর্ণাটক দিয়ে তামিলনাড়–তে নিয়ে যাওয়া হবে। আর গঙ্গার পানি পৌঁছবে উত্তর প্রদেশ,হরিয়ানা,রাজস্থান এবং গুজরাটে। দীর্ঘ ১২শ’ কিলোমিটার কৃত্রিম নদী সম্বলিত এই প্রকল্পের মাধ্যমে ইনডিয়া গঙ্গা ও ব্রম্মপুত্রের এক-তৃতীয়াংশ পানি তথা ১৭৩ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি সরিয়ে নিতে সক্ষম হবে। ১২-১৫ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের প্রাক সম্ভাব্যতা যাচাই ও রির্পোট প্রদান হয়েছে ২০০৬ সালে আর প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পন্ন হবে ২০১৬ সালের মধ্যে। ভারতের ইতিহাসে দ্বিতীয় বৃহত্তম এই উচ্চভিলাসী প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৫লাখ ৬০ হাজার রুপি বা ১২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে এই প্রকল্পের ব্যয় হবে ১৪৪ থেকে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ছোট বড় মিলিয়ে বাংলাদেশে ২০০ টি নদী রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৫৭ টি আর্ন্তজাতিক, এর মধ্যে ৫৪টি এসেছে ভারত  থেকে ও তিনটি এসেছে মিয়ানামার থেকে। বাংলাদেশের অবস্থান ভাটিতে হওয়ায় উজানের যে কোনো ধরণের পানি নিয়ন্ত্রণের প্রত্যক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের উপর পড়ে। কিন্তু ভারত বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনা না করে দুদেশের অভিন্ন সম্পদ পানি নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করে ১৯৫৬ সাল থেকে। কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বৃদ্ধির অজুহাতে ভারত পশ্চিমবাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার রাজমহল ও ভগবানগোলার মাঝে ফাঁরাক্কার এ মরণবাঁধ র্নিমাণ শুরু হয় ১৯৫৬ সালে । রাজশাহীর বর্ডার থেকে ১৬ কিলোমিটার উজানে গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত এই বাঁধের কাজ শেষ হয় ১৯৬৯ সালে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে এই বাঁধ চালু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। পানি সম্পর্কিত দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ১৯৭২ সালে গঠিত বাংলাদেশ ভারত যৌথ নদী কমিশনের  মাধ্যমে ইনডিয়ার বৈরী নীতির প্রতিবাদ করেও বাংলাদেশের কোনো লাভ হয়নি। অত:পর বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবন্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু এই চুক্তিতে কোনো গ্যারান্টি ক্লোজ না থাকায় বাংলাদেশ ন্যায্য পানির হিস্যা পাচ্ছে না। অধিকন্ত  ভারত  তার আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। শুধু তাই নয়, ভারত সিলেট বর্ডারের বরাক নদীর ওপর পানি-বিদ্যুৎ উৎপাদন বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ করে দেশের পূর্বাঞ্চলকে শুকিয়ে মারার ফাঁদ এঁটেছে।
গ্যাস রপ্তানি বিতর্ক: বাংলাদেশ- ভারত সম্পর্কের অন্যতম সমস্যা হলো গ্যাস রপ্তানি সংক্রান্ত সমস্যা। বাংলাদেশে যে পরিমাণ গ্যাস রক্ষিত আছে তা বহির্বাণিজ্যের জন্য কোনো অংশেই অনুকূল নয়। অথচ গ্যাস রপ্তানির জন্য বাংলাদেশের ওপর অবিরাম চাপ সৃষ্টি করে দেশকে অস্থিশীল এক পর্যায়ে ঠেলে দেয়া হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সব সময় চায় ছোট দেশগুলো দরিদ্র থেকে তাদের দয়ার উপর নির্ভরশীল থাকুক। তাহলে তাদের ছোট দেশগুলোকে নিয়ে পুতুলের মতো খেলা করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ গ্যাস রপ্তানির জন্য বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ ফান্ডসহ বেশ কিছু দাতাসংস্থা কৌশলে  চাপ দিতে থাকে। একটি দেশ অন্য দেশে গ্যাস রপ্তানি করবে কি না করবে এ মীমাংসার ভার তার নিজের। একটি গরিব দেশ সম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে যে কতখানি বিপন্ন বাংলাদেশের অবস্থা তার উদাহরণ।
মুক্তবাণিজ্য চুক্তি: বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চলছে ভারসাম্যহীনতা। তার উপর বাংলাদেশকে ইনডিয়ার সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নতুন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এক্ষেত্রে দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো ও শিল্পোন্নয়নের দিকে গভীর ভাবে বিবেচনা করে সিন্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। এর কারণ, মুক্ত বাণিজ্য সমশ্রেণীর দুটি দেশের মধ্যে প্রচলন যত সুবিধাজনক ,অসম দুটি দেশের ক্ষেত্রে সেই সুবিধা আশাকরা কঠিন। ভারতের যে পরিমাণ পণ্য প্রস্তুত করে বাংলাদেশ তা থেকে অনেক দুরে। তবে বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বাবলন্বী হয়ে যে অতিরিক্ত ও গুণগতমান সম্পন্ন পণ্য উৎপাদন করে, তা বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শিল্প-প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত  পণ্য দেশের চাহিদা মেটাতে প্রায় সক্ষম। ভারতেীয় পণ্য মুক্তভাবে প্রবেশাধিকার দিলে দেশীয় পণ্য অবিক্রীত থেকে যাবে ও দেশের হাজার হাজার কল কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিক কর্মচারি বেকার হবে। এমনিতেই বাংলাদেশ ভারতীয়  পণ্যের কলোনীতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন থেকে ইনডিয়ায় শুল্কমুক্ত পণ্য প্রবেশাধিকার চাইলেও ইনডিয়ার পক্ষ থেকে তা স্বীকৃত হয়নি। এক্ষেত্রে মুক্তবাজার সৃষ্টির পর বাংলাদেশের পণ্য ভারত  কি ভাবে প্রবেশ করবে সে দিকও বিবেচনা করা প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশ যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে মুক্তবাজার সৃষ্টির অর্থ দেশের শিল্পকে বিপন্ন করা। দেশের সংখ্যগরিষ্ট জনসাধারণের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা চিন্তা করেই মুক্ত বাজার অর্থনীতি সম্পর্কে ভাবা প্রয়োজন।
ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট: ভারতের ত্রিপুরা,আসাম,মেঘালয়,মণিপুর, মিজোরাম,নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল বাংলাদেশের ভৌগোলিক কারণে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন। পূর্বাঞ্চলীয় এ ৭টি রাজ্যতে প্রচুর পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ থাকলেও যোগাযোগের অভাবে সকল সম্পদের ব্যবহার করতে পারছেনা ইনডিয়া। এছাড়া বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দেলনের অস্তিত্ব প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই সমান ভাবে বিদ্যমান । এ সাতটি রাজ্যে যাওয়ার জন্য ভারত  বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিট দাবি করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। দেশের ভৌগোলিক অখন্ডতা সার্বভৌমত্ব অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কায় ভারত এ দাবির প্রতি সাড়া দিতে পারছেনা বাংলাদেশ। ফলে যখনই ইনডিয়ার সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রশ্ন এসেছে, ভারত  তখনই এ দাবি আলোচনার মূল এজেন্ডায় এনে দরকষাকষি অব্যাহত রেখেছে। ট্রানজিটে বাংলাদেশ ছাড় না দেয়ায় ইনডিয়া বাংলাদেশকে বেকায়দায় ফেলার নানা ফন্দি আঁটতে কখনোই ভুল করেনি। 
পুশইন ও পুশব্যাক: ইনডিয়ার আধিপত্য নীতি,বর্ডারে বিড়িআর ও বাংলাদেশীদের হত্যা এবং পুশইনের ঘটনা নতুন নয়। ১৯৯২ সালে এই পুশইনের উৎপত্তি হয়। তৎকালীন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিতেশ্বর সাইকি ভারতে অবৈধভাবে বাংলাদেশীরা বসবাস করছে বলে প্রথম অভিযোগ উত্থাপন করেন। মুখ্যমন্ত্রী ঐ অভিযোগ উত্থাপনের পর পরই  তৎকালীন ভারতের  প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও তাদের ভাষায় কথিত অবৈধ বাংলাদেশীদের ফেরত নেয়ার জন্য বাংলাদেশের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। এর পর ২০০৩ সালের ৭ জানুয়ারী ভারতের  উপ-প্রধানমন্ত্রী লালকৃঞ্চ আদভানির বিবৃতির পর থেকে এধারা আরো বেড়ে যায়। এসময় ভারতের একটি সাময়িকী রিপোর্ট প্রকাশ করে যে,  ভারতে ১ কোটি ১১ লাখ অবৈধ বাংলাদেশী রয়েছে। এছাড়া ইনডিয়া বিভিন্ন সময়ে সে দেশে কথিত অবৈধ বাংলাদেশীদের সংখ্যা প্রকাশ করতে থাকে। ১৯৯৮ সালে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা বলেছিল, ইনডিয়ায় প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ অবৈধ বাংলাদেশী নাগরিক রয়েছে। এর মধ্যে ১ কোটি ২০ লাখই নাকি পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করছে আর বাকি ৬০ হাজার ইনডিয়ার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এবার ভারত  সরকার বলছে, ভারতে  অবৈধ বাংলাদেশীর সংখ্যা ২ কোটির ও বেশি।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের যে কয়টি বিবাদমান ইস্যু রয়েছে সেগুলো খুবই জটিল। এর প্রত্যেক বিষয়ের সাথে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন জড়িত। ভারতের  দৃষ্টিভঙ্গি ও বাংলাদেশের সুদূরপ্রসারী লাভালাভের বিবেচনায়, কৌশলে যথাযথ সিন্ধান্ত নিতে হবে। এছাড়া দু’দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে অমিমাংসীত বিষয়গুলোর সমাধান করতে হবে।

0 comments:

Post a Comment