ভূমিকম্পের তিন যুগের খতিয়ান: ৮ মাত্রার ভূকম্পও অপ্রত্যাশিত নয়
ড. ফোরকান আলী
দেশের বিভিন্ন স্থানে বুধবারে ভূমিকম্প হয়েছে। বাংলাদেশ সময রাত ৭টা ৫৫ মিনিট ১৭ সেকেন্ডে ভূকম্পনটি আঘাত হানে। উৎপত্তিস্থল মিয়ানমার ছাডাও ভারত ও চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূকম্পন অনুভূত হয। এ সময় আতঙ্কিত মানুষ ভবন ছেড়ে রাস্তাযয় খোলা স্থানে চলে আসে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা বলছে, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৯। এর উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডো থেকে ৩৯৬ কিলোমিটার উত্তর উত্তর–পশ্চিমে। এর গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৩৪ কিলোমিটার গভীরে। বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক শামসুদ্দিন আহমেদ বলেছেন, উৎপত্তিস্থল ঢাকা থেকে ৪২০ কিলোমিটার পূর্ব দিকে মিয়ানমারে। এদিকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর কলকাতা, শিলং, গুয়াহাটি ও পাটনায় ভূকম্পন অনুভূত হয়। কম্পনের সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কে কলকাতার বহু বাসিন্দা তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তায় চলে আসে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিযয়েছে, তিব্বতে তীব্র মাত্রার ভূকম্পন হয়েছে। ভূমিকম্পটি প্রায় এক মিনিট স্থায়ী হয়। চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিস জানান, পতেঙ্গা আবহাওয়া দপ্তরের হিসাবে রাত ৭টা ৫৫ মিনিটে রিখটার স্কেলে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূকম্পন অনুভূত হয়। গত ২৫ এপ্রিল বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্প দেখা দেয়। এর আগে ৪ ফেব্রুয়ারি রাত ৭টা ৫৩ মিনিটে রিখটার স্কেলে ৬.৪ মাত্রার ভূমিকম্পে ৪৫ সেকেন্ডেরও বেশি সময় কেঁপেছিল রাজধানী ঢাকাসহ প্রায় সারাদেশ। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৪২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা। দেশের কোথাও থেকে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে না লোকজন আতংকিত হয়ে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। ভূমিকম্পের কম্পনে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে আতংকিত হয়ে পড়ি। পরে সময় পেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রভাব আমাদের মন থেকে মুছে যায়। আমরা সব ভুলে যাই। প্রচ- ঝাঁকুনি খেয়ে কম্পিত হলেও আমরা তেমন শঙ্কিত হই বলে মনে হয় না। ভূমিকম্প-পরবর্তী অবস্থা মোকাবেলায় কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও আমরা দৃঢ়ভাবে ভাবি না। রিখটার স্কেলে ৬.৪ মাত্রার ভূমিকম্প একটি মাঝারি মানের শক্তিশালী ভূমিকম্প। কম্পনটি উৎপত্তি‘লের ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ থেকে ৯০ কিলোমিটার গভীরে সংঘটিত হয়। এর আগে ২০১৫ হিন্দুকুশ পর্বতে শক্তিশালী ভূমিকম্পে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান মিলিয়ে তিন শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আহতের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। ঐ ভ’মিকম্পে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার এই ভূমিকম্প ভারত ও বাংলাদেশেও অনুভূত হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে গত ৩০ বছরের শক্তিশালী কয়েকটি ভূমিকম্পের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল নেপালে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে কমপক্ষে ৮ হাজার ৯০০ মানুষ প্রাণ হারায়। ২০১২ সালের ১১ আগস্ট ইরানের তাবরিজ শহরে ৬ দশমিক ৩ ও ৬ দশমিক ৪ মাত্রার জোড়া ভূমিকম্পে অন্তত ৩ শতাধিক লোক নিহত হয়। ২০১১ সালের ১১ মার্চ জাপানে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প ও সে কারণে সৃষ্ট সুনামিতে ১৮ হাজার ৯০০ জন মানুষ মারা যায়। ২০১১ সালের ২৩ অক্টোবর তুরস্কের পূর্বাঞ্চলে ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পে ৬ শতাধিক মানুষ নিহত হয়। ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি হাইতিতে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে আড়াই থেকে তিন লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ২০১০ সালের ১৪ এপ্রিল চীনের কুইনঘাই প্রদেশে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে ৩ হাজার মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হয়। ২০০৮ সালের ১২ মে চীনের সিচুয়ান প্রদেশে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে ৮৭ হাজারের বেশি মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়। ২০০৬ সালের ২৭ মে ইন্দোনেশিয়ায় শক্তিশালী এক ভূমিকম্পে ৬ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ২০০৫ সালের ৮ অক্টোবর পাকিস্তান-শাসিত আজাদ কাশ্মিরে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্পে ৭৫ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। ২০০৫ সালের ২৮ মার্চ ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে ৯০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর এক শক্তিশালী ভূমিকম্প ও তার কারণে সৃষ্ট সুনামিতে ইন্দোনেশিয়াসহ ভারত মহাসাগরের কাছাকাছি অঞ্চলে ২ লাখ ২০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ২০০৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর ৬ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ইরানের বাম শহরে কমপক্ষে ৩১ হাজার ৮৮৪ মানুষ প্রাণ হারায়। ২০০১ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের গুজরাটে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ২৫ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। ১৯৯৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৬ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্পে ভারতের মহারাষ্ট্রে ৭ হাজার ৬০১ জন মানুষ প্রাণ হারায়। ১৯৯১ সালের ২০ অক্টোবর ভারতের উত্তর প্রদেশে ৬ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্পে ৭৬৮ জন মারা যায়। ১৯৮৮ সালের ২০ আগস্ট নেপালে ৬ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে ৭২১ জনের প্রাণহানি ঘটে। তবে সংঘর্ষ নয়, অধিকাংশ ভূমিকম্পের কারণ দু’টি প্লেটের বিচ্ছেদ বলেই বিজ্ঞানীদের অভিমত। ভূকম্পের বিধ্বংসী শক্তির আঁচ ভূ-বিজ্ঞানীরা মোটামুটি সকলেই পেয়ে গেছেন। গত এপ্রিল-মে মাসে নেপালে হয়ে যাওয়া দুটি ভূমিকম্পের কারণ নিয়ে ভূ-বিজ্ঞানীদের মধ্যে কোনো দ্বিমত ছিল না। ইন্ডিয়ান প্লেট আর ইউরেশিয়ান প্লেট একটি অন্যের নিচে ঢুকে যাওয়াতেই ওই বিপত্তি ঘটেছিল। কিন্তু এবার আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ পর্বতে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পের কারণ কী তা নিয়ে একাধিক তত্ত্ব ঘুরে বেড়াচ্ছে বিজ্ঞানী মহলে। রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পটিতে নির্গত হয়েছে প্রায় ৫০টি পরমাণু বোমার সমান শক্তি। যা কিনা কম্পনের কেন্দ্রস্থলের আশপাশে গোটা এলাকাকে একেবারে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে। ভারতের আইআইটি খড়গপুরের ভূ-পদার্থবিদ্যার গবেষকরা বলছেন, এবারের ভূমিকম্প দুটি বিচ্ছিন্ন ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার যোগফল। বিভাগীয় প্রধান শঙ্করকুমার নাথ বলেছেন, নেপালে গত ২৫ এপ্রিলের সেই ৮ দশমিক ১ রিখটার মাত্রার ভূমিকম্পের সময়ে ইউরেশীয় প্লেট ও ইন্ডিয়ান প্লেট একে অন্যের নিচে তীব্র গতিতে ঢুকে গিয়েছিল। এবার তা হয়নি। বরং দুটি প্লেট পরস্পর একে অন্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তিনি মনে করেন, ইন্ডিয়ান প্লেটটি যে গতিতে ইউরেশিয়ান প্লেটটের দিকে এগোচ্ছিল একই গতিতে এবার তা ঢুকে গেছে হিন্দুকুশের নিচে। একইভাবে ইউরেশিয়ান প্লেট ঢুকে গেছে পামীর মালভূমির নিচে। দুয়ের সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ায় এই ভূকম্পন। তবে এই দুটি প্রক্রিয়া একসঙ্গে হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে তিনি এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নন। তবে তারা মনে করেন, কম্পনের উৎসস্থলে যে পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়েছে, দুটি প্রক্রিয়া একসঙ্গে না ঘটলে তা হওয়া কঠিন। ভূমিকম্প-বিধ্বস্ত এলাকার ছবি দেখলে মনে হবে যেন মাটির নিচে প্রবল ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেছে। ওই দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়ার জেরে মাটির দুইশ’ কিলোমিটার নিচে গোটা ভূস্তর উথালপাথাল হয়ে গেছে। নেপালের ভূমিকম্পের তুলনায় তীব্রতা কম হলেও এটি মাটির অনেকটা গভীরে ঘটায় গোটা অঞ্চলের এমন অবস্থা। যেন আখমাড়াই কলে আখ পেষা হয়েছে। কম্পন অনুভূত হয়েছে বিরাট এলাকাজুড়ে। আফগানিস্তান থেকে দিল্লি কেঁপে উঠেছে। ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও বেশি থাকছে। ভূমিকম্পের কাঁপুনিতে আফগানিস্তান-পাকিস্তানে ঘরবাড়ি, সেতু ভেঙে পড়েছে। এই বিধ্বংসী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণ প্রসঙ্গে মার্কিন ভূ-বিজ্ঞান পরিষদ (ইউএসজিএস)-এর বিবৃতিতেও এই তত্ত্বের সমর্থন মিলেছে। যদিও ইউএসজিএস নিশ্চিত নয়, দুটি প্রক্রিয়া একসঙ্গে ঘটেছে নাকি যে কোনও একটির কারণেই মাটি কেঁপে উঠেছে। ইউএসজিএসের বক্তব্য হলো, কম্পনের কারণ সম্পর্কে দুটি তত্ত্ব সামনে এসেছে। একটি বলছে, দুটি প্রক্রিয়াই (হিন্দুকুশের নিচে ইন্ডিয়ান প্লেটের প্রবেশ ও পামীর মালভূমির নিচে ইউরেশিয়ান প্লেটের আগ্রাসন) এক সঙ্গে হয়েছে। অন্যটি বলছে, দুটি প্রক্রিয়ার একটিই ভূকম্প ঘটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। এর বাইরে অন্য তত্ত্বও শোনা যাচ্ছে। ভূ-বিজ্ঞানীদের অনেকের মতে, নেপাল হিমালয়ে যেমন হয়েছিল, তেমন আফগান হিন্দুকুশেও দুই প্লেটের মধ্যে তীব্র গতির ঘষাঘষির ফলে ভূমিকম্পের উৎপত্তি। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-বিদ্যার প্রাক্তন প্রধান হরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের কথায়, নেপালে যা ঘটেছিল, আফগানিস্তানে তা-ই হয়েছে। ইউরেশিয়ান প্লেট ও ইন্ডিয়ান প্লেট একে অন্যের তলায় ঢুকে গিয়েছে। এ ব্যাপারে ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ সুগত হাজরার বক্তব্য হলো, হিন্দুকুশ পর্বত তৈরিই হয়েছিল ইউরেশীয় প্লেটের নিচে ইন্ডিয়ান প্লেট ঢুকে গিয়ে। তাই ওখানে ইন্ডিয়ান প্লেটের উত্তরমুখী গতি (বছরে ৫০ মিলিমিটার) আটকে গেছে। পরিণামে দুই প্লেটের জোড়ে প্রচুর পরিমাণ শক্তি জমা হচ্ছে। যা আচমকা কোনও চ্যুতি (ফল্ট) বরাবর বেরিয়েও আসছে। গতকাল ও তাই হয়েছে। ভূ-বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এই অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম ভূকম্পপ্রবণ। বস্তুত হিন্দুকুশ পর্বতমালার এই অংশটি এতো বেশি অস্থির যে, এখানে সবসময়েই ২-৩ রিখটার মাত্রার ভূমিকম্প হয়েই চলেছে। ৭ দশমিক ৫-৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূকম্পও অপ্রত্যাশিত নয়।
লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
০১৭১১৫৭৯২৬৭
0 comments:
Post a Comment