Tuesday, June 30, 2015

মহাপরিকল্পনা কতটা টেকসই হবে


মহাপরিকল্পনা কতটা টেকসই হবে
ড.ফোরকান আলী
ড্রেজিং করা বালি দিয়ে গড়াই নদীর উৎসমুখ ভরাট করা হয়েছে। বাংলাদেশের নৌপথগুলোর কোথাও কোথাও চরা পড়ে নাব্যতা হারালে সেগুলো সচল রাখার জন্য প্রতি বছর খনন কাজ চালানো হয়। এই খনন কাজ যথেষ্ট না হলে বাজেট বাড়ানো দরকার। অনেক কাটা খাল নিয়মিত খনন না করায় বুজে গিয়ে নাব্যতা হারিয়েছে। বাংলাদেশ নদী ও পলি মাটির দেশ। সারাদেশটিই ছিল সাগরের তলায়, পলি মাটি পড়ে পড়ে তা জেগে উঠেছে। দেশময় ছেয়ে থাকা নদ-নদীর শাখা-প্রশাখাগুলো উজান থেকে বয়ে আসা পলি মাটি ছড়িয়ে দিয়ে ডুবোচরগুলোকে জাগিয়ে তুলেছে। কিন্তু আমাদের দেশের এসব নদীর অধিকাংশই এখন মৃতপ্রায়। এককালে এ দেশে ১ হাজার ৩০০ নদী ছিল। এখন আছে ৩৫০টি। এসব কথাই আমরা জানি এবং তাই আমাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমরা আতঙ্কিত হই। অতএব শ্লোগান ওঠে, ‘আমাদের দেশকে বাঁচাতে হলে নদীকে বাঁচাতে হবে। নদীগুলো ড্রেজিং করে জাগিয়ে তুলতে হবে।’ বিআইডব্লিউটিএ নদীগুলোকে ১২ ফুট, ৯ ফুট, ৬ ফুট এবং ৩ ফুটের বেশি নাব্যতা হিসেবে চার শ্রেণীতে ভাগ করে। এ হিসেবে ১৯৭১ সালে দেশব্যাপী ২৪,০০০ কিলোমিটার নদীপথ ছিল। ১৯৮৪ সালে ছিল বর্ষায় ৪০০ কিলোমিটার, শীতে ৫ হাজার ২০০ কিলোমিটার। আমার হিসাবে সারাদেশে এখনও অন্তত ৪ হাজার ৬৩ কিলোমিটার নদীপথ আছে। যা সারা বছর ব্যবহারযোগ্য থাকে। তাহলে নদীপথ কমছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসেই ১১ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকার নদী ড্রেজিংয়ের মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল। আট বছরব্যাপী এ পরিকল্পনায় ৫৩টি নদীপথকে সচল করার কথা বলা হয়। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, দেশের নদ-নদীর নাব্যতা ও গভীরতা বাড়াতে সরকার ২ হাজার ৯৫ কোটি টাকার দুটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে শিগগিরই ৫৩টি নদী খননে ক্যাপিটাল ড্রেজিং শুরু হয়েছে। ২০১৬ সালের মাঝামাঝি প্রকল্প দুটির কাজ শেষ হবে। পানিসম্পদমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী ৫৩টি নদীপথের ৫ হাজার ৩৩৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে খনন কাজ হবে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, ১৭টি ড্রেজার ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ১ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা ব্যয় হবে। আমার প্রশ্ন, এই যে মহাযজ্ঞ শুরু হচ্ছে তাতে কি নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা যাবে? ব্যাপারটি জলের মতো তরল নয়। কারণ নদীর জল ঘোলাও থাকে। যেসব নদীর জল ঘোলা থাকে না এবং যেসব নদীর অববাহিকায় জলাবদ্ধতা থাকে সেসব নদীতে ড্রেজিং করে বালি বা পলি সরিয়ে নদীর নাব্যতা বাড়ানো যায় এবং জলাবদ্ধতা দূর করা যায়। কিন্তু যেসব নদীর জল ঘোলা থাকে, অর্থাৎ উজান থেকে বালি বা পলি আসে সেসব নদীতে ড্রেজিং করে বালি বা পলি সরিয়ে তৎক্ষণাৎ উপকার পাওয়া গেলেও পরবর্তী বছরের মধ্যে তা আবার বালি বা পলিতে ভরাট হয়ে যায়। পাকিস্তান আমলে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার নদীগুলোকে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করে সচল করা গেলেও কয়েক বছরের মধ্যে সেগুলো আবার ভরে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে গড়াই ও পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদের উৎসমুখ শীতকালে বারবার ড্রেজিং করা হয়েছে, কিন্তু পরবর্তী বছর বর্ষার প্রবাহে আসা বালির মাধ্যমে ওই মুখ দুটি আবার আগের মতো বুজে গিয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে আমাদের দেশের নদীগুলো প্রধানত তিন কারণে নাব্যতা হারাচ্ছে। যথাথ ১. উজান থেকে আসা পলি ভরাট হয়ে। বুঝতে হবে, যে নদীর পানিতে পলি আছে সে নদীতে যদি ভাঙন না থাকে তবে সে নদী অচিরেই বুজে যাবে। মানিকগঞ্জ শহরের আগে ধলেশ্বর নদীটি এভাবে বুজে গেছে। নদীতে যদি ভাঙন থাকে তাহলে নদীর এপার ভাঙবে, ওপার গড়বে। আবার নদীর ভাঙন প্রতি বছর ভাটির দিকে সরে যায় বিধায় ভাঙনের অংশও এক সময় উজানের পলি দিয়ে ভরে উঠবে। পদ্মা নদীর দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাটে এই পরিবর্তন স্পষ্ট দেখা যায়। ২. নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে বড় নদীগুলোর প্রধান প্রবাহ এক অন্তর্শাখা থেকে অন্য অন্তর্শাখাতে সরে গেলে ঘাটের নাব্যতা কমে যায়। তখন ঘাট সরাতে হয়। নয় ড্রেজিং করে ঘাটের মুখে সরু নৌপথ তৈরি করতে হয়। তবে সাগরে পড়া নদীগুলোর বয়ে নেওয়া পলিতে সাগরের ভেতরে নতুন নতুন দ্বীপ জেগে ওঠায় প্রবাহ দৈর্ঘ্য ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৩. নদীর দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পেলে প্রবাহ অক্ষুণœ রাখার জন্য উজানে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাচ্ছে। মানুষের হস্তক্ষেপের কারণেও নদীগুলো তাদের নাব্যতা হারাচ্ছে। যথাথ ১. নদীগুলোর প্রবাহ উজানে ব্যারেজের মাধ্যমে ঠেকিয়ে সেচ প্রকল্পের জন্য অতিমাত্রায় জল উত্তোলন করে অথবা নদীর গতিপথ অন্য পথে ঘুরিয়ে নদীর প্রবাহ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শুকনো মৌসুমে বড় নদীগুলো শীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। ছোট নদীতে বৈশাখ মাসে হাঁটুজল থাকছে না। কারণ এসব নদী অববাহিকার বিলগুলো থেকে তলানি প্রবাহ থেকে সংগ্রহ হতো। কিন্তু এখন সারা দেশের বিল শুকিয়ে চাষ করে ফেলায় তলানি প্রবাহ আর আসছে না। দেশব্যাপী সেচের জন্য অগভীর নলকূপ বসিয়ে মাটির তলার পানি অতিমাত্রায় শুষে নেওয়ার ফলে অনেক গ্রামের নলকূপও শুকিয়ে গিয়েছে। শহরাঞ্চলে নদীগুলোর মরে যাওয়ার প্রধান কারণ, ২. ঘাট, মসজিদ, দোকান, বস্তি, আবাসন, মার্কেট বা শিল্প করার নামে নদী দখল করা; ৩. শিল্প কলকারখানার বিষাক্ত কঠিন ও তরল বর্জ্য এবং গৃহস্থালি বর্জ্য নদীতে ফেলে দূষণ করা। ঢাকা মহানগরীর আশপাশের নদী মরে যাওয়ার পেছনে এই কারণগুলো সবার কাছেই স্পষ্ট। সরকারি নদী ড্রেজিং মহাপরিকল্পনায় উপরোক্ত বিষয়গুলো হিসাবে রাখলে বাস্তবায়ন যথাযথ হবে। এটা জানা থাকতে হবে। আমাদের দেশের ওপর দিয়ে বছরে গড়ে ১ হাজার ৯৪ মিলিয়ন একর ফুট বা ১ হাজার ৩৫০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি বয়ে যায়। দেশের বাইরে প্রায় ১৫ গুণ এলাকার বৃষ্টির পানি থেকে উৎপন্ন হয় ৮১৮ মিলিয়ন একর ফুট এবং দেশের ভেতরেই বৃষ্টি থেকে উৎপন্ন হয় ২৭৬ মিলিয়ন একর ফুট পানি। দেশের বাইরে থেকে আসা পানির সঙ্গে বছরে আসে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন টন পলি বা বালি। এই পলি বা বালির একটি অংশ নদীর তীর উপচে পার্শ্ববর্তী জমি ও জলাভূমিগুলোকে উঁচু করে, একটি অংশ সাগরে পড়ে নতুন দ্বীপ গজিয়ে ওঠে এবং একটি অংশ নদীর তলদেশে জমা হয়ে যায়। নদীর তলদেশের বালি বর্ষায় বন্যার প্রবাহে সাগরের দিকে এগিয়ে গেলেও বর্ষা শেষে উজানের বালিতে আবার ভরাট হয়ে যায়। বাংলাদেশের নৌপথগুলোর কোথাও কোথাও চরা পড়ে নাব্যতা হারালে সেগুলো সচল রাখার জন্য প্রতি বছর খনন কাজ চালানো হয়। এই খনন কাজ যথেষ্ট না হলে বাজেট বাড়ানো দরকার। অনেক কাটা খাল নিয়মিত খনন না করায় বুজে গিয়ে নাব্যতা হারিয়েছে। মুন্সীগঞ্জের তালতলা খাল, শরীয়তপুরের নরিয়া খাল এভাবে বুজে রয়েছে। যা সরকারি মহাপরিকল্পনায় ড্রেজিং করলে সুফল বয়ে আনবে। বন্দর ও ফেরিঘাটগুলোর মুখে পলি অপসারণের জন্য ড্রেজিং একটি নিয়মিত ব্যাপার। কিন্তু সরকার ঢাকা নগরীতে যমুনা নদীর পানিপ্রবাহের নাম করে পুঙ্গলী নদী কাটার যে পরিকল্পনা নিয়েছে তা টেকসই হবে না। এর কারণ যমুনা নদী পলিবাহী তাই মূল নদীতে কোনো ব্যারেজ নির্মাণ না করে শাখা নদীর উৎসমুখ খনন করলে তা পরের বছরই বালিতে পূর্ণ হয়ে যাবে। এ যাবৎ হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে গড়াই নদী বা পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের উৎসমুখ খননের কাজ তাই বারবারই ব্যর্থ হয়েছে। সারাদেশের নদীর বেলায়ই একই কথা বলা যায়। সত্তরের দশকে বিএনপি আমলে দেশব্যাপী খাল খনন মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। ওই সময় ছোটখাট নদ-নদী, খাল, রাস্তার বরোপিট কিছুই বাদ পড়েনি। বলাবাহুল্য, পরিকল্পনায় কাটা অধিকাংশ খাল-নদীই বুজে গিয়েছিল। এবার আওয়ামী লীগ আমলে মরা নদীগুলো ড্রেজিং বা মানবশ্রম দিয়ে কেটে দেশব্যাপী আবার হৈ হৈ রৈ রৈ কা- শুরু হতে পারে। কিন্তু‘ কাটা মাটি যদি বালি হয় তা কেউ নেবে না বিধায় আগের মতোই নদী বা খালের পাড়ে পড়ে থাকবে এবং আবার গড়িয়ে নদীতে গিয়ে জমবে। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীতে যে গভীরতা তৈরি হবে তা পরবর্তী সময়ে বর্ষার পলি বা বালি দিয়ে ভরাট হয়ে যাবে। ওই উজানের বালি বা পলি নদীবাহিত হয়ে সাগর পর্যন্ত না যাওয়ায় সাগরে জমি গঠন প্রক্রিয়া পিছিয়ে যাবে। সরকারের নদী ড্রেজিং মহাপরিকল্পনার প্রতি তাই আমার সতর্কবাণী হচ্ছে-
যে এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে সে এলাকার নদীতে ড্রেজিং করে প্রবাহ নাও ফিরানো যেতে পারে। পলি বহনকারী নদীতে ব্যয়বহুল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে সারা বছর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা টেকসই হবে না। ড্রেজিং করা বালি উর্বর জমির ওপর কেউ ফেলতে দেবে না। তাই তা নদীতেই ফেলতে হবে। বুজে যাওয়া নদীর উৎসমুখে ড্রেজিং করে ফিজিবিলিটি স্টাডিতে বলা সুফল নাও পাওয়া যেতে পারে। আঁকাবাঁকা বদ্ধ নদীতে ড্রেজিংয়ের চেয়ে লুপকাট করা বেশি ফলদায়ক ও স্বল্প ব্যয়সাপেক্ষ হবে। ভাঙনপ্রবণ নদীতে ড্রেজিং টেকসই হবে না। কারণ ড্রেজিং করা অংশ বালিতে ভরে যাবে। ছড়ানো নদীকে ড্রেজিং করে সংকীর্ণ করার উদ্যোগ ব্যয়বহুল হবে। লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ


0 comments:

Post a Comment