Tuesday, April 21, 2015

জুম চাষ কি পরিবেশবান্ধব নয়?

জুম চাষ কি পরিবেশবান্ধব নয়?
ড.ফোরকান আলী
ধানি জমির অভাবে প্রায় সব সম্প্র্রদায়ের পার্বত্য আদিবাসীদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল পাহাড়ে উপযোগী জুম চাষ। পাহাড়ে ফসল ফলানোর জন্য জুম চাষ খুবই উপযোগী পদ্ধতি। যুগ যুগ ধরে আদিবাসীরা এ পদ্ধতিতে চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। তবে জুম চাষকে এখানে বিতর্কিত করা হয়েছে। জুম চাষ পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হিসেবে কিছু কিছু সরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়ে থাকে। বিশেষ করে বন বিভাগের পক্ষ থেকে অনেক আগে জুম চাষকে বেআইনি ঘোষণার জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু আসলেই কি জুম চাষ পরিবেশবান্ধব নয়?
জুম চাষকে মিশ্র ফসলের চাষ বলা যায়। ধানের সঙ্গে বিভিন্ন ফসলের বীজ রোপণ করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন শাকসবজির বীজও রোপণ করা হয় জুমে। ফলে বীজ রোপণের পরবর্তী এক মাস থেকে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও ফসল পাওয়া যায়Ñ সবশেষে পাওয়া যায় ধান। জুমের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, জুমে উৎপাদিত ফসল সমভূমিতে উৎপাদিত ফসলের তুলনায় বেশি সুস্বাদু এবং একই জমিতে অনেক ধরনের শস্য পাওয়া যায়। ধান ছাড়াও জুমে উৎপাদিত উল্লেখযোগ্য ফসলের মধ্যে রয়েছে মিষ্টি কুমড়া, চিন্দিরা (মিষ্টিজাতীয় শসা), মাম্মারা (পাহাড়ি শসা), তুলা, তিল, যব, কাউন চাল, ভুট্টা, নানা জাতের পাহাড়ি আলু ও কচু, সুঁচ মরিচ (ছোট অথচ খুবই ঝাল), সাবারাং ও ফুজিসহ বিবিধ ধরনের ধনেপাতা, আদা, হলুদ ইত্যাদি। তাছাড়া হরেকরকমের শাকসবজি তো আছেই।
ধানও বিভিন্ন প্রজাতির চাষ করা হয়ে থাকে। অনেক আগে শতাধিক জাতের ধানের চাষ হতো। বর্তমানে উল্লেখযোগ্য ধান জাতের মধ্যে রয়েছে কবরক, গ্যালং, কামারাং, আমেই, তোর্গী, মেলেধান, বাদেয়্যা, মোম্বোই, মেরে ধান, বুক্কই, লেংদাচিগোন ইত্যাদি। বিভিন্ন ধানের মধ্যে রয়েছে কবা, লবা, উরিং, মেরি, বান্দরনক ইত্যাদি। সাধারণত জুমে উৎপাদিত চাল হয় একটু তেলতেলে, বিন্নি চালের মতো কিছুটা আঠালো এবং খেতে খুবই মজা। আর খেতে খুব মজা বলে জুমের ফসলের চাহিদাও বেশি এবং দাম অন্য ফসলের চেয়ে একটু বেশিই হয়ে থাকে। সব ফসল তোলার পরও আপনাআপনি আবার ফসল হয়, যেটাকে রান্যা বলা হয়। এ রান্যা অবস্থায়ও বেশ ফসল পাওয়া যায়।
জুম চাষ প্রস্তুতির জন্য শীতের শেষের দিকে ফাগুন মাসে বড় বড় গাছ রেখে পাহাড়ের জঙ্গল কাটা হয়। কাটা জঙ্গলের গাছগাছড়া শুকিয়ে এলে চৈত্র মাসে আগুন দিয়ে পোড়ানো হয় এবং আধপোড়া গাছগাছড়া পরিষ্কার করা হয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে আগাছা পরিষ্কার করা হয় এবং দু-এক পশলা বৃষ্টি হলে বীজ রোপণ করা হয়। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে আগাছা পরিষ্কার এবং অঙ্কুরোদগম হওয়া চারা পরিচর্যা করা হয়। ভাদ্র-আশ্বিন মাসে জুমক্ষেত রক্ষণাবেক্ষণ ও ফসল তোলার জন্য জুম পাহাড়ে অস্থায়ী টংঘর তৈরি করে সপরিবারে জুম কৃষক বসবাস করা আরম্ভ করে। কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে ফসল তোলা হয়। ফসল তোলা শেষ হলে ফসল নিয়ে পরিবারটি আবার গ্রামের স্থায়ী বাড়িতে চলে যায়।
জুম চাষের গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক হচ্ছে জুমে কোন সার বা কীটনাশক ব্যবহƒত হয় না। পুড়ে যাওয়া ঝোপঝাড়ের ছাই কীটনাশক ও সারের কাজ করে, সার ব্যবহƒত হলেও তা জৈবিক সার। তাই জুমে উৎপাদিত সব ফসল অর্গ্যানিক ক্রপ হিসেবে বিশ্বের সবখানে সমাদৃত হতে পারে।
এক সময় জুম চাষ পাহাড়ি আদিবাসীদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল। এক একটি পাহাড়ের জুম থেকে এক আদিবাসী পরিবারের সারা বছরের খাদ্য নিরাপত্তা থাকে। কিন্তু আদিবাসীদের চিরাচরিত জুম চাষের বিরুদ্ধে কিছু মনগড়া অভিযোগ নিয়ে আসা হয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে জুম চাষের আগে জঙ্গল আগুনে পোড়ানোর ফলে অনেক বনসম্পদ পুড়ে যায়, মাটি য়ে নদীতে পলি জমে, বৃক্ষ হীন হয়ে ছোট ছড়ানদীগুলো মরে যায়।
বড় বড় গাছের আধিক্য থাকলে সেসব পাহাড়ে জুম চাষ কোনভাবেই সম্ভব নয়। কারণ বড় বড় গাছ কেটে পুড়ে ফেলা বা সরানো দুর্গম পাহাড়ে কোনভাবেই সম্ভব নয়। বনের যা কিছু কেটে পোড়ানো হয়, সেগুলো সব ঝোপঝাড়। পাহাড়ে স্থিত বড় বড় গাছ জুমের প্রয়োজনেই রাখতে হয়। প্রকৃতি বিরূপ হলে বৃষ্টিপাত কম হয় এবং সেই খরা থেকে জুমকে বাঁচাতে প্রয়োজন হয় চা-বাগানের মতো ছায়াদাতা বড় বড় গাছের। বনজসম্পদ পুড়ে যাওয়ার বিষয়টি সঠিক নয়। যেটুকু পুড়িয়ে ফেলা হয়, তার অনেকগুণ বেশি ফসলে ভরে ওঠে জুমপাহাড়। ঝোপঝাড় পোড়ানোর দু’এক মাসের মধ্যে আবার সবুজে ভরে যায় পাহাড়। ফসল তোলার পর উর্বর হওয়া পাহাড় প্রাকৃতিক বনে ভরে যায়। পরবর্তী তিন-চার বছর সেখানে জুম চাষ করা হয় না। পাহাড়ে বন ছাড়া ফসলের চাষ করা না গেলে সমভূমিতেও বন ছাড়া অন্য কিছু চাষ করা যাবে না বলা সমীচীন হবে কি?
জুম চাষের ফলে মাটি ক্ষয় হওয়ার বিষয়টিও সঠিক নয়। জুম চাষ সমভূমির চাষের মতো নয়। সমভূমিতে মাটি কর্ষণ করে জমি তৈরি করতে হয়। কিন্তু জুম চাষে মাটি থাকে সম্পর্ণ অকৃষ্ট, দাওয়ের মাথা দ্বারা ছোট এক কোপ দিয়ে ছিদ্রমতন যে গর্ত হয় তাতে ধানসহ বিভিন্ন বীজ রোপণ করা হয়। আর শাকসবজির বীজ ছিটানোর মাধ্যমে চাষ করতে হয়। ফলে বৃষ্টি হলেও মাটি ক্ষয় হয় না। আদিকাল থেকে এখনও আদিবাসীরা জুম চাষ করে আসছে। কোনদিন জুমে ভূমিধস হয়েছে বা ভূমিধসে মানুষ মারা যাওয়ার খবর শোনা যায়নি। তাছাড়া জুমে আদিবাসীরা মাটি কেটে বাসা বানায় না, টংঘর তৈরি করে বসবাস করে। তাতে পাহাড় অ ত থাকে। কাজেই জুম চাষের ফলে মাটি য়ের অভিযোগ সঠিক নয়।
জুম চাষের কারণে জুমপাহাড় সংলগ্ন কোন ছড়ানদী শুকিয়ে যাওয়ারও নজির নেই। জুমপাহাড় বৃক্ষ শূন্য হয় না। কারণ জুমপাহাড়ের পাদদেশের কোন গাছ কাটা হয় না। ফলে ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট প্রাকৃতিকভাবে কার্যকর থাকে।
ইদানীং জুম চাষে মারাÍক সমস্যা দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে ভূমি সমস্যা। প্রথাভিত্তিক ভূমি মালিকানার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না থাকায় শত শত বছর জুম চাষ করলেও জুমভূমির মালিকানা স্বত্ব আদিবাসীরা পাচ্ছে না। অনেক জুমভূমি মালিকের অজান্তে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের নামে অধিগ্রহণ করে জুম্মদের (জুমচাষী) উচ্ছেদ করা হয়েছে। জুমভূমি থেকে তাদের উচ্ছেদের উদ্দেশ্যে জুম চাষের বিরুদ্ধে অযাচিত অভিযোগ করা হচ্ছে বলে আদিবাসীরা মনে করে। আর জুমভূমি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে না পড়লেও মৌজাধীন সরকারি খাস জমি হিসেবে উচ্ছেদ আতংক তো আছেই। প্রকৃতপক্ষে সেসব ভূমি আদিবাসীরা বংশপরম্পরায় জুম চাষ করে ভোগদখল করে আসছে। প্রথাগতভাবে ভূমি মালিকানার স্বীকৃতি না থাকায় জুমচাষীদের কোন ব্যাংক ঋণ দেয়া হয় না। ফলে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে চাষ করতে হয় এবং প্রকৃত মূল্যের এক-তৃতীয়াংশ মূল্যে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে উৎপাদিত শস্য বিক্রি করতে হয়।
জুম চাষ অবশ্যই একটি সম্ভাবনাময় কৃষি খাত। এ পর্যন্ত জুম চাষ অবহেলিতই থেকে গেল। সরকারি সহায়তা পাওয়া গেলে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের জুমে উৎপাদিত মশলাপণ্য বিশেষ করে আদা, হলুদ, মরিচ সারাদেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করা সম্ভব। কিন্তু এ সম্ভাবনাকে কাজে না লাগিয়ে বিদেশ থেকেই এসব পণ্য আমদানি করা হচ্ছে কার স্বার্থে? কোন সরকারই জুম চাষকে গুরুত্ব দেয় না, কিছু সরকারি সংস্থার অতিউৎসাহী পরিবেশবিদ বরং জুম চাষের বিরুদ্ধে মনগড়া ও ভুল তথ্য পরিবেশন করে আসছেন, ফলে জুম চাষের ব্যাপারে বর্তমান সরকারও উদাসীনতা দেখাচ্ছে।
স্বাধিকার হারানো আদিবাসীদের আর কত কষ্ট দেয়া হবে জানি না। ভূমি অধিকার দেয়া হবে না, জুমচাষ করতে দেয়া হবে না, গাছ লাগাতে দেয়া হবে না, লাগালেও কাটতে দেয়া হবে না, বিক্রি ও পরিবহন করতে দেয়া হবে নাÑ ক্ষুদ্র কয়েকটি নৃ-গোষ্ঠীর ওপর শাসকগোষ্ঠীর এ কী উৎপীড়ন!
জুমচাষীরা রাষ্ট্রীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত, পায় না কৃষিঋণ, পায় না কোন ভর্তুকি, সব ধরনের সরকারি সহায়তা থেকে তারা বঞ্চিত। উল্টো পায় জুম চাষ বন্ধ করার হুমকি, থাকতে হয় উচ্ছেদের আতংকে। প্রকৃতপক্ষে জুমচাষ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরঞ্চ সহায়ক। জুম চাষীদের উচ্ছেদ করে ভূমি দখল করতেই এ ধরনের অভিযোগ আনা হয়। জুমপাহাড়কে আদিবাসীদের খাদ্য উৎপাদনের কারখানা বলা যায়, খাদ্যভাণ্ডার বললেও অত্যুক্তি হয় না। খাদ্য ঘাটতির দেশে খাদ্য উৎপাদনের কারখানা বন্ধ করা আর যাই হোক, দূরদর্শিতার পরিচায়ক নয়। ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমির দেশে কোন অবস্থাতেই জুম চাষ বন্ধ করা সমীচীন নয়। দেশের স্বার্থে জুম চাষ রক্ষা ও এর আধুনিকায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং এজন্য দরকার সরকারি প্রণোদনা। লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ



0 comments:

Post a Comment